শিক্ষকদের মর্যাদা এখনো রীতিমতো বেশি, তবে...

শিক্ষকদের মর্যাদার ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে একটা উদ্বেগ আছে৷ উদ্বেগটা দুটি কারণে অমূলক, প্রথমত, শিক্ষকদের সাধারণ সামাজিক মর্যাদা আসলে যথেষ্ট আছে, দ্বিতীয়ত, শিক্ষকসমাজের কার্যকর মর্যাদা আসলেই কমেছে এবং কমছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

হ্যাঁ, শিক্ষকদের সাধারণ সামাজিক মর্যাদা যথেষ্টই আছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকসমাজ সেই মর্যাদার অপব্যবহারও করে থাকেন৷ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, রাস্তায় কিংবা অফিসে শিক্ষক-পরিচয়টা বেশ কাজ করে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ক্লাসের রাজনীতিপুষ্ট রাগী যুবারা শিক্ষকদের সামনে যেরকম মাথা নুইয়ে থাকে, তাতে শিক্ষকের মর্যাদা-ঘাটতির কোনো আলামত প্রকাশিত হয় না৷ আমার আন্দাজ, বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ অন্য কোনো যোগ্যতায় নয়, কেবল শিক্ষকতার চাকরি করেন বলে যে শ্রদ্ধা-সম্মান ভোগ করেন, বেশির ভাগ শিক্ষকের ক্ষেত্রেই তা রীতিমতো বেশি৷

কিন্তু এ ব্যাপারে যাদের উদ্বিগ্ন হওয়াটা কাজের, এ ব্যাপারে যাদের উদ্যোগ-আয়োজন করার কথা, তাদের কোনো মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না৷ যারা উদ্বিগ্ন, তাদের কিছু করার ক্ষমতা নাই৷ তার চেয়ে বড় কথা, শিক্ষকের মর্যাদাটা আসলে কী বস্তু, আর তা কার্যকরভাবে বাড়ানোর উপায়ই বা কী, সে সম্পর্কে উদ্বিগ্নরা বেখেয়াল৷ এ কারণেই উদ্বেগটা অমূলক৷

হিন্দু বা মুসলমানের কাছে এবং সম্ভবত অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছেও, শিক্ষক খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ তার কারণ, ধর্মীয় শিক্ষায় সেকালে পারলৌকিক তাৎপর্যের সাথে বুনিয়াদি অর্জনেরও সুযোগ ছিল৷ আজকাল আমরা শিক্ষা ও শিক্ষক শব্দগুলো যে অর্থে ব্যবহার করি, তা একেবারেই আলাদা৷ ইংরেজ আমলে এ বস্তুর উদ্ভব ঘটেছিল মূলত ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পশ্চিমা আদব হাসিল করা এবং ঔপনিবেশিক সরকারের চাকরি বাগানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

অনন্ত সাদ

ঢাকা নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী অনন্ত সাদ একজন শিক্ষকের ছেলে৷ তাঁর মতে, ‘‘মাতা-পিতার পরেই যাঁদের স্থান তাঁরাই হলেন শিক্ষক৷ আর এটা আমরা শিখেছি পরিবার থেকেই৷ শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে যতই রাগারাগি করেন না কেন সেটা আমাদের ভালোর জন্যই করে থাকেন৷ আমার বাবাও একজন শিক্ষক এবং তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে শিক্ষকদের সম্মান করতে হয়৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

কাজী ফয়সাল আরেফিন

তিনিও ঢাকার নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী৷ তিনি মনে করেন, শিক্ষকদের সম্মান সবার উপরে৷ তাই শুধু ছাত্রদের নয়, সবারই উচিত শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান করা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মোহাম্মদ নাঈম

ঢাকার নটরডেম কলেজের আরেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাঈম৷ তাঁর মতে, ‘‘শিক্ষক হলেন আমাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার কারিগর৷ সেই শিক্ষকদের যদি সম্মান করা না হয় তাহলে আমাদের উন্নতি সম্ভব নয়৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

সুজানা জাহিদ

ঢাকার আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী সুজানা জাহিদ মনে করেন, শিক্ষকরা বাবা-মায়ের মতোই৷ সুজানা জানালেন, বাবা মা-কে যতটা সম্মান করেন, ঠিক ততটাই সম্মান করেন তিনি শিক্ষকদের৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মুনিয়া

