শরণার্থীদের নিয়ে গুজব অসত্য প্রমাণ করছে ‘হোক্সম্যাপ'

২০১৫ সালে জার্মানিতে ১০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী এসেছে৷ শুরুতে শরণার্থীদের আগমনকে স্বাগত জানানো হলেও কয়েকটি ঘটনায় তাদের সম্পর্কে অনেক জার্মানের মনে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে৷

সবশেষে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের সময় কোলন শহরে নারীদের উপর যৌন হয়রানির ঘটনায় খবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে৷

এমন অবস্থায় শরণার্থীদের নিয়ে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়ছে৷ তাদেরকে অনেক অপরাধের সঙ্গে জড়িত করার চেষ্টা চলছে৷ আর সেগুলো বিশ্বাসও করছেন অনেক জার্মান৷

পরিস্থিতির উন্নয়নে দুই জার্মান কারোলিন শোয়ার্ৎস ও লুটৎস হেল্ম মিলে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন৷ সেখানে ঢুকে জার্মানির মানচিত্রে চিহ্নিত করে দেয়া কোনো এক অংশে ক্লিক করলে ‘আসল' ঘটনা জানা যাবে৷ ধরা যাক, কেউ বার্লিনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চান৷ তাহলে তিনি মানচিত্রে বার্লিন ‘সিলেক্ট' করলে তার সামনে কতগুলো লিংক ভেসে উঠবে৷ এগুলো স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের লিংক৷ সেটা পড়ে পাঠক কোনো একটি ঘটনার আসল পরিস্থিতিটা জানতে পারবেন৷ বুঝতে পারবেন যে, তিনি অন্যের কাছ থেকে এতদিন যা শুনেছেন সেটা ঠিক ছিল, সেটা ছিল আসলে একটা গুজব৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

‘বিশ্বাসঘাতক’ ম্যার্কেল

জার্মানির ইসলাম ও অভিবাসী বিরোধী গোষ্ঠী পেগিডার হাজার হাজার সমর্থক সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের শরণার্থী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে৷ শরণার্থীদের প্রতি নরম মনোভাবের কারণ তারা ম্যার্কেলের বিরুদ্ধে ‘উচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘জার্মানির মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ আনেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীদের নিয়ে কটূক্তি

পেগিডার (প্যাট্রিয়টিক ইউরোপিয়ান অ্যাগেনস্ট দ্য ইসলামাইজেশন অফ দ্য অক্সিডেন্ট) প্রতিষ্ঠাতা লুটৎস বাখমান সম্প্রতি শরণার্থীদের ‘পশু’, ‘আবর্জনা’ ও ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ বলে আখ্যায়িত করেন৷ এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

সমাজে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়

সোমবার বিক্ষোভের সময় বাখমান বলেন, শরণার্থীর সংখ্যা দেড় কিংবা দুই মিলিয়নেই থেমে থাকবে না৷ এরপর আসবে তাদের স্ত্রী; আসবে এক, দুই কিংবা তিন সন্তান৷ ফলে এতগুলো লোকের জার্মান সমাজে অন্তর্ভুক্তির কাজ অসম্ভব হয়ে পড়বে৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

জার্মান সরকারের অস্বীকার

জার্মানির জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বিল্ড’ সরকারের গোপন ডকুমেন্টের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছর জার্মানিতে প্রায় দেড় মিলিয়ন শরণার্থী আসবে বলে মনে করছে সরকার৷ যদিও প্রকাশ্যে সরকার বলছে সংখ্যাটা এক মিলিয়ন হতে পারে৷ তবে জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র এ ধরনের কোনো গোপন ডকুমেন্টের কথা তিনি জানেন না বলে সাংবাদিকদের বলেছেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীর মৃত্যু

জার্মানির পূর্বাঞ্চলের এক শরণার্থীদের বাসস্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইরিত্রিয়া থেকে আসা ২৯ বছরের এক শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে৷ অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায়নি৷ এদিকে, জার্মান সরকারের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর শরণার্থী ও তাদের বাসস্থানের উপর হামলার সংখ্যা বেড়েছে৷ এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই এরকম ২০২টি ঘটনা ঘটেছে বলে সরকার জানিয়েছে, যেখানে গত বছর সংখ্যাটি ছিল ১৯৮৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

বিপদে ম্যার্কেল

শরণার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণের কারণে নিজ দল সহ অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদদের তোপের মুখে পড়েছেন ম্যার্কেল৷ তাঁরা জার্মানির শরণার্থী নীতি ও শরণার্থীদের আগমনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চ্যান্সেলরকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

এবার একটি উদাহরণ দেয়া যাক৷ গত অক্টোবরে জার্মানির একটি সুপারমার্কেট সাময়িক বন্ধের কারণ হিসাবে গুজব রটানো হয় এই বলে যে, সেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের চুরি বেড়ে যাওয়ায় মার্কেট কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সেটা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন৷ কিন্তু বিষয়টি আসলে সেরকম ছিল না৷ হোক্সম্যাপ-এর ওয়েবসাইটে গেলে আসল ঘটনা জানা যাবে৷

ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে৷ এরপর থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে ডয়চে ভেলেকে জানান শোয়ার্ৎস৷ তিনি বলেন, ‘‘অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন তাদের কাছে থাকা তথ্য আমাদের দিচ্ছেন৷''

শুধুমাত্র স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও কখনও কখনও পুলিশের বিবৃতি প্রকাশ করে গুজব অসত্য প্রমাণ করা হচ্ছে৷ শোয়ার্ৎস স্বীকার করেন প্রকাশিত খবরগুলো সত্য কি না তা যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ কারণ তারা দু'জনেই চাকরি করেন৷

