শরণার্থী সংকটের ইউরোপীয় সমাধানসূত্র চান ম্যার্কেল, মাক্রোঁ

ইউরোপে শরণার্থী সংকট সামাল দিতে সামগ্রিক সমাধানসূত্র তুলে ধরলেন ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষ নেতারা৷ ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবও তাতে স্থান পেয়েছে৷ এভাবে জার্মান চ্যান্সেলর ম্যার্কেল তাঁর সরকারের রাজনৈতিক সংকটও মেটাতে চান৷

শরণার্থী নীতিকে কেন্দ্র করে দেশের মধ্যে কোণঠাসা ম্যার্কেল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ'র সমর্থন পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলেন৷ মঙ্গলবার বার্লিনের উপকণ্ঠে শীর্ষ বৈঠকের পর মাক্রোঁ বলেন, শরণার্থীরা ইউরোপের যে দেশে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেছে, যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের সেখানে ফেরত পাঠাতে হবে৷ এই লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সমাধানসূত্র খুঁজে বের করতে হবে৷ মাক্রোঁ এ ক্ষেত্রে ম্যার্কেলের সঙ্গে কাজ করতে চান৷ অর্থাৎ, শরণার্থী নীতির প্রশ্নে ম্যার্কেল একতরফা পদক্ষেপের বদলে ইউরোপীয় স্তরে সমাধানসূত্রের যে উদ্যোগ নিচ্ছেন, সেই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানালেন মাক্রোঁ৷

ম্যার্কেল বলেন, মাক্রোঁ ও তিনি ইউরোপে আরও বিভাজন চান না৷ তাঁদের মতে, ইউরোপীয় সংকটের মুখে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের বদলে সাধারণ সমাধানসূত্র প্রয়োজন৷ তা না হলে শেঙেন চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং তার ফলে ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাবে৷ তবে মাক্রোঁ ও ম্যার্কেল ইউরোপীয় চুক্তি অমান্য করে দায়িত্ব এড়িয়ে শরণার্থীদের অন্য দেশে ঠেলে দেবার প্রথার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর৷ অর্থাৎ, এক দেশে শরণার্থীরা নথিভুক্ত হবার পর তাঁদের সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে দেওয়া হবে না৷ উল্লেখ্য, এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে জার্মানির জোট সরকারের মধ্যে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷ বাভেরিয়ার সিএসইউ দল ইউরোপীয় বা দ্বিপাক্ষিক সমাধানসূত্রের জন্য অপেক্ষা না করে অবিলন্বে একক পদক্ষেপ নিতে চায়৷ আপাতত তারা ম্যার্কেলকে দুই সপ্তাহ সময় দিতে রাজি হয়েছে৷ এই সময়কালে ম্যার্কেল বিকল্প সমাধানসূত্র না পেলে জুলাই মাসে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে৷

ইউরোপীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টুস্ক ইউরোপের বাইরে শরণার্থী শিবির গড়ে তোলার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, ম্যার্কেল সে বিষয়ে আলোচনা করতেও প্রস্তুত৷ জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংগঠন আইওএম-এর সঙ্গে যৌথভাবে এমন শিবির পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছেন টুস্ক৷ তাঁর মতে, এমন কেন্দ্রে প্রকৃত শরণার্থী ও অর্থনৈতিক শরণার্থীদের দ্রুত আলাদা করা সম্ভব হবে৷ বিপজ্জনক পথে ইউরোপে অনুপ্রবেশের বদলে আইনি পথে শরণার্থীদের এমন কেন্দ্রে যেতে উৎসাহ দেওয়া হবে৷ এখনো পর্যন্ত কোনো দেশের নাম প্রস্তাব না করা হলেও লিবিয়া ও আলবেনিয়ায় এমন কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা আলোচিত হচ্ছে৷ আগামী ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে এই প্রস্তাবের খসড়া পেশ করা হবে৷ বেআইনি অনুপ্রবেশ রুখতে ম্যার্কেল সেই সঙ্গে আইনি পথে শরণার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থার পক্ষেও সওয়াল করেছেন৷

