শিশুর বিনোদন, শিশুর পৃথিবী

শিশুর বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ কি আছে বাংলাদেশে? টেলিভিশনে কী দেখে শিশুরা? অবসর সময় কাটানোর জন্য কী কী পায় তারা অন্যান্য মাধ্যমে? কী কী নিয়ে গড়ে উঠছে আমাদের শিশুদের পৃথিবী?

‘শিশু একটা খেলনা ছুড়ে ফেললো; ছুড়ে ফেললো মানে সে অবহেলা করলো, তা নয়৷ এর মানে হলো, খেলনাটা কত দূরে পড়ে, কীভাবে পড়ে, কীভাবে শব্দ হয় – এই জিনিসগুলো শিশুর মধ্যে নাড়া দেয়৷ খেলা মানে শুধু দৌড়-ঝাঁপ নয়, সে একটা খেলনা দিয়ে খেলতে পারে, একটি পুতুল দিয়ে খেলতে পারে, একটি পাতার দিকে তাকিয়ে খেলতে পারে, নাটকে অভিনয় করতে পারে – এ সবই হচ্ছে একটি শিশুর জন্য খেলা৷ আর খেলাই হলো শিশুর বিনোদন৷'' শিশু শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ফারহানা মান্নান শিশু বিনোদনের এই ব্যখ্যা দিয়ে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শিশুর সঠিক বিনোদনই তার পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করে৷ আর এই বিনোদন ঘরে-বাইরে-স্কুলে সবখানেই তাকে দিতে হবে৷''

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ঢাকার শুক্রাবাদে ইউনিক্যাফে নামে একটি ফাস্টফুড সেন্টারে আছে শিশুদের জন্য প্লে-জোন৷ আর এই প্লে-জোনে আছে শিশুদের জন্য নানা ধরণের ভার্চুয়াল গেম৷ গাড়ি চালানো, বিমানে চড়া, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা অথবা সাফারি পার্কে প্রাণীদের জগতে ঘুরে বেড়ানো – সবই আছে সেখানে৷ তবে সবই ভার্চুয়াল৷ শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে এই প্লে-জোনে গিয়ে বেশ ভালো অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই খেলায় বুঁদ হয়ে থাকে৷ আর তখন বাবা-মা থাকেন মেবাইল ফোনে অথবা নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত৷ শিশুদের প্লে-জোনে ছেড়ে দিয়ে তাঁরা নিজেদের বিনোদনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন৷ শিশুরা ঠিক কী করে সেদিকে তাঁদের খেয়াল থাকে না৷ আর ওই খেলনাগুলো তাদের শিশুদের বয়স উপযোগী কিনা তা তাদের বিবেচনায় নেই৷

অডিও শুনুন 06:08
এখন লাইভ
06:08 মিনিট
বিষয় | 30.11.2016

‘শিশুদের বিনোদনের জায়গা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে’

এ রকম প্লে-জোন এখন ঢাকার ধানমন্ডি, কলাবাগান, গুলশান,বারিধারাসহ বিভিন্ন এলকায় গড়ে উঠেছে৷ কোথাও প্লে-জোনে শিশুদের ঢোকার শর্ত ফাস্টফুড কেনা৷ দামের ওপরে হিসেব করে গেম কয়েন দেয়া হয়৷ আবার কোথাও আলাদা টাকা দিয়ে গেম কয়েন কিনতে হয়৷ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক আর সাদ-মুসা সিটি-র প্লে-জোনে অভিভাবকরা বিরক্ত হলেও উপায় নেই, কারণ, ওখানে নেয়া ছাড়া শিশুদের আর কোথায় নিয়ে যাবেন তা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না৷ একজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, শিশুদের কিছু খেলা আছে অনেকটা জুয়ার মতো৷ এক ধাপের পর আরেক ধাপে যেতে পারলে ডিসকাউন্ট৷ কিন্তু সেখানকার সার্ভিসম্যানদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ৷ তাঁরা জানেন না কোন বয়সের শিশুদের জন্য কোন গেম৷ তাদের কাজ হলো কোনো বিবেচনাবোধ ছাড়াই যে কোনো বয়সের শিশুদের যে কোনো গেমস খেলতে উদ্বুদ্ধ করা৷ অভিভাবকরাও অনেক সময় কোন শিশুর জন্য কোন ধরণের গেম উপযোগী সে বিষয়ে সচেতন নন আর ঐ সব গেম আদৌ শিশুদের খেলার উপযোগী কিনা৷''

