শরণার্থীদের সাহায্য করে বিপাকে জার্মানরা

কথা ছিল রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া পর্যন্ত জার্মানিতে আসা শরণার্থীদের খরচ দেবেন তাঁরা৷ কিন্তু রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুমতি পেলেও জার্মানিতে আইনি জটিলতার কারণে মোটা অঙ্কের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকদের৷

বউয়ের বারণ সত্ত্বেও ক্রিস্টিয়ান ওস্টারহাউস এক সিরীয় শিশু ও নাবালিকার খরচের দায়িত্ব নেন৷ এ বিষয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ও তাঁকে উৎসাহিত করে৷ অবৈধভাবে জার্মানিতে আসার বদলে দু'জনকে বৈধভাবে জার্মানিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করবার সুযোগ করে দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ান৷ কিন্তু তিনি জানতেন না, তাঁর খরচের ভার শুধুমাত্র এই দুই সিরীয়র আশ্রয় গৃহীত হওয়াতেই শেষ হবে না৷

‘‘এই দু'জনের জন্য আমরা বিমান ও বাসার ভাড়া দিয়েছি৷ সাথে কিছু টাকাও দিয়েছি যাতে তাঁরা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারেন,'' বলেন ক্রিস্টিয়ান৷

ক্রিস্টিয়ানের মতোই জার্মানির বন শহরে রয়েছেন এরকম ৪৫০জন পৃষ্ঠপোষক৷ কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরে জার্মানির প্রায় সাত হাজার পৃষ্ঠপোষক স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাচ্ছেন অবাক করা চিঠি৷

গত জুন মাসে দুই সিরীয় শরণার্থীর খরচ বাবদ ক্রিস্টিয়ানের জন্য এসেছে ৭,২৩৯ ইউরোর ( প্রায় সাত লক্ষ বাংলাদেশি টাকা) বিল! বলা হচ্ছে, সিরীয় শিশু ও নাবালিকা কন্যাটি জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেলেও এই অঙ্ক মেটাতে হবে খ্রিস্টিয়ানকেই৷

আইন নিয়ে ধোঁয়াশা

 ২০১৬ সালের পরিবর্তিত আইন অনুসারে, শরণার্থীর রাজনৈতিক আশ্রয় প্রাপ্তি হলেও পৃষ্ঠপোষকের ওপর থেকে আর্থিক দায়িত্বের ভার সরে না৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব বইতে হয় তিন বা পাঁচ বছর ধরেও৷

‘আঙ্কের’ অভিবাসী ট্রানজিট সেন্টার খুলল বাভেরিয়া

বাভেরিয়ায় প্রথম ট্রানজিট সেন্টার

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্স্ট সেহোফারের অভিবাসন বিষয়ক মহাপরিকল্পনার অংশ এসব সেন্টার৷ আশ্রয়প্রার্থীকে এদেশে থাকতে দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত তাদের এসব কেন্দ্রে রাখার পরিকল্পনা থেকে এগুলো করা হয়েছে৷

‘আঙ্কের’ অভিবাসী ট্রানজিট সেন্টার খুলল বাভেরিয়া

নিয়ন্ত্রিত অভিবাসন

বাভেরিয়া মোট সাতটি ‘আঙ্কের’ সেন্টার চালু করবে৷ প্রতিটিতে এক থেকে দেড় হাজার শরণার্থীকে রাখা যাবে৷ জার্মান শব্দ ‘আনকুন্ফট’, এনশাইডুং ও রুকফুরুং (পৌঁছানো, সিদ্ধান্ত, ফেরত) থেকে এই নামকরণ করা হয়েছে৷

