শিশুরা যে স্বপ্ন দেখতে পারে এই তো বেশি

কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই সমাজ-বিচ্ছিন্ন থেকে, পরিবারের ভূমিকা এবং দায়িত্ব অস্বীকার করে এগোতে পারে না৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সুনাগরিক গড়ার ভিত্তিস্থান হিসেবে দেখতে চাইলে সবার আগে পরিবার এবং সমাজের দিকে তাকাতেই হবে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ঘর আর ঘরের বাইরের পরিপার্শ্ব মিলিয়ে যে দুনিয়াটা, তা-ই আসলে সবচেয়ে বড় শিক্ষাক্ষেত্র৷ আমাদের দেশে শিশু-কিশোররা সেখানে কী শেখে? কি শেখাতে পারছি আমরা? শেখানোর জন্য বাবা-মা বা পরিবারের অন্যরা কতটা প্রস্তুত? সমাজইবা কতটা শিক্ষাবান্ধব?

ঘরে আর ঘরের চারপাশে কী কী আছে, যা সুশিক্ষায় সহায়ক? পরিবারে বই, বিশেষ করে স্কুলে অবশ্যপাঠ্য নয় এমন বই পড়ার অভ্যেস আছে ক'জনের? পাড়ায়, স্কুল-কলেজে পাঠাগার আছে? বাড়ির কাছে মাঠ আছে খেলার? পরিবারে বড়দের কোনো আগ্রহ আছে ছোটদের পাঠাগারে যেতে উদ্বুদ্ধ করার?

বাংলামোটরে নতুন ভবন

ঢাকার বাংলা মোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের নতুন ভবন৷ নয় তলা বিশিষ্ট এ ভবনের প্রায় ৫৭,০০০ বর্গফুট জুড়ে আছে সমৃদ্ধ পাঠাগার, চিত্রশালা, মিলনায়তন, সংগীত ও চলচ্চিত্র আর্কাইভ, অতিথি কক্ষ, বই বিক্রয় কেন্দ্র ইত্যাদি৷

প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ৷ গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে যিনি নিরন্তর কাজ করে চলছেন আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে৷

যেখানে আছে দুই লাখ বই

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ভবনের ‘কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি’৷ এর সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় আছে প্রায় দুই লাখ বই৷ বছরে দশ হাজারের মতো পাঠক-পাঠিকা এই গ্রন্থাগার থেকে বই পড়ার সুযোগ পান৷ শুধু পাঠাগারেই নয়, এখান থেকে বই বাড়িতে নিয়ে পড়ারও সুযোগ আছে৷

প্রকাশনায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের নানান কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম প্রকাশনা কার্যক্রম৷ এই কর্মসূচির আওতায় বাংলা ভাষাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ভাষার শ্রেষ্ঠ বইগুলো প্রকাশ করে থাকে৷

ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার

বাংলাদেশে ভালো গ্রান্থাগার ব্যবস্থার অভাববোধ থেকেই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র চালু করে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ব্যবস্থা৷ এই ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত সময়ে শহর ও গ্রাম মিলিয়ে গড়ে ৪০টি এলাকায় গিয়ে আধঘণ্টা থেকে দু’ঘণ্টা পর্যন্ত সদস্যদের মধ্যে বই দেওয়া-নেওয়া করে৷ ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এই কার্যক্রম বর্তমানে বাংলাদেশের ৫৮টি জেলার ২৫০টি উপজেলার ১৯০০ লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে৷

আছেন গ্রন্থাগরিক

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিগুলোর প্রতিটিতে কজ করেন একজন করে গ্রন্থাগারিক বা লাইব্রেরিয়ান৷ পাঠকদের কাছে বই বিতরণ, পাঠ শেষে বই বুঝে নেয়সহ ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির তদারকি করেন তাঁরা৷

সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারে সাধারণ সসদ্য ও বিশেষ সদস্য হয়ে বই পড়ার সুযোগ আছে সমাজের সব শ্রেণির, সব বয়সের মানুষের৷ সদস্যরা সপ্তাহের নির্ধারিত সময়ে এলাকায় আসা লাইব্রেরি থেকে পছন্দের বইটি বাড়িতে নিয়ে পড়ার সুযোগ পান৷

গাড়িতে পছন্দের বই পড়ার সুযোগ

সপ্তাহের নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন এলাকায় যাওয়া বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারে বসেও বই পড়ার সুযোগ আছে পাঠকদের৷ এছাড়াও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে আছে দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, আলোর স্কুল, আলোর পাঠশালা, শ্রবণ দর্শন, প্রাথমিক শিক্ষকদের বই পড়ার কর্মসূচি ইত্যাদি৷

‘খেলাঘর', ‘কচিকাঁচার আসর'-এর মতো শিশুদের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার সংগঠনগুলো যে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে চলেছে, তা কি আমরা লক্ষ্য করছি? স্বাধীনতার পরও অনেক বছর যেসব ঘরে সকাল-সন্ধ্যা হারমোনিয়াম-তবলা বেজেছে, সেরকম ঘর এত কমে গেল কেন তা কি ভেবে দেখেছি? কেন ঘরে-রাস্তায়-রেডিও-টেলিভিশনে হিন্দি ছবি আর টিভি চ্যানেলের প্রভাব এত বেশি? কেন এত বেশি নারী পোশাকে বাঙালির চেয়ে বেশি আরবি?