ফারাহানা মান্নান বলেন, ‘‘শিশুদের বিনোদনের দু'টি দিক৷ এক. মানসিক বিকাশ এবং দুই. শারীরিক বিকাশ৷ তাই শিশুদের বিনোদনের জায়গা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে৷ বিষয়গুলো হতে হবে ইন্টারঅ্যাকটিভ৷'' তিনি বলেন, ‘‘শিশু যেমন তার নানা বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটাবে খেলা বা বিনোদনের মধ্য দিয়ে, তেমনি বাইরে খেলার মধ্য দিয়ে তার সামাজিকতা বৃদ্ধি পাবে, শরীর গঠন হবে৷''

সংস্কৃতি

সেসেমি স্ট্রিট

শিশুদের অন্যতম প্রিয় এই শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে পরিবেশ বিষয়েও অনেক কিছু শেখানো হয়ে থাকে৷ যেমন পানি অপচয় করা ঠিক নয় কিংবা সবকিছু রিসাইকেল করা উচিত ইত্যাদি৷ মার্কিন জনপ্রিয় এই সিরিজটির বাংলা সংস্করণ ‘সিসিমপুর’ বাংলাদেশের শিশুদেরও বিনোদন দিচ্ছে৷ টুকটুকি, ইকরি, হালুম শিশুদের বেশ প্রিয়৷

সংস্কৃতি

ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট অ্যান্ড দ্য প্ল্যানেটিয়ার্স

মার্কিন এই টেলিভিশন সিরিজের মূল বিষয় ছিল পরিবেশ রক্ষা৷ সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলা, সাগর ও সেখানকার প্রাণীদের দূষণ থেকে রক্ষা করা, পাখিদের দেখাশোনা করা ইত্যাদি নানান বিষয় তুলে ধরা হয়েছে অনুষ্ঠানটিতে৷

সংস্কৃতি

দ্যা অক্টোনাটস

ব্রিটিশ এই অ্যানিমেটেড সিরিজের মাধ্যমে শিশুদের সাগর ও সেখানকার বাসিন্দাদের সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করা হয়েছে৷ একটি পোলার বেয়ারের নেতৃত্বে আটজনের একটি দলের সাগরের অন্যান্য প্রাণীদের হাত থেকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম দেখানো হয়েছে এতে৷ দু’জন বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী এটি তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন যেন তথ্য সব ঠিক থাকে৷ আরও জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সংস্কৃতি

দ্যা ওম্বলস

ছবি দেখেই বুঝতে পারছেন ‘ওম্বলস’ হচ্ছে একটি কল্পিত প্রাণী৷ ষাটের দশকে বিভিন্ন উপন্যাসে প্রথম এই প্রাণীদের কথা উল্লেখ করা হয়৷ পরবর্তীতে ব্রিটেনে তাদের নিয়ে একটি টেলিভিশন সিরিজ নির্মিত হয়৷ ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রচারিত ঐ সিরিজে দেখানো হয়, লন্ডনে থাকা ওম্বলসরা পরিবেশ রক্ষায় আবর্জনা সংগ্রহ করে রিসাইকেল করছে৷

সংস্কৃতি

দ্যা অ্যানিমেলস অফ ফার্দিং উড

মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে বনজঙ্গল উজাড় করায় সেখানে বসবাসরত পশুপাখিদের কী সমস্যা হয় তা দেখানো হয়েছে এই অ্যানিমেটেড টিভি সিরিজে৷ আরও জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সংস্কৃতি

বিল নাই দ্যা সায়েন্স গায়

বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে শিশুদের সামনে তুলে ধরতেন বিল গায়৷ এর মধ্যে ইকোলজি, পরিবেশ বিজ্ঞানের মতো বিষয়ও থাকতো৷ তাঁর অনুষ্ঠানটি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে৷ বর্তমানে বিভিন্ন সায়েন্স ভিডিওতে তাঁকে দেখা যায়, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়েও তিনি আলোচনা করেন৷ আরও জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সংস্কৃতি

দ্যা ম্যাজিক স্কুল বাস

এই টিভি সিরিজে ফ্রিজল নামের একজন বিজ্ঞান শিক্ষককে দেখানো হয়েছে, যিনি সরীসৃপ, জলবায়ু পরিবর্তন সহ প্রকৃতির নানান বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানাতে শিক্ষাসফরে নিয়ে যান৷ আরও জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