ঢাকার মতিঝিল মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনিয়া শিক্ষকদের পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবেই দেখেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

সারজিমা হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষার্থী সারজিমা হোসেন তৃমার বাবা-মা দুজনই শিক্ষক৷ তাঁর মতে, ‘‘আমাদের সমাজে বর্তমানে শিক্ষকদের সম্মান অনেক কমে গেছে৷ তবে আমরা সবসময়ই শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দিয়ে থাকি৷ আরেকটা বিষয় হলো, রাজনৈতিকভাবে শিক্ষদের অনেক হেয়, অসম্মান করা হয় যেটা বন্ধ হওয়া উচিত৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

মেহনাজ জাহান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের আরেক শিক্ষার্থী মেহনাজ জাহান বলেন, ‘‘শিক্ষকরা আমাদের গুরুজন৷’’ তাঁর মতে, শিক্ষকরা একেকজন পিতা-মাতা৷ সুতরাং তাঁরা ‍যদি কোনো ভুলও করে থাকেন সেজন্য তাঁদের কোনোভাবেই অসম্মান করা যাবে না৷ ‘‘আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে সামান্য কিছু হলেও আমরা তাঁদের কাছে শিখেছি,’’ বলেন তিনি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ইফতেখার ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডি বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার ইসলাম৷ তিনি বলেন, ‘‘যাঁদের হাত ধরে এতদূর এসেছি, তাঁরাই হলেন আমাদের শিক্ষক৷ তাই তাঁদের সম্মান সবার আগে৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

মাহবুবুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান৷ তাঁর মতে, বাবা-মা কোনো ভুল করলে যেমন আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে যেতে পারিনা, তেমনি শিক্ষকরাও ভুল করলে তাঁদের অসম্মান করতে পারিনা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

তাহমিদ ইবনে আলম

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি সাহিত্যের শিক্ষার্থী৷ তাঁর মতে, শিক্ষকরা হাতে ধরে সবকিছু শিক্ষা দেন, সুতরাং তাঁদের সম্মান সবার আগে৷ কোনো শিক্ষার্থীরই উচিত হবে না শিক্ষকদের অসম্মান করা৷

শিক্ষক হিসাবে ডেভিড হেয়ার কিংবা ডিরোজিওর যে কিংবদন্তিতুল্য খ্যাতি, তার গোড়া আছে শিক্ষার ওই কেজো ভূমিকায়৷ শিক্ষকসমাজের মর্যাদা এরপর থেকে ক্রমাগত কমেছে, সঙ্গত কারণেই কমেছে; কিন্তু শ্রদ্ধা-সম্মানের স্মৃতিটা রয়ে গেছে৷ বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষকদের সম্মানের নামে যে বস্তুর আকাঙ্ক্ষাটা জায়মান আছে, তা আসলে অংশত ধর্মীয়, অংশত ঔপোনিবেশিক স্মৃতি৷ এমনিতে পেশাগত দিক থেকে শিক্ষকদের জন্য বাড়তি মর্যাদা খুব জরুরি কিছু নয়৷ খানিকটা বাড়িয়ে বলা যাক, এরকম মুফতে-পাওয়া সম্মান আসলে থাকাই উচিত নয়৷

আধুনিক দুনিয়ায় শিক্ষা এবং শিক্ষকের গুরুত্বের দিকটা একটু আলাদা৷ উন্নত সমাজগুলো মূলত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ৷ প্রক্রিয়ার দিক থেকে শিক্ষা এবং শিক্ষার নিয়ন্তা হিসাবে শিক্ষকসমাজ জ্ঞানের কারবারি৷ তাঁরা জ্ঞান নিয়ে কারবার করেন বলে তাঁদের মধ্যে ‘জ্ঞানী'র সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি৷ এই ‘জ্ঞানী' শিক্ষকদের কল্যাণেই গোটা পেশাটাই খানিক বাড়তি মর্যাদা পেয়ে যায়৷

