সংবাদমাধ্যমে নারীর অবস্থান এখনো তলানিতে

সংবাদমাধ্যমে নারীর অবস্থান আজও তলানিতে পড়ে আছে৷ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের প্রধান নাসিমুন আরা হক মিনু জানান, ‘‘দেখতে সুন্দর হওয়ার কারণে নারী ‘প্রেজেন্টার' আমরা পাচ্ছি, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পদে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ছে না৷’’

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে কত নারী কাজ করেন তার সাম্প্রতিক কোনো পরিসংখ্যান নেই৷ তবে নাসিমুন আরা হক মিনুর কথায়, দেশে পত্রিকা, অনলাইন ও টেলিভিশন মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমে কর্মরত নারীর সংখ্যা এক হাজার৷ অন্যদিকে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন বা বিসিডিজেসি-র কয়েক বছর আগের জরিপ অনুযায়ী, এই সংখ্যা মোট সংবাদমাধ্যম কর্মীর শতকরা ছয় ভাগ৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

গত অক্টোবরে অবশ্য বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ ২৪-এর সাংবাতিক শাহনাজ মুন্নি তাঁর এক প্রতিবেদনে বলেন, ‘‘প্রিন্ট মিডিয়ায় নারীর সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগ আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শতকরা ২৫ ভাগ৷''

অডিও শুনুন 08:20
এখন লাইভ
08:20 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 17.01.2017

‘রিপোর্টার বা নীতিনির্ধারণী পদে নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপভাবে...

আরেকটি হিসাব দিয়েও পরিস্থিতি বোঝা যায়৷ আর তা হলো, জাতীয় প্রেসক্লাবের হিসেব৷ সেখানে ২০১৮ জন সদস্যের মধ্যে নারী সদস্য মাত্র ৭২ জন৷ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ছয় হাজার সদস্যের মধ্যেও নারীর সংখ্যা ১৫০ জনের বেশি নয়৷

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের প্রধান নাসিমুন আরা হক মিনু ইলেট্রনিক মিডিয়ায় নারীর এই অংশগ্রহণ বাড়াকে সম্পূর্ণ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না৷ তিনি মনে করেন, ‘‘টেলিভিশন মালিকরা বা কর্তৃপক্ষ মনে করে নারীরা দেখতে সুন্দর৷ তাই তাদের ‘প্রেজেন্টার' পদে নিয়োগ দিচ্ছেন তাঁরা৷ কিন্তু রিপোর্টার বা নীতিনির্ধারণী পদে নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপভাবে বাড়ছে না৷''

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের কথায় নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ না হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নারী হওয়ার কারণেই আমাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে৷ আমার তখনকার কর্মস্থল একুশে টেলিভিশনও আমাকে নির্যাতনের পর চিকিৎসা তো দূরের কথা, কোনো সহায়তাই করেনি৷ উলটে আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল৷ শুধু তাই নয়, আট মাসের বেতনও দেয়া হয়নি আমাকে৷''

নাদিয়া এখন একাত্তর টেলিভিশনে কাজ করেন৷ তিনি ‘ক্রাইম রিপোর্টিং'-এর মতো একটি ‘চ্যালেঞ্জিং বিট কাভার' করেন৷ তিনিই বাংলাদেশের প্রথম সাংবাদিক, যিনি সাহসিকতার জন্য ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অ্যাওয়ার্ড ফর কারেজ' পুরস্কার পান৷

অডিও শুনুন 14:04
এখন লাইভ
14:04 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 17.01.2017

‘নারী হওয়ার কারণেই আমাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে’

তিনি বলেন, ‘‘নারী সাংবাদিককে দু'ধরনের যুদ্ধ করতে হয়৷ তাঁকে প্রমাণ করতে হয় যে সে যোগ্য৷ এছাড়া পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করতে হয়৷ এর বাইরে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তো আছেই৷ কোনো নারী যে ক্রাইম রিপোর্টার হতে পারে, এটাই অনেকের চিন্তায় আসে না৷''

কর্মস্থলে কেনো বৈষম্য আছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে নাদিয়া বলেন, ‘‘দৃশ্যত নেই৷ তবে তা অনেকটা নির্ভর করে যিনি সুপারভাইজ করেন, তাঁর মানসিকতার ওপর৷''