বাংলাদেশের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ‘সুলতান সুলেমান' নামের একটি ধারাবাহিক এখন বেশ দর্শকপ্রিয়৷ তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের কথিত ইতিহাস ভিত্তিক এই ধারাবাহিকটি তুরস্কেই নিষিদ্ধ৷ ডাবিং করা এই ধারাকাহিকটির মধ্যে এমন সব দৃশ্য রয়েছে যা শুধু প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যই উপযোগী হতে পারে৷ কিন্তু বাংলাদেশের শিশুরা এই ধারাবাহিকের দর্শক৷ অনুসন্ধানে জানা যায়, রাতে মা-বাবা শিশুদের আলাদাভাবে সময় না দিয়ে শিশুদের তাদের পাশে বসিয়েই ঐ সিরিয়াল দেখতে বসে যান৷ ফলে শিশুরাও সিরিয়ালটির দর্শক হয়ে উঠেছে৷ জানতে চাইলে ধানমন্ডির কলাবাগান এলাকার এক পরিবারের কর্তা বলেন, ‘‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দু'জনই সারাদিন ব্যস্ত থাকি, তাই শিশুদের আলাদা করে বিনোদনের  জন্য সময় দেয়া যায় না তেমন৷ আর রাতে যেটুকু সময় পাওয়া যায় সে সময় ঐ সিরিয়াল দেখি, শিশুরাও দেখে৷''

একই কারণে ঢাকার অনেক শিশু এখন বাংলা বলতে পারার আগেই হিন্দি শিখে যায়৷ হিন্দি সিরিয়াল দেখতে  বসে যান বাবা-মা৷ আর শিশুরাও তাদের পাশে বসে হিন্দি সিরিালে অভ্যস্ত হয়ে যায়৷ ঢাকার হৃদরোগ ইন্সটিউটের শিশু চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘‘অনেক বাবা-মা-ই শিশুদের বিনোদনের নামে টিভি সেটের সামনে বসিয়ে দেন৷ আর শিশু এমন কিছু দেখে যা সে বোঝেনা বা যার সঙ্গে সে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে পারে না৷ এর ফলে শিশুর মধ্যে শূন্যতা কাজ করে৷ তার কাছে টিভির মনিটর ব্ল্যাংক ছাড়া আর কিছুই নয়৷''

অডিও শুনুন 04:34
এখন লাইভ
04:34 মিনিট
বিষয় | 30.11.2016

‘ঢাকার স্কুলগুলোর একঘেঁয়ে পড়াশুনাও শিশুদের সুস্থ বিনোদনের অন্...

তিনি বলেন, ‘‘আর কথিত প্লে-জোনের ভার্চুয়াল গেম অনেক সময়ই শিশুকে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷ সে একা একা এক বিচ্ছিন্ন জগতের বাসিন্দা হয়ে ওঠে৷''

একইভাবে মোবাইল, ভিডিও ও কম্পিউটার গেমও বিনোদনের নামে তাকে আসক্ত করে৷ সে একা হয়ে যায়৷ সামাজিকতার বাইরে চলে যায় সে৷ আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘‘শিশুরা একসঙ্গে খেলবে, ঝগড়া এমনকি মারামারিও করতে পারে৷ এটাই স্বাভাবিক৷ ঘরের কোণে বসে সারাক্ষণ ভার্চুয়াল গেমে ব্যস্ত থাকা স্বাভাবিক নয়৷ এটা শিশুর জন্য ক্ষতিকর বিনোদন৷ তাকে সামাজিক জীব হিসেবে বেড়ে উঠতে দিতে হলে খেলার মাঠে যেতে দিতে হবে৷ অন্যান্য শিশুর সঙ্গে মিশতে দিতে হবে৷ কবিতা, গান, বিতর্কসহ নানা সহশিক্ষামূলক বিনোদনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে৷'' তবে প্রশ্ন হলো শিশুর এই স্বাভাবিক বিনোদনের সুযোগ কোথায়?

কোনো জরিপ না থাকলেও সংবাদ মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবদনে জানা যায়, ঢাকার ৯৫ ভাগ স্কুলে কোনো খেলার মাঠ নেই৷ কাগজে কলমে রাজধানীতে সিটি কর্পোরেশনের মোট ৫৪টি পার্ক ও ২৫টি খেলার মাঠ রয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে এগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন৷

‘ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট'-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না, বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নাই, ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছাকাছি খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নাই, ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু কোনো খেলাধুলাই করে না এবং ৪৭ শতাংশ শিশু দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টেলিভিশন দেখে কাটায়৷

অডিও শুনুন 05:10
এখন লাইভ
05:10 মিনিট
বিষয় | 30.11.2016

‘পরবর্তী জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে না’