শিক্ষকদের বাড়তি মর্যাদার ব্যাপারটা অবশ্য লিবারেল শিক্ষাতত্ত্বেও স্বীকৃত৷ মানুষ তার শৈশব-কৈশোরেই সাধারণত শিক্ষা-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়৷ ধরে নেয়া হয়, এ সময়ের বিনিয়োগ পুরো জীবনটা যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চয়ের জোগান দেবে৷ শিক্ষাকে ভাবা হতো এমন এক বিনিয়োগ, যার ধরণ ভিন্ন, মেয়াদ দীর্ঘ আর উৎপাদনও অনেক বেশি লাভজনক৷ এ প্রক্রিয়ার মুখ্য অনুঘটক হিসাবে শিক্ষকরা তাই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতেন৷ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নিও-লিবারেল শিক্ষানীতির প্রতাপে এ ধারণা অবশ্য বেশ কতকটা বদলে গেছে৷

Indien Schüler Symbolbild

এখন শিক্ষাকে আর দশটা পণ্যের মতোই দেখা হচ্ছে৷ স্বভাবতই সে শিক্ষার বাজারই এখন রমরমা, যে শিক্ষা বাজারে বিকোয়৷ বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে৷ বাজারি শিক্ষকগণ যথেষ্ট সম্মান পাচ্ছেন৷ সম্মানটা বাজারের নিয়ম মেনে নগদ মুদ্রাতেই পরিশোধিত হচ্ছে৷ উদ্বেগজনক কিছু ঘটছে না৷

কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার সামগ্রিক অবস্থা আসলেই ভয়াবহ এবং অবস্থার উন্নতিকল্পে দ্রুত উদ্যোগ-আয়োজন শুরু করা দরকার৷ লোকে সাধারণত অবস্থার ভয়াবহতা আঁচ করতে পারে, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারে না৷ ফলে শিক্ষকের মর্যাদাহানি ইত্যাদি কথার মোড়কে শিক্ষার দুরবস্থার কথাই আসলে প্রকাশ করে৷

আরেকটা বড় কারণ আছে্৷ কয়েক দশক আগেও বিপুল গ্রাম-বাংলায় শিক্ষিতের হার কম ছিল৷ অন্য পেশাজীবীর সংখ্যা কম ছিল৷ হাই স্কুলের হেডমাস্টার তখন অনেক বড় ব্যাপার ছিল৷ এ ধরনের বহু শিক্ষক যে ব্যাপক খাতির-যত্ন পেতেন, একটু মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, তার কারণ এঁদের অনেকেই ছিলেন আসলে গ্রামীণ এলিট৷ তাঁদের শিক্ষা, শিক্ষা-প্রদান এবং অপরাপর আভিজাত্যের মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ ছিল না৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথাই ধরা যাক৷ ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষক উঁচু সামাজিক মর্যাদা ভোগ করতেন৷ এর মূল কারণ, তখন সমাজের বিপুল সাধারণের মধ্যে শিক্ষকরা ছিলেন মাথা-তোলা উঁচু অংশ, একেবারে বুনিয়াদি সাফল্যের বিচারেই৷ এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে৷ সমাজের আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরি হয়েছে৷ শিক্ষকসমাজের আগের সামাজিক প্রাধান্য থাকার কোনো কারণই আর নেই৷ তাই এ ব্যাপারে হা-হুতাশ আসলে পশ্চাৎপদতা৷ বস্তুত, এ অবস্থা সমাজের প্রগতি নির্দেশ করে, সমৃদ্ধি নির্দেশ করে৷

Indien Hinduistische Priesterin Acharya Savitha

ভাবনাটা আসলে ভাবা উচিত কাঠামোগত দিক থেকে৷ মানুষ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ভাবতেই অভ্যস্ত৷ এ জন্যই আদর্শ শিক্ষকের ধারণাটা সমাজে এত প্রবল৷

আসলে আদর্শ শিক্ষক কোনো কাজের কথা নয়৷ হওয়া উচিত আদর্শ শিক্ষা-কাঠামো৷ সেই কাঠামোয় সমস্ত ব্যক্তি নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করবে৷ কেউ কেউ কাঠামোগত দায়িত্ব পালন করেও নিজের প্রতিভা ও তৎপরতায় ব্যক্তিগত সিদ্ধি প্রদর্শন করবে৷ তাঁরা বাড়তি সম্মান পাবেন৷ কিন্তু কিছুতেই কাঠামোকে গৌণ করে নয়৷ শিক্ষকের মর্যাদা বলে কোনো ধারণা যদি থেকেই থাকে, তাহলে তা অর্জিত হতে পারে একমাত্র শিক্ষাকাঠামোর মর্যাদা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে৷ তিন ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কথাটা বিশদ করছি৷