স্বাধীনতার চার বছর পূর্তির আগেই যে ইতিহাস চাপা দেয়া এবং বিকৃতির শুরু হয়েছিল, আমরা কি তাতে ইতি টানতে পেরেছি? ৪৫ বছরে সংবিধানে কাঁটাছেড়া হয়েছে কতবার?

শিক্ষার আগে তো যাদের ‘শিক্ষা' দেয়া হবে সেই শিশু-কিশোরদের ভালোভাবে রক্ষাও করা দরকার৷ তাদের সব অর্থে ‘সুস্থ' রাখার পরিবেশ দরকার৷ তেমন পরিবেশ আদৌ আছে?

এ সব প্রশ্ন এড়িয়ে বা অগ্রাহ্য করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সুশৃঙ্খল হতে পারে? হয়েছে কোথাও? বরং উল্টোটাই তো হয়৷ রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা অনুযায়ীই একটি দেশের শিক্ষাকাঠামো গড়ে ওঠে৷ একে অন্যের পরিপূরক না হলেই দেখা দেয় বিপত্তি৷

পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থার যত গুণকীর্তনই আমরা করি না কেন, ভুলে গেলে চলবে না, সেখানেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে৷ অনেক বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্বকেই তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে স্বশিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিতে দেখেছি৷

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

যেমন আইজাক আসিমভ৷ সায়েন্সফিকশন লেখক হিসেবেই বেশি পরিচিত তিনি৷ ছিলেন বস্টন ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক৷ অন্তত পাঁচ'শ বই লিখেছেন অথবা সম্পাদনা করেছেন৷ তাঁর লেখা ৯০ হাজার চিঠি এবং পোস্টকার্ডও শিল্পতুল্য৷ এমন প্রতিভাধর এক শিল্পীও মনে করতেন, ‘স্বশিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা'৷

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি স্বশিক্ষায় সহায়ক, নাকি অন্তরায়? বিশ্বের সব দেশেই এ নিয়ে বিতর্ক আছে৷ অনেক প্রাতঃস্মরণীয়ই কোনোদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চৌকাঠ মাড়াননি৷ কেউ কেউ ‘প্রচলিত' শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি এত বিরূপ ছিলেন যে কেউ কেউ বলেই দিয়েছেন, পড়ালেখা আনন্দময় না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকাই ভালো৷

ফ্রাংক জাপা বলেছিলেন, ‘‘মনটা পচে যাওয়ার আগে স্কুল ছাড়ো৷'' যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তিতুল্য এই প্রয়াত শিল্পী মনে করতেন, মেধা এবং ইচ্ছাশক্তি থাকলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন করে স্বশিক্ষিত হলেই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হওয়া যায়

বাংলাদেশে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো শিক্ষাদানের ব্যবস্থা যে নেই এ কথা সবাই হয়ত মানবেন৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থেকেও যে কেউ জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার আশা করবে, সে উপায়ও নেই৷ তারপরও যে শিশুরা স্বপ্ন দেখছে এই তো বেশি!

আপনি কি আশীষ চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে একমত? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

মনোযোগ বাড়াতে চান ?

‘‘যখন নিজেকে ক্লান্ত মনে হবে বা যথেষ্ট মনোযোগ নেই পড়াশোনায়, তখন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে তা মনে রাখা সহজ হয়৷’’ টেক্সাসের একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ৩০০ ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে করা এক সমীক্ষার ফলাফল থেকে এই তথ্য জানা গেছে৷ যারা দাঁড়িয়ে পড়াশোনা করেছিলো, তাদের মনোযোগ ছিলো অনেক বেশি – যারা বসে পড়াশোনা করেছিলো তাদের তুলনায়৷ তাছাড়া বন্ধুদের সাথে পড়াশোনা বা আলোচনা করলেও বেশি মনে থাকে অনেকের৷