টুইটারেও প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা চলছে৷ একজন অবশ্য এর সমালোচনা করেছেন৷ তিনি শরণার্থীদের নিয়ে সত্য ঘটনাগুলোও উল্লেখ করার পরামর্শ দিয়েছেন৷ শরণার্থীরা আসলেই যেসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সেগুলো সবুজ রং দিয়ে আর শরণার্থীদের নিয়ে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে সেগুলো লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করার কথা বলেছেন৷ তবে শোয়ার্ৎস এই পরামর্শ গ্রহণের পক্ষে নন৷ তিনি বলেন, এমনটা করলে আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে৷

গুজব অসত্য প্রমাণের এমন ওয়েবসাইট ফ্রান্স কিংবা অস্ট্রিয়াতেও আছে৷ তবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিয়ে ছড়ানো গুজব নিয়ে ওয়েবসাইট জার্মানিতে এই প্রথম৷ নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বলতে শরণার্থী ছাড়াও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (যেমন যাদের ‘নর্থ আফ্রিকান', ‘সাউদার্ন লুকিং', ‘ডার্ক স্কিন্ড' – এ সব নামে ডাকা হয়) লোকজন আছে বলে ডয়চে ভেলেকে জানান শোয়ার্ৎস৷

জার্মানির শরণার্থী নীতি কী হতে পারে ভবিষ্যতে? লিখুন নীচের ঘরে৷

শরণার্থীদের পাশে জার্মানির প্রখ্যাত তারকারা

‘শরণার্থী, স্বাগতম’

অনেক জার্মান তারকাই শরণার্থীদের সহায়তার জন্য নানা ধরণের উদ্যোগ নিচ্ছেন৷ ইলেক্ট্রো হিপহপ ব্যান্ড ‘ডাইশকিন্ড’ গত মার্চ মাসে এক অনুষ্ঠানে ‘স্বাগতম, শরণার্থী’ লেখা কাপড় বিক্রি শুরু করেছিল৷ সে উদ্যোগের পরিসর আরো বেড়েছে৷ এখন অনলাইনে অর্ডার দিয়েও কেনা যায় ওই ধরনের কাপড়৷ কাপড় বিক্রির টাকাটা শরণার্থীদের কল্যাণ সংগঠন ‘প্রো আস্যুল’-কে দিয়ে দেয় ডাইশকিন্ড৷

শরণার্থীদের পাশে জার্মানির প্রখ্যাত তারকারা

গানই হাতিয়ার

এক সংগীত শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন৷ নিজের কার্যক্রমটির নাম দিয়েছেন, ‘আকৎসিওন আর্শলখ’ বা ‘ইনিশিয়েটিভ অ্যাসহোল’৷ গান শুনিয়েই উপার্জন করা হয় সেখানে৷ উপার্জনের টাকা ‘প্রো আস্যুল’-কেই দেয় তারা৷

শরণার্থীদের পাশে জার্মানির প্রখ্যাত তারকারা

এসো বন্ধু

জার্মান রকস্টার উডো লিন্ডেনব্যার্গ ২০০ জন শরণার্থীদের জন্য একটা অনুষ্ঠান করছেন৷ ব্রেমেনে হবে অনুষ্ঠানটি৷ সে অনুষ্ঠানে শরণার্থীদের নিয়ে লেখা একটি গানও গাইবেন৷ শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে গানটিতে বলা হয়েছে, ‘‘এসো আমরা বন্ধু হয়ে যাই৷ তোমরা আমাদের বাড়িতে এসেছো৷ কেউ বের করে দেবে না তোমাদের৷’’

শরণার্থীদের পাশে জার্মানির প্রখ্যাত তারকারা

শরণার্থীদের জন্য ফাউন্ডেশন

অভিনেতা এবং পরিচালক টিল শোয়াইগার শরণার্থীদের জন্য নিজের নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন৷ অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব ফাউন্ডেশনে যোগ দিয়েছে শোয়াইগারের আহ্বানে৷ জার্মান ফুটবল দলের কোচ ল্যোভ, ব়্যাপার টোমাস ডি এবং অভিনেতা ইয়ান ইয়োসেফ লিফার্স-এর মতো সুপরিচিত তারকারাও আছেন সেই তালিকায়৷ টিল শোয়াইগার ফাউন্ডেশন তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে যে আয় হয় তা একটি শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্রের পেছনে ব্যয় করে৷

শরণার্থীদের পাশে জার্মানির প্রখ্যাত তারকারা

বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সহায়তা

গীতিকার হাইৎস রুডল্ফ কুনসে নিয়েছেন অভিনব এক উদ্যোগ৷ শরণার্থীদের বাদ্যযন্ত্র দেবেন তিনি৷ তাঁর মতে, শরণার্থীদের শুধু খাবার আর কাপড় দিলেই হবে না, তাদের বিনোদনও দরকার৷ আর বিনোদনের সুযোগ করে দেয়ার জন্যই শরণার্থীদের জন্য বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহে নেমেছেন তিনি৷

শরণার্থীদের পাশে জার্মানির প্রখ্যাত তারকারা

অভিবাসন একটি অধিকার

জার্মানির সংগীত ভুবনের ২৪ জন তারকা ‘কাইন বক আউফ নাৎসিস’ নামের একটি সংগঠন গড়ে নব্য নাৎসিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেছেন৷ সেখানে অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় নব্য নাৎসিদের কঠোর সমালোচনা করছেন তাঁরা৷ ‘কাইন বক আউফ নাৎসিস’ মনে করে, ‘‘অভিবাসনের অধিকার আলোচনা সাপেক্ষ কোনো বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার৷’’

আমাদের অনুসরণ করুন