প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের মর্যাদা, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, একটা হাস্যকর ধারণা৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ শিক্ষকরা কাজ করেন হতশ্রী অফিসে, বেতন পান আশপাশের যে কোনো চাকুরের চেয়ে কম৷ সঙ্গত কারণেই অন্য চাকরি জোটাতে ব্যর্থ হয়েই সাধারণত লোকে মাস্টারির কাজ নেয়৷ তাহলে মর্যাদা জন্মাবে কোন ভিতের ওপর?

Mohammad Azam , Associate Professor of Bengali , Dhaka University.

মোহাম্মদ আজম, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের সালাম-আদাবকে সম্মান মনে করলে অবশ্য আলাদা কথা৷ কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার ক্ষেত্রেও মূল সমস্যা বস্তুগত ও নির্বস্তুক কাঠামোর সমস্যা বলা যায়, সমস্যাটা ‘ভালো' অফিসের্৷ বাংলাদেশের সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষক-নিবাস সম্পর্কে একটা দায়সারা জরিপ চালালেও বোঝা যাবে, অবকাঠামোর দৈন্য শিক্ষকদের মানুষ হিসাবে কতটা খাটো করে রাখে৷

আমলাতন্ত্রের প্রতাপের কথাও বলা দরকার৷ কলেজ-পর্যায়ের আরেকটা বড় সমস্যা শিক্ষকদের ক্যাটাগরি না করা৷ কাঠামোর মধ্যে ভালো-খারাপ চিহ্নিত করার বন্দোবস্ত না থাকায় সুস্থ প্রতিযোগিতার ধারা গড়ে ওঠে না৷ নিজেদের সম্মানের আকাঙ্ক্ষা না থাকলে বাইরের সম্মান আসবে কিভাবে?

উপরে যে দুই স্তরের কথা বললাম, তার কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য দরকার বিনিয়োগ৷ শুধুই বিনিয়োগ৷ ভালো অফিস অফিসারদের সম্মান বাড়াবে৷ আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা আকর্ষণীয় তরুণ-তরুণীকে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করবে৷ শিক্ষার মান ভালো করার একমাত্র উপায় কার্যকর প্রশিক্ষণ-কাঠামো৷ তার জন্যও দরকার বিনিয়োগ৷

পরিস্থিতি পাল্টালে সম্মানটা পায়ে হেঁটে ধরা দেবে৷ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবটা ভিন্ন৷ বাংলাদেশের শিক্ষকদের মধ্যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকরাই অন্য চাকরি না পেয়ে পড়াতে আসেন না৷ সাধারণত তাঁরা ক্লাসের সবচেয়ে ‘ভালো' ছাত্র৷ এ কারণে তাঁদের নিজেদেরও জোর থাকে, দশের কাছেও তাঁরা খাতির পেয়ে থাকেন৷

সম্প্রতি জাতীয় বেতন স্কেলে স্থান-নির্ধারণী লড়াইয়ে রীতিমতো প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, আমলাতন্ত্র সবার সাথে লড়ে শিক্ষকরা যে বিজয়ীর বেশে ফিরল, তার অন্যতম কারণ ওই ‘যোগ্যতা'৷ কিন্তু আগেও জানা ছিল, এ বাক-বিতণ্ডা থেকেই বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল, সমাজে শিক্ষকদের আগে যে পাত্তাটা ছিল, এখন আর তা নেই৷ সমাজে আছে, কিন্তু রাষ্ট্রে নেই; নীতি-নির্ধারকদের কাছে নেই৷

খেলো, করো, শেখো...