দায়িত্ববোধ

ছোটবেলা থেকেই যারা অস্থির প্রকৃতির হয়, পড়াশোনা বা অন্য কিছুতেও তেমন আগ্রহ নেই বা মন বসাতে পারেনা – তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছুটা ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হবে৷ অর্থাৎ শিশু বা ছাত্র-ছাত্রীকে কোনো পোষা প্রাণী কিনে দেয়া যেতে পারে৷ ছোট ভাই-বোনের খানিকটা দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে, যাতে করে ওরা কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারে, আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে৷ কারণ আত্মবিশ্বাসই পড়াশোনায় মনোযোগ এনে দেবে৷

ছাত্র-ছাত্রীদের চাই ভিটামিন ফুড

পড়ুয়াদের যে যথেষ্ট ভিটামিন দরকার সে কথা আর কে না জানে? তবে শুধু জানা নয়, তা কার্যে পরিণত করতে হবে৷ তাই ছাত্র-ছাত্রীদের চাই যথেষ্ট ভিটামিন, মিনারেল এবং পানীয় – অর্থাৎ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার৷ প্রধান খাবারের ফাঁকে ফাঁকে আপেল খাওয়া যেতে পারে, যাতে মিনারেল, আয়রন এবং প্রচুর ভিটামিন রয়েছে৷ জার্মানরা প্রচুর আপেল খায়, মনোযোগ ঠিক রাখতে জার্মানির কোন কোনো স্কুলের টিফিনে আপেল খেতে দেয়া হয়৷

ব্রেনের খাবার

বিভিন্ন বাদাম – বিশেষ করে আখরোট, সামুদ্রিক মাছ, শাক-সবজি, ফল, গ্রিন- টিসহ বিভিন্ন চা৷ যা শরীর এবং মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী৷ পড়াশোনার মাঝে পাকা টমেটো বা টমেটোর জুসও খাওয়া যেতে পারে৷ কারণ মাত্র ১০০ গ্রাম টমেটোতে আছে ২৫ গ্রাম ভিটামিন ‘সি’ এবং পটাশিয়াম৷ কাজেই পান করতে পারেন ছাত্র-ছাত্রীরা টমেটোর জুস বা অন্য কোন ফল বা সবজির রসও৷

ফাস্টফুড!

ফাস্টফুডে ব্যবহার করা হয় নানা রকম রাসায়নিক উপাদান, যা অনেকের ক্ষেত্রেই অ্যালার্জির কারণ হয়ে থাকে এবং যা মনোযোগ এবং শরীরে তার প্রভাব ফেলে৷ জার্মানির খাদ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়ুর্গেন শ্লুইটারের মতে, ‘‘দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে ভুক্তভোগী অনেকেই সেকথা জানতে বা বুঝতে পারে না৷’’ আজকের তরুণদের প্রিয় খাবার ফাস্টফুড এবং মিষ্টি পানীয় হলেও শরীর ও মস্তিষ্কের কথা মনে রেখে সে সব থেকে কিছুটা সাবধান হওয়া উচিত৷

ব্রেনের বিশ্রাম

আজকাল দেখা যায় অনেকে পড়ার ফাঁকে একটু বিশ্রামের জন্য ফেসবুকে ঢোকেন বা গেম খেলেন, যাতে আসলে মোটেই বিশ্রাম হয় না৷ তার চেয়ে বরং কর্মক্ষমতা বাড়ায় সেরকম ছোট এক টুকরো ডার্ক চকলেট মুখে দিয়ে পছন্দের গান শুনতে পারেন৷ অথবা বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেন৷ সোজা কথা মনোযোগটাকে কিছুক্ষণের জন্য অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া৷ এতে করে মাথাটা খালি তো হবেই এবং পড়াশোনায়ও মনোযোগ ফিরে আসবে৷

খেলাধুলা বা ব্যায়াম

গবেষকরা মনে করেন, শারীরিক পরিশ্রম অর্থাৎ খেলাধুলা বা ব্যায়াম যে কোনো মানুষকে যে কোনো চাপ থেকে সহজে মুক্তি দিতে সাহায্য করে৷ ব্যায়াম বা খেলাধুলা করার ফলে শরীরে হরমোনের প্রকাশ ঘটে কিছুটা অন্যভাবে৷ আর স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়ে মনোযোগেও৷

ঘর আর ঘরের বাইরের পরিপার্শ্ব মিলিয়ে যে দুনিয়াটা, তা-ই আসলে সবচেয়ে বড় শিক্ষাক্ষেত্র৷ আমাদের দেশে শিশু-কিশোররা সেখানে কী শেখে? কি শেখাতে পারছি আমরা? শেখানোর জন্য বাবা-মা বা পরিবারের অন্যরা কতটা প্রস্তুত? সমাজইবা কতটা শিক্ষাবান্ধব?

সংশ্লিষ্ট বিষয়