শরণার্থী প্রবেশ ঠেকাতে অভিবাসন সম্মেলন

এ বছরের শুরুতেই রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসী প্রবেশ করেছে ইটালিতে৷ তাই ইউরোপে অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকানোর কৌশল ঠিক করতে রোমে শুরু হয়েছে অভিবাসন সম্মেলন৷ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উত্তর আফ্রিকার মন্ত্রীরা এতে যোগ দিচ্ছেন৷

ইটালির প্রধানমন্ত্রী পাওলো জেন্টিলোনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন৷ এছাড়া থাকছে আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলের তিনটি দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক৷ লিবিয়া, টিউনিশিয়া এবং আলজেরিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা জার্মি, ইটালি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, মাল্টা, স্লোভেনিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার দিমিত্রিস আভ্রামোপুলোসও এতে যোগ দেবেন৷

অভিবাসন সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী ‘কনট্যাক্ট গ্রুপ' করতে চান ইটালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী৷  ইটালির সংবাদ সংস্থা আনসা রবিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ভূমধ্যসাগর থেকে অন্তত ৩,৩১৫ জনকে ২৫টি ভিন্ন অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট্ট নৌকায় করে এই বিশাল সমুদ্র পাড়ি দেয়৷ আবহাওয়ার উন্নতি হলে এদের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন এক কোস্ট গার্ড৷

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৬ সালে রেকর্ড পরিমাণ অভিবাসনপ্রত্যাশী সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে এবং নিগৃহীত হয়েছে লাখো মানুষ৷ এ বছরের শুরুতেই ইটালিতে ১৬ হাজার অভিবাসী এসেছে, গত বছর ঠিক এই সময়টাতে যেখানে পাঁচ হাজার অভিবাসী ইটালিতে প্রবেশ করেছিল৷

এপিবি/ডিজি (এপি, এএফপি, ডিপিএ)

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যতা থেকে পালানো

২০১৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘ইসলামিট স্টেট’-এর বিস্তার ঘটার পর সিরীয়দের দেশত্যাগের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়৷ একইসময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নিগার এবং কসভোর অনেক মানুষ ইউরোপমুখী হন৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

সীমান্তের ওপারে আশ্রয় খোঁজা

সিরীয় শরণার্থীদের অধিকাংশই ২০১১ সাল থেকে সে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন তুরস্ক, লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন৷ কিন্তু ২০১৫ সাল নাগাদ সেসব দেশের শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা সন্তানদের শিক্ষা দিতে না পারায় এবং কাজ না পাওয়ায় এক পর্যায়ে আরো দূরে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

পায়ে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি

২০১৫ সালে ১৫ লাখের মতো শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে পায়ে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে চলে আসেন৷ সেসময় ইউরোপের শেঙেন চুক্তি, যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশের মধ্যে ভিসা ছাড়াই চলাচাল সম্ভব, নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ কেননা শরণার্থীরা গ্রিস থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলোর দিকে আগাতে থাকেন৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

সমুদ্র পাড়ির উন্মত্ত চেষ্টা

সেসময় হাজার হাজার শরণার্থী ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করেন৷ লিবিয়া থেকে ইটালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত আটশ’ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

সীমান্তে চাপ

ইউরোপের বহির্সীমান্তে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কয়েকটি রাষ্ট্র চাপে পড়ে যায়৷ হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক পর্যায়ে সীমান্তে বেড়া দিয়ে দেয়৷ শুধু তাই নয়, সেসময় শরণার্থী আইন কঠোর করা হয় এবং শেঙেনভুক্ত কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

বন্ধ দরজা খুলে দেয়া

জার্মান চ্যান্সেল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর ‘ওপেন-ডোর’ শরণার্থী নীতির কারণে বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অনেক শরণার্থীই ইউরোপে আসতে উৎসাহ পেয়েছেন৷ এক পর্যায়ে অবশ্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে জার্মানিও৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি

২০১৬ সালের শুরুতে ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যে একটি চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির আওতায় গ্রিসে আসা শরণার্থীদের আবারো তুরস্কে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করে৷ নভেম্বর মাসে অবশ্য তুরস্কের ইইউ-তে প্রবেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণার পর, সেই চুক্তি আবারো নড়বড়ে হয়ে গেছে৷

ইউরোপে শরণার্থী সংকট কীভাবে শুরু হয়েছিল?

পরিস্থিতি বদলের কোনো লক্ষণ নেই

ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকলেও সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলার কোনো সঠিক পন্থা এখনো খুঁজে পাননি৷ কোটা করে শরণার্থীদের ইইউ-ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সহিংসতার ইতি ঘটার কোনো লক্ষণও নেই৷ ওদিকে, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে৷

আমাদের অনুসরণ করুন