সিডনির ইউনিভার্সিটি অফ ওলংগং-এর ভেতরে ৩০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে তৈরি করা হয়েছে এই জাদুঘর৷ আর্লি স্টার্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এর ভাবনার ফসল এই জাদুঘরে শিশুরা মন মতো খেলতে পারে, কাজও করতে পারে৷ খেলতে খেলতে, কাজ করতে করতেই শিখে নেয় অনেক কিছু৷ ছবির এই দুই শিশু খেলাচ্ছলেই ঘর বানাতে শিখছে৷

জলদস্যুর জাহাজ

সিডনির এই জাদুঘর শুধু ১ থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছরের শিশুদের জন্য৷ শিশুদের সঙ্গে তাদের বাবা-মা-ও আসতে পারেন৷ জাদুঘরে ঢোকার মুখেই রয়েছে একটি জলদস্যুদের জাহাজ৷ সেই জাহাজে গিয়েও শিশুরা খেলতে খেলতেই শেখে৷ পুঁচকেরা হামাগুড়ি দিতে দিতেই এক সময় হাঁটতে শেখে, যারা হাঁটতে জানে, কথা বলতে পারে তারা সেই জাহাজে ঘুরে ঘুরেই নেয় সাহিত্য, সংস্কৃতির সহজ পাঠ৷

বিশ্বের প্রথম...

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিশুদের জন্য বিশ্বের প্রথম জাদুঘর এটি৷ সেখানে খেলাচ্ছলে প্রত্নতত্ত্বের মতো কঠিন বিষয়ের সঙ্গেও পরিচিত হয় শিশুরা৷ প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতো কাজ করার জন্য বিশেষ কিছু স্থানও সেখানে তৈরি করা হয়েছে৷ স্থানগুলোর কিছু অংশ পাথুরে, কিছু অংশ আবার গর্তে ভরা৷ মাটি খনন করার সরঞ্জামও আছে শিশুদের এই জাদুঘরে৷

জীবন্ত যন্ত্র

অদ্ভুত আর বিশাল এক যন্ত্রের হা করা মুখের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে খেলছে দু’টি শিশু৷ যন্ত্রটি জীবন্ত প্রাণীর মতো৷ প্রাণী যেমন শ্বাস নিয়ে শ্বাস ছাড়ে, এই যন্ত্রও সেভাবে বাতাস বের করে মুখ দিয়ে৷

কেনাকাটা শেখা

জাদুঘরের এই অংশটির নাম ‘মার্কেট প্লেস’৷ এখানে শিশুরা কেনাকাটা সম্পর্কে ধারণা নেয়৷ বড় হয়ে এই কাজগুলো তো করতেই হবে, ভালো কাজ কম বয়সে শিখলে তো ক্ষতি নেই! ২০১৫ সালের মে মাসে উদ্বোধন হয়েছে সিডনির এই জাদুঘরটির৷ এ পর্যন্ত ১০ হাজার শিশু গিয়েছে সেখানে৷ অনেকের আবার দু-তিনবার গিয়েও সাধ মেটেনি৷

আগে ছিল, এখন নাই-এ সত্যটা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি৷ তাঁরা এর কারণ অনুসন্ধান করেছেন৷ আগের যুগের অনেক বাঘা বাঘা শিক্ষকের নজির টেনেছেন৷ এখন আর সেরকম পয়দা হচ্ছে না বলে আফসোস করেছেন৷

কেউ কেউ শিক্ষকদের রাজনৈতিক সক্রিয়তাকেই এ অবনয়নের প্রধান কারণ ভেবেছেন৷ এ চিন্তাগুলো গলদপূর্ণ৷ আগেই বলেছি, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পুরানো প্রতাপ এখনো বিদ্যমান থাকার কোনো কারণ নেই৷ আর না থাকাটাও আফসোসের কারণ নয়৷ কিন্তু সারা দুনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে মর্যাদা পান তা বাংলাদেশেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত৷ হয়নি যে তার কারণ, শিক্ষকদের রাজনীতি নয়৷

অনেকেই জানেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় শিক্ষকদের একটা বড় অংশ শিক্ষক-গবেষক হিসাবে ভালো৷ রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং নির্লজ্জ পক্ষপাত যথেষ্ট ক্ষতি করে বটে, কিন্তু এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনতির মূল কারণ নয়৷ মূল সমস্যা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুবই কম টাকায় চলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা নাই এবং উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার লেশমাত্র সম্পাদন না করেই এক-একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় নাম নিয়ে বসে আছে৷

আফগানিস্তান: প্রগতি

মহাজেরা আর্মানি উত্তর আফগানিস্তানের জালালবাদের কাছে একটি মেয়েদের ক্লাসের শিক্ষিকা৷ ২০০১ সালে তালেবান জঙ্গিরা বিতাড়িত হওয়ার আগে এই অঞ্চলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়াই বারণ ছিল৷ আজ মেয়েদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়মিতভাবে স্কুলে যায়৷