‘আঙ্কের’ অভিবাসী ট্রানজিট সেন্টার খুলল বাভেরিয়া

বিচ্ছিন্নতার সতর্কবার্তা

সেন্টারগুলোকে বিতাড়ন শিবির আখ্যায়িত করে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন চার্চ গ্রুপ, শরণার্থীদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার কর্মী এবং বিরোধী দলগুলো৷ এর মধ্য দিয়ে অভিবাসী কমিউনিটিগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে সতর্ক করেছেন তারা৷ বেসরকারি সংস্থা সেইভ দ্য চিলেড্রন বলছে, এসব সেন্টার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য দুশ্চিন্তা এবং তাদের ওপর বলপ্রয়োগের জায়গা হবে বলে সেগুলো শিশুদের জন্য সহায়ক হবে না৷

‘আঙ্কের’ অভিবাসী ট্রানজিট সেন্টার খুলল বাভেরিয়া

সমঝোতার ফসল

চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্স্ট সেহোফারের শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সমঝোতার ফল হিসেবে এসেছে এসব সেন্টার৷ অভিবাসীদের সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার সেহোফারের প্রাথমিক পরিকল্পনা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছিল, যাতে ম্যার্কেলের খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী পার্টি, তাদের বাভেরিয়ায় সহযোগী দল সিএসইউ ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের জোট সরকার উৎখাতের উপক্রম হয়েছিল৷

‘আঙ্কের’ অভিবাসী ট্রানজিট সেন্টার খুলল বাভেরিয়া

জার্মানিতে উৎসাহে ভাটা

এসব সেন্টার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকার পর্যায়ে হলেও এগুলোর দায়দায়িত্ব মূলত রাজ্যগুলোর ওপর৷ বাভেরিয়া প্রথম এই উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে আগামী অক্টোবরে গুরুত্বপূর্ণ ভোটের লড়াইয়ে নামতে হবে সেহোফারের রক্ষণশীল সিএসইউকে৷ তবে অন্য রাজ্যগুলোর কতগুলো মাইগ্রেন্ট ট্রান্সফার সেন্টার তৈরিতে সময় নিচ্ছে, আর অন্যগুলো এটা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে৷


২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে জার্মানির শ্রম ও সমাজব্যবস্থা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয় যে, এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো পর্যন্ত পৃষ্ঠপোষকদের কোনো টাকা সরকারকে দিতে হবে না৷ তবুও ক্রিস্টিয়ানের কাছে একের পর এক চিঠি আসতে থাকে৷

বন শহরের আইনজীবী লোথার মাহলবের্গ ক্রিস্টিয়ানের মতো পৃষ্ঠপোষকদের পক্ষে আদালতে লড়েন৷ তাঁর মতে, ‘‘নিজেদের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রেখেও এই মানুষেরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন৷ বিপজ্জনক বা বেআইনী পথের বদলে আইনসম্মতভাবেশরণার্থীদের জার্মানিতে আনতে চাইলেও সরকারএদের সাহায্যের বদলে আরো জটিলতায় ফেলছে৷''

সততার জন্য শাস্তি?

আদতে সিরীয় ফারিদ হাসান বছর কুড়ি আগে জার্মানিতে আসেন৷ নিজের আর্থিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও যুদ্ধের সময় সিরিয়া থেকে নিজ দায়িত্বে পিতা ও দুই ভাইকে এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন৷

ক্রিস্টিয়ানের মতো তিনিও পেয়েছেন একটি চিঠি৷ কিন্তু তাতে টাকার অঙ্ক দেখে ঘাবড়ে গেছেন হাসান৷ বর্তমানে ২,০০০ ইউরো প্রতিমাসে রোজগার করা হাসানের ওপর বর্তেছে ৮৫,০০০ ইউরো মেটানোর দায়৷

‘‘অন্যদের মতো আমার পরিবারও যদি চোরাপথে জার্মানিতে আসতো, তাহলে কিছু হতো না৷ আইন মেনে চলতে গিয়েই আমার এই দশা৷'', জানান হতাশ হাসান৷

অলিভার পিপার/এসএস/এসিবি

আমাদের অনুসরণ করুন