২০১৩ সালে তথ্যমন্ত্রণালয়ের অধীনে এক জরিপে ৪,২০০ শিশুর কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা জানতে চাওয়া হয়৷ জরিপে অংশ নেয়া ৮৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় একটি খেলার মাঠ তৈরি করে দেয়া হোক৷ ৭৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠুক৷ ৭৬ শতাংশ শিশু বলেছে, এলাকায় শিশুপার্ক গড়ে তোলা হোক, ৬৭ শতাংশ শরীরচর্চা কেন্দ্র, ৩ শতাংশ পাঠাগার ও ২ শতাংশ চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার কথা বলেছে৷

শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের চিকিৎসক ডা. মেখলা সরকার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শিশুদের বিনোদনের মধ্যে প্রধান হলো স্কুলে, খেলার মাঠে বা খোলা জায়গায় সহপাঠী এবং বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে খেলাধুলা করা৷ এর মাধ্যমে শিশুরা যেমন বিস্তৃত পরিবেশে নিজেকে প্রকাশ করে এবং খাপ খাইয়ে নেয়, তেমনি খেলাধুলার নানা শৃঙ্খলা ও নিয়ম তাকে শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় শেখায়৷ কোনো সমস্যা থেকে উত্তরণের পথও সে জানতে পারে খেলাধুলার মাধ্যমে৷''

তিনি বলেন, ‘‘শিশুদের যদি ঘরে আবদ্ধ রেখে শুধু টিভি, অনলাইন বা কম্পিউটার বিনোদনের মধ্যে রাখা হয়  তাহলে সে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে৷ পরবর্তী জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘শিশুদের মধ্যে এক ধরনের পুলক থাকে৷ খেলাধুলা ও দৌড়াদৌড়ির মাধ্যমে তারা তার প্রকাশ ঘটাতে চায়৷ তার সুযোগ না দিয়ে তাদের ভার্চুয়াল বিনোদনে অভ্যস্ত করলে তার কিছুক্ষণ আনন্দে থাকে আবার বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে৷ আর পরবর্তী জীবনে তারা নানা শারিরীক ও মানসিক রোগে ভোগে৷'' 

ফিরিয়ে দাও শৈশব

দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মূলমন্ত্র হলো প্রতিযোগিতা৷ একেবারে ছোট বয়স থেকেই তাই চাপের শেষ নেই৷ পড়াশোনা, নাচগান, আঁকা, শরীরচর্চা, খেলাধুলা – সব কিছুতেই সেরা হয়ে ওঠার জন্য শিশুদের উপর চাপ দেওয়া হয়৷ এর পরিণাম কি ভালো হতে পারে?

সন্তান পালনে পেশাদারি সাহায্য

অন্য সব বিষয়ের মতো সন্তান পালনের ক্ষেত্রেও পুরানো অনেক ধ্যানধারণা আজ অচল হয়ে পড়েছে৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীরা জার্মানিতে বাবা-মায়েদের এই কাজে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেন৷ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তিতে তারা সন্তান পালন সংক্রান্ত নানা পরামর্শ দেন৷ স্বাস্থ্য বিমা সংস্থাই ধাত্রীর পারিশ্রমিক দেয়৷

বাবা-মা একটু সময় দিলে

জন্মের পর শিশুর জন্য বাবা-মায়ের স্পর্শ, তাদের আদর-ভালোবাসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু তাদের অত সময় আছে কি? জার্মানিতে নানা মডেলের আওতায় বাবা-মা প্রথম বছরে সন্তানের সঙ্গে অনেক সময় কাটানোর সুযোগ পান৷ রাষ্ট্র ও কর্মদাতা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য সেই ব্যবস্থা করে দেয়৷

পুঁথিগত শিক্ষার প্রস্তুতি

এক থেকে দুই বছর বয়সের মধ্যে জার্মানির শিশুরা সাধারণত কিন্ডারগার্টেনে যাবার সুযোগ পায়৷ কিন্তু সেখানে পুঁথিগত শিক্ষা নিষিদ্ধ৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের কাছ থেকে খেলাচ্ছলে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নানারকম শিক্ষা পায় কচিকাচারা৷ স্কুলে যাবার আগে এই প্রস্তুতি তাদের খুব কাজে লাগে৷

প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মবোধ

ঢাকা-কলকাতার মতো শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে অনেক শিশু সহজে মাটির সংস্পর্শে আসতে পারে না৷ জার্মানিতে শিশুদের প্রকৃতির কোলে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়৷ এমনকি কিছু এলাকায় জঙ্গলের মধ্যেই কিন্ডারগার্টেন রয়েছে৷ গাছপালা ও নানা প্রাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হয় তাদের৷

