শীতে শীত নেই – কারণ জলবায়ু পরিবর্তন?

এবার বড়দিনে যুক্তরাজ্যে ফিরে চমকে যান গ্রেহেম লুকাস৷ বৃষ্টি তো পড়ছেই, ব্রিটেনে পড়েই থাকে৷ কিন্তু তাই বলে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডে ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গরম, যখন বরফ পড়ে থাকার কথা?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

টেলিভিশনে আবহাওয়া বিশারদরা যথারীতি আজোরেস দ্বীপপুঞ্জ থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস উত্তরপূর্ব দিকে বইছে ইত্যাদি বলে চলেছেন৷ তা ভালো৷ কাজেই বুকমেকাররা বড়দিনের এক সপ্তাহ আগেই হোয়াইট ক্রিসমাসের উপর বাজি নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷ সে-ও ভালো৷ পাড়ার ‘পাব'-এ কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শুনতে রাজি নন৷ সেখানকার ক্রিসমাস ট্রি-র ওপর এয়ারোসল দিয়ে বরফ করা হয়েছিল৷

কিন্তু বছরের এই সময়ে ইউরোপের ‘ওয়েদার ফ্রন্ট'-গুলো আসে সাধারণত উত্তর-পশ্চিম বা উত্তর-পূর্ব থেকে৷ যার অর্থ হিমেল বাতাস আর বরফ৷ কাজেই এবার বড়দিনে যা ঘটছে, তা কি একটা অঘটন, নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মাইলস অ্যালেন-এর মতে দ্বিতীয়টা৷

বিভ্রান্ত প্রকৃতি

তুলনামূলক গরম আবহাওয়ার কারণে জার্মানির বনাঞ্চলের প্রাণীদের এখনই যৌনমিলনে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে৷ আগে যেমনটা সাধারণত বসন্তের সময় চোখে পড়ত৷

আগেই ফুল ফুটে যাচ্ছে

জার্মানির নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়ার মৌমাছি পালক ৭৬ বছর বয়সি হান্স-ইয়ুর্গেন পাকহাইজার বলেন, ‘‘এটা দেখে অবাক হতে হয় যে কিছু প্রজাতির গাছে এখনই ফুল ফুটতে শুরু করেছে৷’’

আগেই হাইবারনেশন

শীতের সময়টা সাধারণত হাইবারনেশনে চলে যায় হাঁস জাতীয় প্রাণীগুলো৷ কিন্তু পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে তাদের অনেককে এখন চড়ে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে৷ মুরগিও ডিম পাড়া শুরু করে দিয়েছে৷

কৃষকরাও ভাবনায়

পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে কৃষকরাও বুঝে উঠতে পারছেন না কখন থেকে চাষাবাদ শুরু করবেন৷ গরম আবহাওয়া কিছু ফসলের ফলন বাড়াতে সহায়ক হবে৷ তবে এই আবহাওয়াই আবার অন্য ফসলের ক্ষেত্রে বিপদের কারণ হতে পারে৷ কারণ পর্যাপ্ত ঠান্ডা না পড়লে উপরে ছবিতে যে কীটপতঙ্গ দেখছেন সেগুলো মারা যাবে না৷ ফলে সেগুলো ফলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে৷

বসন্তে কী হবে?

তাপমাত্রা শূন্যের নীচে না যাওয়ায় গোলাপ আর ড্যাফোডিল এখনই ফুটতে শুরু করেছে৷ অথচ বছরের এই সময়টায় তাদের সুপ্তাবস্থায় থাকার কথা৷ তাই বসন্তের সময় ফুলগুলোর বেঁচে থাকা নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা৷

টিউলিপ ফুটবে তো!

ফ্রান্সের লিল শহরের একজন বাগানবিদ জানান, টিউলিপ ফুল বসন্তে ফুটলেও তাদের ফোটার জন্য শীতকালটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু এবার যদি পর্যাপ্ত শীত না পড়ে তাহলে বসন্ত আসলে টিউলিপের দেখা এবার আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি৷

উভচর প্রাণীদেরও একই অবস্থা

এবার শীতকালে বৃষ্টিপাত হওয়া আর গরম তাপমাত্রার জন্য বিপদে আছে ইউরোপের উভচর প্রাণীরা৷ ছোট ব্যাঙদের এখনই (নির্ধারিত সময়ের আগে) হালকা ঘনত্বের বনাঞ্চলের দিকে ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে৷ সেটা করতে গিয়ে পথেই মারা পড়ছে শত শত ছোট ব্যাঙ৷

যুক্তরাজ্য আর পশ্চিম ইউরোপে শীতকাল হবে অনেক বেশি উষ্ণ এবং আর্দ্র৷ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটেছে, তা ১৯১০ সালে যখন হিসেব রাখা শুরু হয়, সে'যাবৎ সর্বোচ্চ৷

ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল ভেসে গেছে৷ তা-তেই যথেষ্ট নয়: এই ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের গড় তাপমাত্রা ছিল সাধারণের ৪ দশমিক ১ ডিগ্রি ওপরে!

বিশ্বের অন্যত্র পরিস্থিতি অনুরূপ৷ দক্ষিণ অ্যামেরিকায় বন্যা৷ ডিসেম্বরের শেষাশেষি সুমেরুতে দাবদাহ! দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে চরম খরা৷ ভারতে চেন্নাই জলে ডোবা৷ এ সব কিছুই কি এল নিনিও-র দোষে? আরো বড় কথা হলো, মানুষজন যেন ভ্রুক্ষেপই করছে না৷ কয়েক সপ্তাহ আগে প্যারিসে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে কিছু কিছু প্রগতি হলেও, আসলে কিন্তু চুক্তিটা বাধ্যতামূলক নয়৷

Lucas Grahame Kommentarbild App

গ্রেহেম লুকাস, ডিডাব্লিউ-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের প্রধান

চুক্তি অনুযায়ী কাজ চললেও শীঘ্র ফললাভের কোনো আশা নেই৷ সেই সময়ের মধ্যে বিশ্বের জলবায়ু একটা পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ পৌঁছে যেতে পারে, যার পরে বিশ্বের উষ্ণায়নকে রোখার আর কোনো পথ বা পন্থা থাকবে না৷

ওদিকে বড়দিনে আমার বন্ধুদের অধিকাংশকে দেখলাম দিব্যি সারা পৃথিবীতে জেট প্লেনে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর আর এসইউভি কেনার গল্প করতে৷ কার্বন ফুটপ্রিন্ট? কিসের কার্বন ফুটপ্রিন্ট? জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ ক্রমেই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে৷ সেই সঙ্গে ফুরিয়ে আসছে সময়: জাগার সময়, ওঠার সময়, কিছু একটা করার সময়৷

বন্ধুরা, আপনি কি গ্রেহেম লুকাসের সঙ্গে একমত? জানিয়ে দিন নীচের ঘরে৷

টেলিভিশনে আবহাওয়া বিশারদরা যথারীতি আজোরেস দ্বীপপুঞ্জ থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস উত্তরপূর্ব দিকে বইছে ইত্যাদি বলে চলেছেন৷ তা ভালো৷ কাজেই বুকমেকাররা বড়দিনের এক সপ্তাহ আগেই হোয়াইট ক্রিসমাসের উপর বাজি নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷ সে-ও ভালো৷ পাড়ার ‘পাব'-এ কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শুনতে রাজি নন৷ সেখানকার ক্রিসমাস ট্রি-র ওপর এয়ারোসল দিয়ে বরফ করা হয়েছিল৷