জাপান: ডিসিপ্লিন

টোকিও-র তাকিনাগাওয়া প্রাইমারি স্কুলের পড়ুয়ারা দুপুরে খেতে বসেছে৷ জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বসেরাদের মধ্যে গণ্য৷ পিসা-র জরিপে জাপান নিয়মিতভাবে প্রথম দশটি দেশের মধ্যে পড়ে৷ অবশ্য বলা হয় যে, স্কুলে ভালো করার জন্য ছেলে-মেয়েদের ওপর বড় বেশি চাপ দেওয়া হয়ে থাকে৷

ব্রাজিল: ভাসন্ত স্কুল

মানাউস-এর ‘দ্বিতীয় সাও জোসে’ স্কুলটি বস্তুত নদীবক্ষে৷ তা-ও আবার যে কোনো নদী নয়: খোদ অ্যামাজোন! অবশ্য ব্রাজিলেও সরকারি স্কুলগুলোর বিশেষ সুনাম নেই৷ ওদিকে বেসরকারি স্কুলগুলোর মান ভালো হলেও, তাদের ফি বেশি৷

যুক্তরাষ্ট্র: সমৃদ্ধির দেশে অসাম্য

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিল্পোন্নত দেশগুলির মধ্যে প্রথম সারিতে৷ অথচ এখানকার শিক্ষাব্যবস্থায় ধনি-দরিদ্রের ফারাক আছে, বলে অভিযোগ৷ শ্বেতাঙ্গ ছেলে-মেয়েরা কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা ল্যাটিন অ্যামেরিকান ছেলে-মেয়েদের চেয়ে ভালো ফলাফল করে থাকে৷ চিকাগোর এই প্রাইমারি স্কুলটিতে অবশ্য এখনও ফলাফল নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই৷

ভিয়েতনাম: অন্ধকারে দেহ আলো

আলো নেই, বই নেই, তা সত্ত্বেও ভিয়েতনামে এই তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়ারা পড়া করে চলেছে৷ মনে রাখতে হবে: বিশ্বব্যাপী পিসা জরিপে কিন্তু ভিয়েতনাম জার্মানির চেয়ে ভালো ফলাফল করেছে৷

ব্রিটেন: পরিপাটি

ইংল্যান্ডে স্কুলের ইউনিফর্ম চালু হয়েছে বহু যুগ আগে৷ মিডলসেক্স-এর ‘হ্যারো’ স্কুলে হ্যাট পর্যন্ত পরতে হয়৷ মজার কথা, সুদীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটিতে কিন্তু ইউনিফর্ম সংক্রান্ত কোনো লিখিত নিয়মাবলী নেই৷

পাকিস্তান: পথে বসে

অথবা পার্কে বসে পড়াশোনা৷ লক্ষণীয় যে, মেয়েরা আর ছেলেরা একসঙ্গে বসেই পড়াশোনা করছে, পাকিস্তানের সর্বত্র যেটা সম্ভব নয়৷

মরক্কো: বেগুনি রঙের ক্লাসরুম

রাবাত-এর উদাইয়া প্রাইমারি স্কুলের ক্লাসরুমটি সুন্দর করে রং করা৷ মুশকিল এই যে, গোড়ায় ৯২ শতাংশ ছেলে-মেয়ে স্কুলে গেলেও, পনেরোয় পা দেবার আগেই তাদের অর্ধেক স্কুল ছেড়ে দেয়৷ ১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ লিখতে-পড়তে জানে না৷

কেনিয়া: বস্তির স্কুল

কেনিয়ায় ২০০৩ সাল থেকে প্রাইমারি স্কুলে যেতে ফি লাগে না৷ তবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বিশেষ বাড়ানো হয়নি৷ ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা বেশি৷ নাইরোবির দক্ষিণে কিবেরা বস্তি এলাকার এই স্কুলটিতে বেঞ্চের চেয়ে পড়ুয়া বেশি৷

মালয়েশিয়া: সুখি ছাত্রছাত্রী

পিসা জরিপে মালয়েশিয়ার ছাত্রছাত্রীরা বলেছে, তারা সুখি৷ নুরুল ইমান মাদ্রাসার পড়ুয়াদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য৷