অনলাইন নিউজ পেপার বাংলা ট্রিবিউনের সিনিয়র রিপোর্টার উদিসা ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘নারীদের রাজনীতি, অর্থনীতি বা কূটনীতির মতো বিষয় নিয়ে সাংবাদিকতা করাকে অনেকেই মানতে পারেন না৷ তাঁদের ধারণা,, নারী সাংবাদিক মানেই হলো তাঁরা হালকা বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করবেন৷''

তিনি বলেন, ‘‘এই পেশায় আসা এবং টিকে থাকার জন্য পরিবারের সমর্থন একটা বড় ব্যাপার৷ আর নারী বিবাহিত হলে সেটা আরো বেশি প্রয়োজন৷ সাংবাদিকতা ২৪ ঘণ্টার পেশা৷ কোনো নারী রাতেও কাজ করবেন, এটা অনেকে ভাবতেই পারেন না৷''

অডিও শুনুন 02:33
এখন লাইভ
02:33 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 17.01.2017

‘পুরুষের তুলনায় নারীকে অনেক বেশি যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে হয়’

বাংলাদেশে এবারই প্রথম জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পদে একজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন৷ তিনি হলেন ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার ফরিদা ইয়াসমিন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সাংবাদিকতায় পুরুষের তুলনায় নারীকে অনেক বেশি যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে হয়৷ প্রথমত তাঁকে প্রমাণ করতে হয় যে, পুরুষ যেটা করতে পারে সেটা করতে তিনিও সক্ষম৷ তারপর তাঁকে পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়৷''

ফরিদা ইয়াসমিন জানান, ‘‘অনেকের মধ্যেই একটা ‘মাইন্ড সেট' কাজ করে যে এই কাজ নারী পারবে না, পারে না৷ বলা বাহুল্য, এই ‘মাইন্ড সেট' নারীকেই ভাঙতে হয়৷ আমি যত জায়গায় কাজ করেছি সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বৈষম্যের শিকার আমি হইনি৷ তবে মনস্তাত্ত্বিক বাধা এখনো প্রবল৷''

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের প্রধান নাসিমুন আরা হক মিনুর কথায়, ‘‘এক সময় পত্রিকার নারী পাতাগুলোতে শুধু নারীরাই কাজের সুযোগ পেতেন৷ কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে৷ তারপরও সংবাদমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম৷ কারণ এখনো মনে করা হয় যে, এই ‘চ্যালেঞ্জিং' পেশা নারীদের জন্য নয়৷ তার ওপর এ পেশায় বেতন বৈষম্যেরও শিকার হন নারীরা৷ শিকার হন হয়রানিরও৷ এমনকি নিয়োগ দেয়ার সময়ও তাঁদের উপেক্ষা করা হয়৷''

তিনি বলেন, ‘‘এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি৷ আমরা সংবাদমাধ্যম এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে দাবি করেছি যে, সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন পদে অন্তত ৩০ ভাগ নারী নিয়েগ দিতে হবে৷''

বন্ধু, আপনার দেখা কোনো নারী সাংবাদিকের গল্প বলুন আমাদের৷ লিখুন নীচের ঘরে৷

সমাজ

২০০৬ সাল

যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ‘ওয়াশিংটন পোস্টে’-র সাংবাদিক সুজান স্মিড, জেমস ভি গ্রিমাল্ডি এবং আর. জেফরি স্মিথ সে বছর পেয়েছিলেন এই পুরস্কার৷ সংস্কারের নামে মার্কিন কংগ্রেসে ওয়াশিংটন লবিস্ট জ্যাক আব্রামোফের দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন তারা৷

সমাজ

২০০৭ সাল

‘দ্য বার্মিংহ্যাম নিউজ’-এর ব্রেট ব্ল্যাকলেজ পেয়েছিলেন এই পুরস্কার৷ একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে দেন তিনি৷ যার ফলে ঐ চ্যান্সেলরকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল৷

সমাজ

২০০৮ সাল

এ বছর দু’টি পত্রিকা এ পুরস্কার পায়৷ ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার ওয়াল্ট বোগদানিচ এবং জেক হুকার পেয়েছিলেন এ পুরস্কার৷ চীন থেকে আমদানিকৃত ওষুধ ও নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন তারা৷ এছাড়া ‘শিকাগো ট্রিবিউন’-এর এক প্রতিনিধি জিতেছিলেন এই পুরস্কার৷

