সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একজোট

ইন্টারনেট থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক সহিংস কনটেন্ট সরাতে একটি সনদে স্বাক্ষর করেছে বিশ্বের বৃহৎ সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান৷ তাদের সাথে যুক্ত আছে ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশের সরকার৷

ইন্টারনেটকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক সহিংস কনটেন্ট থেকে মুক্ত করতে একজোট হলো বৃহৎ সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান৷ মেধাসত্ত্ব, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একে অন্যের পেছনে লেগে থাকলেও এ নিয়ে তাদের একমত হতে পারাটাকে বড়  ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে৷

‘ক্রাইস্টচার্চ কল' নামের এই সনদে স্বাক্ষর করেছে সাতটি প্রধান ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেন্দ্রিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান৷ এই তালিকায় আছে ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, অ্যামাজন, টুইটার, মাইক্রোসফট ও ডেইলিমোশন৷ 

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হামলার লাইভ ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে৷ তাৎক্ষণিকভাবে সেই ভিডিও সরাতে না পারায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো৷ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্দার্নও৷ এ বিষয়ে তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিয়ে আসছিলেন৷

বুধবার জেসিন্ডা আর্দার্ন এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও প্যারিসে অনুষ্ঠিত এই সনদ স্বাক্ষরে উপস্থিত ছিলেন৷ নিউজিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এটা একটা অভুতপূর্ব ঘটনা যে, আমরা এখানে সরকার এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে পেরেছি৷'' ব্রিটেন, ক্যানাডা, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, জর্ডান, ইউরোপীয় কমিশন, সেনেগাল এবং ইন্দোনেশিয়ার সরকারও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে৷ সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ভারতও এতে সমর্থন জানিয়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি | 15.03.2019

গত সপ্তাহে প্যারিসে

কী বলা হয়েছে সনদে

সনদে স্বাক্ষর করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে তারা ইন্টারনেট থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক সহিংস কনটেন্ট সরানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে৷ এই ধরনের কনটেন্ট চিহ্নিত করার জন্য নতুন নতুন অ্যালগোরিদম নিয়ে তারা কাজ করবে৷ সেই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের জন্য কনটেন্ট আপলোডের নতুন নীতিমালাও নিয়ে আসা হবে৷

ঘৃণা ছড়ায় এমন কনটেন্ট চিহ্নিত করে তা সরাতে ‘মেশিন লার্নিংয়ের’ মাধ্যমে নতুন টুলস উদ্ভাবনেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা৷ এক্ষেত্রে ক্ষতিকর কোনো কিছু ইন্টারনেটে ছাড়ার পর সাথে সাথেই যেন তা ধরা পড়ে সে বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে৷ ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে অনাকাঙ্খিত ছবি বা ভিডিও চিহ্নিত করা হবে৷ তার উপাত্তগুলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই ব্যবহার করতে পারবে এমন একটি ড্যাটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে সেগুলো এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে না পারে৷

বিধিবহির্ভূত কোনো কিছু যাতে ভাইরাল না হয়ে যায়, সেজন্যে ব্যবহারকারীরা কী দেখতে পান তার অ্যালগোরিদম পরিবর্তনের  উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানানো হয়েছে এই সনদে৷ প্রতিষ্ঠানগুলো ‘গ্লোবাল ইন্টারনেট ফোরাম টু কাউন্টার টেররিজম’ নামের আলাদা একটি উদ্যোগে সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে৷ ২০১৭ সালে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে অপব্যবহার রোধে ফেসবুক, মাইক্রোসফট, টুইটার ও ইউটিউব এটি প্রতিষ্ঠা করেছিল৷

ফেসবুকের উদ্যোগ

এদিকে এই সনদ স্বাক্ষরের কয়েক ঘন্টা আগেই ফেসবুক লাইভ স্ট্রিমিং বা সরাসরি ভিডিও প্রচারের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে৷ এক ব্লগ পোস্টে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘‘নিউজিল্যান্ডে নৃশংস হামলার পর আমাদের মাধ্যম ব্যবহার করে ক্ষতি করা কিংবা ঘৃণা ছড়ানোর বিষয়গুলো রোধের উপায় নিয়ে পর্যালোচনা করেছি৷’’ ওয়ান স্ট্রাইক নামে প্রতিষ্ঠানটি লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ক্ষেত্রে নতুন একটি নিয়ম চালু করেছে৷ এর ফলে কোনো ব্যবহারকারী সবচেয়ে গুরুতর নীতিগুলোর কোনোটির বরখেলাপ করলে নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য তাকে লাইভ স্ট্রিমিং ব্যবহার করতে দেয়া হবে না৷ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায়  ৭৫ লাখ ডলার বিনিয়োগের ঘোষণাও দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি৷

ফেসবুকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জেসিন্ডা আর্দার্ন৷ এটিকে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেব উল্লেখ করেন তিনি৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যাতে সন্ত্রাসীদের জন্য বিকৃত একটি মাধ্যমে পরিণত না হয় সেজন্য বিভিন্ন দেশের সরকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে বলেও জানান নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী৷

এফএস/এসিবি (ডিপিএ, এএফপি)

১৩ মার্চের ছবিঘরটি দেখুন...