স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক

সাধারণত ৬ বছর বয়সে স্কুলে যায় জার্মানির বাচ্চারা৷ তখনই পড়াশোনা শুরু হয়৷ প্রাথমিক স্কুলশিক্ষা বাধ্যতামূলক৷ স্কুলে আলাদা ইউনিফর্ম নেই৷ প্রথম দিনে কচিকাচাদের উপহারে ভরা এক বিশেষ ঠোঙা দেওয়ার রেওয়াজ আছে৷

পড়ার চাপ

স্কুলের পড়াশোনা স্কুলেই শেখানোর চেষ্টা করা হয়৷ বাড়িতে ফিরে কিছু হোমওয়ার্ক করলেই চলে৷ সাধারণত গৃহশিক্ষক বা কোচিং ক্লাসের প্রয়োজন পড়ে না৷ তবে কিছু ক্ষেত্রে দুর্বলতা দূর করতে বাড়তি সাহায্যের ব্যবস্থা রয়েছে৷ শিক্ষা রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের আওতায় পড়ে বলে জার্মানিতে অনেক সংস্কার আটকে আছে বলে নানা মহলে অভিযোগ ওঠে৷

মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও গ্যাজেট ভিত্তিক শিশু বিনোদনের ভয়াবহ পরিনতির চিত্র পাওয়া গেছে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন'-এর এক জরিপে৷ তাদের এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে৷ ঢাকার ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্য প্রকাশ  করে তারা৷ আর শিশুরা এই পর্নোগ্রাফি দেখে প্রধানত মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে৷

ফারহানা মান্নান বলেন, দুই বছর বয়সের আগে শিশুদের টেলিভিশন সেটের সামনে নেয়াই ঠিক নয়৷ শিশুকে মোবাইল ফোন হাতে দিয়ে বা টেলিভিশন সেটের সামনে বসিয়ে রাখার চেয়ে তার হাতে বয়স উপযোগী যে কোনো একটা খেলনা দেয়া অনেক ভালো৷ এতে সে রং চিনবে৷ ইন্টারঅ্যাকট করবে৷ নিজে সক্রিয় হবে৷''

আর ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘‘ঢাকার স্কুলগুলোর একঘেঁয়ে পড়াশুনাও শিশুদের সুস্থ বিনোদনের অন্তরায়৷ তাদের খেলাধুলার  জন্য যেমন মাঠ নেই তেমনি তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রমও তেমন দেখা যায় না৷''

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার আরো বলেন, ‘‘শিশুদের সামাজিক কাজে অংশগ্রহণও তাদের জন্য বড় একটি বিনোদন৷ স্কুল বা অভিভাকদের উচিত তাদের কোনো সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত করা৷ কোনো ভালো বা সহযোগিতামূলক কাজে অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করা৷ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, গাছ লাগানো, শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণ ইত্যাদি এর উদাহরণ হতে পারে৷ এর মধ্য দিয়ে শিশুর মানবিক এবং সামাজিক দিক বিকশিত হবে৷''

লাইবেরিয়া

লাইবেরিয়ার ৬২ শতাংশ শিশুই স্কুলে যায় না৷ তাই তারাই আছে এক নাম্বারে৷

দক্ষিণ সুদান

দক্ষিণ সুদান আছে দ্বিতীয় স্থানে৷ সে দেশের ৫৯ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না৷

ইরিত্রিয়া

ইরিত্রিয়ারও ৫৯ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না৷ তাই দক্ষিণ সুদানের সঙ্গেই আছে তারা৷

আফগানিস্তান

আফগানিস্তানের অবস্থা একটু ভালো৷ দেশটির শতকরা ৪৬ ভাগ শিশু স্কুলে যায় না৷

সুদান

আফ্রিকার আরেক দেশ সুদানের মাত্র ৪৫ শতাংশ শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত৷

জিবুতি

জিবুতিও আফ্রিকার দেশ্৷ সে দেশের ৪৩ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না৷

গিনি প্রজাতন্ত্র

আফ্রিকার এই দেশটিরও শিশুশিক্ষার অবস্থা খুব খারাপ৷ ইকোয়েটোরিয়াল গিনির ৪২ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না৷

নাইজার

এটিও আফ্রিকার দেশ৷ সেখানে শতকরা ৩৮ ভাগ শিশু স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া শেখার সুযোগ পায়নি৷

মালি

মালি-ও আফ্রিকা মহাদেশের দেশ৷ সে দেশের ৩৬ শতাংশ শিশু কখনো স্কুলে যায়নি৷

নাইজেরিয়া

ইউএন ওয়াচের তালিকার দশ নম্বরে আছে নাইজেরিয়া৷ সে দেশের শতকরা ৩৪ ভাগ শিশু স্কুলে যায় না৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