শরণার্থীদের সন্তানদের ‘মূল্যবোধ’ শেখানোর পরিকল্পনা

জার্মানির রক্ষণশীল রাজনীতিকরা স্কুলে উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য ‘মূল্যবোধের’ ক্লাস চালু করতে চান বলে একটি জার্মান পত্রিকার বিবরণে প্রকাশ৷ এই মূল্যবোধ সাংস্কৃতিক অথবা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের উপরে স্থান পাবে৷

রক্ষণশীল জার্মান রাজনীতিকরা স্কুলে উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য জার্মান ভাষাশিক্ষা ছাড়া সামাজিক মূল্যবোধের পাঠের ব্যবস্থা করতে চান বলে ‘রাইনিশে পোস্ট’ পত্রিকা তাদের সোমবারের সংস্করণে জানিয়েছে৷

রিপোর্ট অনুযায়ী, শাসক সিডিইউ-সিএসইউ দলের উচ্চপদস্থ বিধায়করা স্কুলে তথাকথিত ‘মূল্যবোধ শিক্ষা’ সম্পর্কে একটি খসড়া প্রস্তুত করেছেন৷ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাক্রমে উদ্বাস্তু শিশুরা আইনের শাসন, নারী-পুরুষের সমতা ও একমাত্র রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার সম্পর্কে অবহিত হবে৷

‘‘জার্মানিতে যাঁরা থাকার অধিকার পাবেন, বিশেষ করে আমাদের সমাজে শান্তি বজায় রাখার জন্য তাঁদের অন্তর্ভুক্তি একটি জরুরি প্রসঙ্গ,’’ বলে বিধায়কদের খসড়ায় মন্তব্য করা হয়েছে৷ ‘‘এই শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য হবে, উদ্বাস্তুদের আমাদের মূল্যবোধ ও আইনের শাসন সম্পর্কে অবহিত করা৷ আমাদের আইনগত ব্যবস্থার সীমানা ও কর্তব্য সম্পর্কেও তাঁদের শিক্ষা দেওয়া হবে৷’’

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

সমস্যার মূল

এই মুহূর্তে জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলের স্কুলে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার শরণার্থী শিশু পড়াশোনা করে৷ কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, তাদের ঠিক মতো শেখাতে পারছেন তো শিক্ষকেরা? তাদের সমস্যাগুলো ধরা যাচ্ছে তো?

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

হিংসা, ভয়, গরিবি

জার্মানির আর পাঁচজন ছাত্রের মতো শরণার্থীরা নয়৷ নিজের দেশ থেকে তাদের পালিয়ে আসতে হয়েছে৷ তারা হিংসা, ভয়, গরিবির শিকার৷ তাদেরকে মূলস্রোতে আনতে গেলে শিক্ষার অন্য মডেল তৈরি করা দরকার৷

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

ড্রপ আউট

সমীক্ষা বলছে, স্কুলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে বহু শরণার্থী শিশুই মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছে৷

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

স্পেশাল স্কুল

শরণার্থীদের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে স্পেশাল স্কুল তৈরি করা হয়েছে৷ কোনো কোনো সংগঠন কলেজ পড়ুয়াদের দিয়ে সেখানে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে৷ কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ওই শিক্ষকেরা শরণার্থীদের সমস্যা ধরতে পারছেন তো?

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

শরণার্থী শিক্ষক

কোনো কোনো স্কুলে অবশ্য শরণার্থী শিক্ষকদেরই পড়ানোর কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে৷ অনেকেই বিষয়টিকে ভালো মডেল বলে মনে করছেন৷ শরণার্থী শিক্ষকেরা শিশুদের সমস্যা অনেক সহজে বুঝতে পারেন৷ সব স্কুলেই এ ধরনের ব্যবস্থা করা যায় কিনা, তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছে৷

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

মূলস্রোতে ফেরানো

শরণার্থী শিশুদের জার্মানির মূলস্রোতের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা দরকার৷ কিন্তু তার জন্য অনেক সময় দেওয়া দরকার৷ শরণার্থী শিশুদের মন বোঝা দরকার প্রথমে৷ সেখানেই ঘাটতি থাকছে বলে অনেকের ধারণা৷

শরণার্থী শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পাচ্ছে তো?