ইউক্রেন: নানা ভাষা

ইউক্রেনে ছেলে-মেয়েরা ক্লাস ওয়ান থেকেই যে কোনো একটা বিদেশি ভাষা শিখতে শুরু করে৷ কিয়েভ-এর এই লাইসিয়াম বা হাই স্কুলটিতে পঞ্চম শ্রেণি থেকে একটি দ্বিতীয় বিদেশি ভাষা শিখতে হয়৷ ছাত্রছাত্রীদের অনেকে ইউক্রেনীয় ও রুশ ভাষা ছাড়া ইংরেজি, ফরাসি অথবা জার্মান বলতে পারে৷

চিলি: পড়ার কি কোনো শেষ আছে?

সান্তিয়াগোর ‘লাউরা ভিকুনা’ সান্ধ্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বয়স হয়েছে বটে, তবুও তারা এককালে যে স্কুলের পড়া শেষ করতে পারেননি – সম্ভবত আর্থিক সামর্থ্য ছিল না বলে – আজ সেটাই সমাপ্ত করতে বদ্ধপরিকর৷

বাংলাদেশের সমাজে এবং এমনকি শিক্ষকদের মধ্যে এ চিন্তা অত্যন্ত দুর্বল যে, শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিদ্যা বা কৃতিত্বের সাথে প্রতিষ্ঠান-কাঠামোর উৎকর্ষের সম্পর্ক অতি অল্প৷ বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ হয় গবেষণার সাফল্যের জন্য; গবেষণার ফল ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্র আর সমাজের বিচিত্র কাজে, মানুষের সামগ্রিক কায়কারবারে৷ বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়া চালু নাই৷ ফলে খারাপ শোনালেও বলা দরকার, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আসলে তাঁদের প্রাপ্যের চেয়ে বেশি মূল্য পেয়ে থাকেন৷

উপরে শিক্ষার তিনটি স্তর সম্পর্কেই আর্থিক গরিবির কথা বলা হয়েছে৷ আসলেই গরিবিই শিক্ষা এবং শিক্ষকদের মর্যাদাহানির মূল কারণ৷ বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দের হার জিডিপির দুই শতাংশের কম, যেখানে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় এ হার চারেরও বেশি৷ উন্নত বিশ্বের কথা না-ই বা তুললাম৷ লিবারেল জমানায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সামান্যই পালন করছে৷ এখন নিও-লিবারেল দৃষ্টান্ত দিয়ে নিজের দায় চাপাতে চাচ্ছে বেসরকারি খাতে৷ এমতাবস্থায় শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা না কমার কোনো কারণ নাই৷ ন্যূনতম বরাদ্দ নিশ্চিত করার ব্যাপারে উদ্বেগ না দেখিয়ে শিক্ষকের মর্যাদার ঘাটতি নিয়ে যদি সমাজ ক্রমাগত উদ্বেগ দেখাতে থাকে, তাহলে তাকে অমূলক ছাড়া আর কী বলা যায়?

মোহাম্মদ আজম, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক অবমাননার কয়েকটি ঘটনার পরও লেখক মনে করেন, বাংলাদেশে শিক্ষকরা এখনও যথেষ্ট মর্যাদা পান৷ আপনি কী মনে করেন? লিখুন নীচের ঘরে৷

হ্যাঁ, শিক্ষকদের সাধারণ সামাজিক মর্যাদা যথেষ্টই আছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকসমাজ সেই মর্যাদার অপব্যবহারও করে থাকেন৷ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, রাস্তায় কিংবা অফিসে শিক্ষক-পরিচয়টা বেশ কাজ করে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ক্লাসের রাজনীতিপুষ্ট রাগী যুবারা শিক্ষকদের সামনে যেরকম মাথা নুইয়ে থাকে, তাতে শিক্ষকের মর্যাদা-ঘাটতির কোনো আলামত প্রকাশিত হয় না৷ আমার আন্দাজ, বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ অন্য কোনো যোগ্যতায় নয়, কেবল শিক্ষকতার চাকরি করেন বলে যে শ্রদ্ধা-সম্মান ভোগ করেন, বেশির ভাগ শিক্ষকের ক্ষেত্রেই তা রীতিমতো বেশি৷