সংবাদমাধ্যমের মালিকরা স্বাধীন, সাংবাদিকরা নয়

‘‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের মালিকরা এখন অনেকটাই স্বাধীন, তবে সাংবাদিকদের একেবারেই কোনো স্বাধীনতা নেই৷ সাংবাদিকরা নিজেদের ইচ্ছেমত যা দেখেছেন, তা লিখতে পারেন না৷ মালিকরা যেভাবে চান সাংবাদিকরা সেভাবেই লিখতে বাধ্য হন৷’’

‘‘সে কারণে বর্তমান সরকারের দেয়া স্বাধীনতা কোনো কাজেই আসছে না৷'' – ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে এমনই অভিমত দিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক৷ তাঁর মতে, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা দরকার৷ শ্রমিকদের থেকে সাংবাদিকদের পৃথক করা দরকার৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বাংলাদেশে ক্রমাবনতিশীল স্বাধীন মতামত প্রকাশ আর এই অধিকার নিশ্চিত করতে বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কর্মরত প্রভাবশালী ১৯টি আন্তর্জাতিক সংগঠন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতি আহবান জানিয়েছে৷ এ সব সংগঠনগুলোর মধ্যে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), পেন অ্যামেরিকা ও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারর্সের মতো সংগঠনও রয়েছে৷ সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে ঐ সংগঠনগুলো যৌথভাবে এক লিখিত আবেদন দিয়েছে বলে জানা গেছে৷

সংগঠনগুলো লিখিত আবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে একের পর এক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একজনকেও বিচারের মুখোমুখি না করার ব্যর্থতায় বাংলাদেশে ভীতির এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে৷ মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকরা জেল এবং আইনি হুমকি-ধামকিসহ নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করছে৷

এ বিষয়ে জাতীয় প্রেসকাবের নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও ইত্তেফাকের কূটনৈতিক সম্পাদক মাঈনুল আলম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম স্বাধীন৷ তবে এই স্বাধীনতায় কিছুটা ঘাটতি আছে, আছে কমতি৷ তবে কতটুকু স্বাধীন সেটা নির্ণয়ের ব্যাপার, পর্যবেক্ষণের ব্যাপার৷ এখানে আরো করণীয় আছে, পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপার আছে৷ এখন বাংলাদেশের সাংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যদি পাশ্ববর্তী দেশ ভারত বা ইউরোপ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের তুলনা করা হয়, তাহলে অতৃপ্তিবোধটা থেকেই যাবে৷ অবশ্য এর মানে এই যে, এখানে উন্নতির জায়গা আছে৷''

বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কতটা স্বাধীন? এমন প্রশ্নের জবাবে মাঈনুল আলম বলেন, ‘‘এই স্বাধীনতার সঙ্গে আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপার আছে, আমাদের প্রাপ্তির বিষয় আছে৷ আমাদের চিন্তা প্রকাশের সঙ্গে এটা সম্পর্কযুক্ত৷ হ্যাঁ, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের রাষ্ট্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই৷ তবে অন্য একটি নিয়ন্ত্রণ আছে৷ আর সেটা হলো সংবাদমাধ্যমের মালিক বা উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণ৷ তবে সম্প্রতি সংসদে তথ্যমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন, সেটা নিয়ে নতুন করে ভাবনার বিষয় রয়েছে৷ বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষই সম্পাদক বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন৷ এটা আমাকে চিন্তিত করেছে৷ আমরা কোন পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি!''

গত ফেব্রুয়ারিতেই সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক নানা পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল সম্পাদক পরিষদ৷ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তখন বলা হয়েছিল, ‘‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচারমাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে৷ একদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের স্বধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে৷ সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারমাধ্যমের অধিকারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করাও হচ্ছে৷''

পাশাপাশি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা তো রয়েছেই৷ গত বছর বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকেল-১৯ সাংবাদিক নির্যাতন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ এতে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ৷ এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই হার হয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ৷ এর প্রায় ২৩ শতাংশ নির্যাতনই ঘটেছে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের হাতে৷ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ১১ শতাংশ হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ ২০১৪ সালে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৬৬ দশমিক ৩১ শতাংস৷ এর মধ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হাতে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে৷ ২০১৪ সালে ২১৩ জন সাংবাদিক ও আটজন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন৷ এর মধ্যে অন্তত চারজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন৷

সাংবাদিক নেতা ওমর ফারুক বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করে যাচ্ছি৷ আসলে সরকারের সহযোগিতা না পেলে আমরা সফল হতে পারব না৷ ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু নিউজ পেপার সার্ভিসেস অ্যাক্ট করেছিলেন৷ সেই আইনের আওতায় আমরা অনেকরকম স্বাধীনতা ভোগ করেছি৷ কিন্তু ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া সরকার সেই আইনটি বাতিল করে কুলি-মজুরের যে অধিকার, সেই অধিকারের মধ্যে আমাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন৷ যে কারণে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের যে স্বাধীনতা, সেটা আমরা ভোগ করতে পারছি না৷ এখন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া, সেই আইনটি পূনর্বহাল করা এবং সেটিকে যুগোপযোগী করা৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