মাক্রোঁ ও ম্যার্কেল এই প্রসঙ্গে ইউরোপ জুড়ে শরণার্থী গ্রহণের একক মানদণ্ডের উপর জোর দিয়েছেন৷ এই লক্ষ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এক ইউরোপীয় এজেন্সি বিভিন্ন দেশের আইনের মধ্যে সমন্বয় করবে৷ যেসব দেশে শরণার্থীদের আগমন ঘটে, তাদের সহায়তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন দুই নেতা৷ তাঁদের প্রস্তাবিত সার্বিক সমাধানসূত্রের আওতায় ইউরোপের বহির্সীমানা সুরক্ষা সংস্থা ফ্রন্টেক্সকে আরও শক্তিশালী করে তোলা হবে৷ তাছাড়া যেসব দেশ থেকে শরণার্থীরা আসছেন, সেই সব দেশের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হবে৷

বলা বাহুল্য, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এত বড় আকারের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না৷ তবে শরণার্থী সংকটের সমাধান করতে আগামী সপ্তাহে ইইউ শীর্ষ সম্মেলনেই এসব প্রক্রিয়া শুরু করতে চান ম্যার্কেল ও মাক্রোঁ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

গৃহহীন যারা

সহিংসতা, যুদ্ধ ও সংঘাতের ফলে বিশ্বে এখন ৬৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন, অর্থাৎ ৬ কোটি ৮৫ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন৷ মঙ্গলবার জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইইএনএইচসিআর এ কথা জানিয়েছে৷ জাতিসংঘের হিসেব মতে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল৷ সেবছর মূলত মিয়ানমার থেকেই বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল৷ .

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দু’ সেকেন্ডে একজন

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতবছরই ১ কোটি ৬২ লক্ষ মানুষ নতুন করে গৃহহীন হয়েছে৷ এদের মধ্যে যাঁরা প্রথমবার বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়েছেন, তাঁরাও যেমন আছেন, তেমনি আছেন যাঁরা আগে থেকেই উদ্বাস্তু, তাঁরাও৷ অর্থাৎ প্রতিদিন ৪৪,৪০০ মানুষ বিতাড়িত হচ্ছেন এবং প্রতি দু'সেকেন্ডে ১ জন করে গৃহহীন হচ্ছেন৷ যুদ্ধ, হিংসা এবং উৎপীড়নের জন্য ৬ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দেশের মধ্যে

অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ বা হিংসার জন্য দেশের ভেতরেই অনেক মানুষ বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হয়৷ তাঁদের বলা হয় আইডিপি (ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল)৷ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বিশ্বে প্রায় ৪কোটি আইডিপি ছিল৷ এই সংখ্যাটা আগের বছরের তুলনায় কমেছে৷ কলম্বিয়া, সিরিয়ায় এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

সিরিয়ার দুর্দশা

গত ৭ বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার ওপর দিয়ে নানা ঝড় বয়েছে৷ ২০১৭ সালের শেষ অবধি প্রায় ৬৩ লাখ মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল৷ এছাডা়ও সিরিয়াতে প্রায় ৬২ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

আফগানিস্তান

সিরিয়ার পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্থান৷ প্রচুর মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আফগানিস্তান থেকে পালাচ্ছেন৷ বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীনভাবে যুদ্ধ, সহিসংতা ও উৎখাতের কারণে প্রতিদিনই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে৷ অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব মানুষ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দক্ষিণ সুদানের অবস্থা

দক্ষিণ সুদানে গৃহযুদ্ধ চলছে ২০১৩ সাল থেকে৷ গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে গত কয়েক বছরে দেশটির লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে৷ জাতিসংঘের মতে, এই দেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

তুরস্ক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কে প্রচুর শরণার্থী রয়েছে৷ ২০১৭ সালের শেষের দিক পর্যন্ত তুরস্কে প্রায় ৩৫ লক্ষ শরণার্থী ছিল৷ তার মধ্যে অধিকাংশই সিরিয়ার মানুষ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

গরিব দেশেও

অ্যামেরিকা আর ইউরোপ যাঁরা পৌঁছচ্ছেন, তাঁরা ছাড়াও অনেক শরণার্থী কম আয় সম্পন্ন বা মধ্যম আয় সম্পন্ন দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন৷ জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশন (ইউএনএইচসিআর) বলছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ শরণার্থী উন্নয়নশীল দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, যাঁরা খুবই দরিদ্র৷ এদের মধ্যে আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার, সোমালিয়া, সুদান এবং কঙ্গো, উগান্ডার মানুষই বেশি৷

এসবি/এসিবি (ডিপিএ, রয়টার্স)

আমাদের অনুসরণ করুন