সরাসরি কথাবার্তা

শরণার্থী ছাত্রদের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলা দরকার বলে মনে করছেন অনেকে৷ প্রত্যেকের সমস্যাগুলো আলাদা আলাদা করে বোঝা দরকার৷ তাদের বোঝাতে হবে, আর ভয়ের কোনো কারণ নেই৷ তারা নিরাপদ৷

ফ্রাংকফুর্টে আজ সোমবার সিএসইউ ও সিডিইউ দলের সংসদীয় তথা রাজ্য বিধানসভার বিধায়ক গোষ্ঠীর নেতারা মিলিত হবেন৷ সেই সাক্ষাতে মূল্যবোধ শিক্ষা সংক্রান্ত খসড়াটি পেশ করা হবে৷ চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল স্বয়ং সেই সাক্ষাতে উপস্থিত থাকবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে৷

মূল্যবোধের স্থান সংস্কৃতি ও ধর্মের উপরে

পরিকল্পিত শিক্ষাক্রমে নারী-পুরুষের সমতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মানব মর্যাদার সুরক্ষার মতো যেসব মূল্যবোধ আলোচিত হবে, ‘‘অপরিহার্য আদর্শ হিসেবে সেগুলি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর উপরে স্থান পাবে’’ বলে খসড়াতে ঘোষণা করা হয়েছে৷

গত মাসে বাভেরিয়ার মুখ্যমন্ত্রী মার্কুস জ্যোডার (সিএসইউ) ও হেসে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ফল্কার বুফিয়ের (সিডিইউ) যুগ্মভাবে ‘মূল্যবোধ শিক্ষার’ পরিকল্পনাটি পেশ করেন৷ বুফিয়ের জার্মান ‘স্পিগেল’ পত্রিকাকে বলেন যে, গত দু'বছর ধরে একাধিক উদ্বাস্তু কেন্দ্রে অনুরূপ একটি অন্তর্ভুক্তি প্রকল্প প্রয়োগ করা হয়েছে৷

প্রকল্পটি খুবই সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন বুফিয়ের৷ তিনি বলেন, ‘‘সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা আগামী সরকারি কর্মকালে (মূল্যবোধ শিক্ষার) ক্লাস গুলিকে বাড়াতে চাই৷’’

বাভেরিয়া ও হেসে, উভয় রাজ্যেই আগামী অক্টোবর মাসে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে৷

এসি/এসিবি (রয়টার্স, এএফপি, ডিপিএ)

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

মারলেনে ডিটরিশ

১৯০১ সালে জার্মানিতে জন্ম নেয়া ডিটরিশ গায়িকা ও অভিনেত্রী হিসেবে বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন৷ ১৯৩০ সালে তিনি হলিউডে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান৷ সেখানে থাকলেও নাৎসি আমলের সমালোচনায় মুখর ছিলেন তিনি৷ ১৯৩৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন বাহিনীর জন্য গান গেয়েছেন৷ নাৎসি সরকার জার্মানিতে তাঁর মুভি প্রদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

হেনরি কিসিঞ্জার

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যে জন্মেছিলেন৷ নাৎসি সরকারের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ১৯৩৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

মেডেলিন অলব্রাইট

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অলব্রাইট চেক প্রজাতন্ত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন৷ ১৯৪৮ সালে সে দেশে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় গেলে তিনি তাঁর পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

আলবার্ট আইনস্টাইন

জার্মান ইহুদি এই নোবেল বিজয়ী যখন ১৯৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে ছিলেন তখনই বুঝতে পারেন যে, তাঁর পক্ষে আর জার্মানি ফেরা সম্ভব নয়৷ কারণ ঐ বছরই হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন৷ ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৪০ সালে সে দেশের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেন৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

গেওর্গ ভাইডেনফেল্ড

ইহুদি এই মানুষটির জন্ম অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়, ১৯১৯ সালে৷ নাৎসিরা যখন অস্ট্রিয়া দখল করে নিলে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান৷ সেখানে তিনি একটি প্রকাশনা সংস্থা চালু করেন৷ ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্টের ‘চিফ অফ স্টাফ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

বেলা বার্টোক

হাঙ্গেরির কম্পোজার, পিয়ানোবাদক ও লোক সংগীত সংগ্রাহক বার্টোক ইহুদি ছিলেন না৷ কিন্তু নাৎসিদের হাতে ইহুদিদের নিপীড়িত হওয়ার বিষয়টির ঘোর সমালোচক ছিলেন তিনি৷ ফলে ১৯৪০ সালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে হয়৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

ইসাবেল আলেন্দে

১৯৭৩ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চিলির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সালভেদর আলেন্দেকে হটিয়ে দেয়া হয় এবং সেই সময়ই তাঁর মৃত্যু হয়৷ এরপর একসময় আলেন্দের এক কাজিনের মেয়ে ইসাবেলকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়৷ তা থেকে বাঁচতে প্রথমে ভেনেজুয়েলায়, তারপর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ইসাবেল৷ তাঁর লেখা কয়েকটি উপন্যাস আন্তর্জাতিকভাবে বেশ প্রশংসিত হয়েছে৷

৮ তারকা যাঁরা একসময় শরণার্থী ছিলেন

মিরিয়াম মাকেবা

‘মামা আফ্রিকা’ নামে পরিচিত দক্ষিণ আফ্রিকার সংগীত শিল্পী মাকেবা একবার গান গাইতে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলেন৷ সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার বর্ণবাদবিরোধিতার অভিযোগে তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করে দেয়৷ ফলে তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি৷ কয়েক দশক পর অবস্থার পরিবর্তন হলে দেশে ফিরে যান মাকেবা৷

আমাদের অনুসরণ করুন