সমাজ

২০০৯ সাল

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর ডেভিড বার্সতো পেয়েছিলেন এ পুরস্কার৷ কিছু অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা রেডিও ও টেলিভিশনে বিশ্লেষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পেন্টাগনের সমর্থনে ইরাক যুদ্ধকে প্রভাবিত করছে৷ তাদের এসব বক্তব্যের কারণে কত কোম্পানি সুবিধাভোগ করছে তাও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে৷

সমাজ

২০১০ সাল

‘দ্য ফিলাডেলফিয়া ডেইলি নিউজ’-এর বারবারা ল্যাকার ও ওয়েনডি রুডারম্যান এবং ‘নিউইয়র্ক টাইম ম্যাগাজিন’-এর প্র-পাবলিকার শেরি ফিঙ্ক যৌথভাবে এ পুরস্কার জিতেছিলেন৷ একটি অসৎ পুলিশ দলের মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি উদঘাটন করেন ল্যাকার ও রুডারম্যান৷ ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক হৈ চৈ হয়েছিল৷ ফিঙ্ক ঘূর্ণিঝড় ক্যাটরিনা আঘাত হানার পর রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের মানসিক অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিলেন৷

সমাজ

২০১১ সাল

‘সারাসোতা হেরাল্ড ট্রিবিউন’-এর পেইজি সেন্ট জন সে বছর পুলিৎজার পেয়েছিলেন৷ ফ্লোরিডার বাড়ি মালিকদের সম্পদের ইনস্যুরেন্সে দুর্বলতা সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তাঁকে এ পুরস্কার এনে দিয়েছিল৷

সমাজ

২০১২ সাল

‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-এর ম্যাট অ্যাপুৎসো, অ্যাডাম গোল্ডম্যান, এইলিন সুলিভান এবং ক্রিস হাওলি সে বছর এই পুরস্কার জিতেছিলেন৷ নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ‘ক্ল্যানডেস্টাইন গুপ্তচর কর্মসূচি’র আওতায় শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবন যাপনের প্রতি নজর রাখা হচ্ছিল, যা প্রকাশ পায় এপি-র ঐ প্রতিবেদনে৷ প্রতিবেদন প্রকাশের পর কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রীয় তদন্ত দাবি করা হয়৷

সমাজ

২০১৩ সাল

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এর ডেভিড বার্সতো এবং আলেহান্দ্রা ইয়ানিক ফন বেরত্রাব এই বছর পুরস্কারটি পান৷ মেক্সিকোতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে কীভাবে ওয়াল-মার্ট ঘুষ দেয়, সেটা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন তারা৷

সমাজ

২০১৪ সাল

ওয়াশিংটর ডিসির ‘দ্য সেন্টার ফর পাবলিক ইনটিগ্রিটি’-র ক্রিস হামবি জেতেন এই পুরস্কার৷ কয়লা খনির শ্রমিকদের ফুসফুসের রোগ নিয়ে কয়েকজন আইনজীবী ও চিকিৎসকের প্রতারণার চিত্র তুলে ধরেছিলেন তার প্রতিবেদনে৷ যার ফলে ঐ আইনজীবী ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল৷

সমাজ

২০১৫ সাল

এ বছর দুইজন জিতেছেন এই পুরস্কার৷ ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এরিক লিপটন কংগ্রেস নেতা ও অ্যাটর্নি জেনারেলদের লবিস্টরা তাদের কতটা প্রভাবিত করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের জন্য এবং ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিনিধির স্বাস্থ্য সেবা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের জন্য৷

সমাজ

২০১৬ সাল

চলতি বছরে ‘ট্যাম্পা বে টাইমস’-এর লিওনোরা লাপিটার ও অ্যান্থনি কর্মিয়ার এবং ‘দ্য সারাসোতা হেরাল্ড ট্রিবিউন’-এর মাইকেল ব্রাগা জিতেছেন এই পুরস্কার৷ ফ্লোরিডা মানসিক হাসপাতালের অবহেলার অমানবিক চিত্র ফুটে উঠেছিল তাদের প্রতিবেদনে৷