ভবিষ্যতে যা করতে চায় ফেসবুক

এক প্ল্যাটফর্মে সব কিছু

ফেসবুকের সব আ্যপ - মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, আর হোয়াটস অ্যাপকে একটি একক ব্যবস্থায় আনতে চান মার্ক সাকারবার্গ৷ এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় বাড়তি জোর দেয়া হবে৷ বার্তা আদানপ্রদান ছাড়াও এটিকে এমনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তাঁর, যা ‘কথা বলা, ভিডিও চ্যাট, গ্রুপ স্টোরি, ব্যবসা, লেনদেন, বাণিজ্য এবং সব ধরণের ব্যক্তিগত সেবার একটি প্লাটফর্ম হয়ে উঠবে৷’ সম্প্রতি এক ব্লগপোস্টে লিখেছেন তিনি৷

ভবিষ্যতে যা করতে চায় ফেসবুক

পেমেন্ট সেবা

আগামী দিনে ফেসবুকের অ্যাপেই মিলবে পেমেন্ট সেবা৷ ধরুন প্রতিষ্ঠানটি পেপালের সাথে জোটবদ্ধ হলো৷ তখন চাইলে অনলাইনে কেনাকাটা, রেস্টুরেন্ট বিল, সরকারি সেবার বিল সবই পরিশোধ করা সম্ভব হবে মেসেজিং অ্যাপ দিয়েই৷ নেয়া যাবে রাইড শেয়ারিং সেবাও৷ অবশ্য এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে লেনদেনের সুবিধা রয়েছে৷ হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক লেনদেন ব্যবস্থা চালু হয়েছে ভারতেও৷

ভবিষ্যতে যা করতে চায় ফেসবুক

নিজস্ব মুদ্রা

ব্যবহারকারীদের অর্থ লেনদেনের সুবিধার জন্য ফেসবুক নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি করছে বলে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে৷ এ বিষয়ে ফেসবুক বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি৷ তবে নতুন একটি দল বিটকয়েনসহ অন্য ক্রিপ্টোকারিন্সেগুলোর ব্যবহারের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়৷ এটি বাস্তবায়ন হলে অর্থ লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারীদের ব্যাংক বা পেপাল অ্যাকাউন্ট লাগবে না৷

ভবিষ্যতে যা করতে চায় ফেসবুক

ওয়ান-স্টপ শপ

নিজস্ব ভার্চুয়াল মুদ্রা চালু হলে ফেসবুকের মাধ্যমে অনলাইন কেনাকাটা বা সেবা নেয়ার বড় একটি চ্যালেঞ্জ দূর হয়ে যাবে৷ মেসেজিং অ্যাপ প্লাটফর্মটি তখন পরিণত হবে ‘ওয়ান স্টপ শপে’৷ রেস্টুরেন্ট রিজার্ভেশন, পরিবহন সেবা নেয়া, কিংবা মার্কেটপ্লেস থেকে পণ্য কেনা, সম্ভব হবে সবই৷ এমনকি ভবিষ্যতে অ্যামাজনের মত ই-কমার্স ব্যবসাতেও নামতে পারে ফেসবুক, ধারণা বিশেষজ্ঞদের৷

ভবিষ্যতে যা করতে চায় ফেসবুক

আয়ের নতুন উৎস

নতুন এই প্ল্যাটফর্মের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বিজ্ঞাপনের বাইরে আয়ের নতুন নতুন দুয়ার খুলবে ফেসবুকের জন্য৷ কেনাকাটার ক্ষেত্রে তখন সেবাদাতা কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কমিশন নিতে পারবে তারা৷ যেমনটি এখন অ্যাপল করে থাকে৷ অ্যাপভিত্তিক লেনদেনে তারা ৩০ ভাগ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখে৷

ভবিষ্যতে যা করতে চায় ফেসবুক

চ্যালেঞ্জও আছে

ফেসবুকের এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব, তা নির্ভর করবে ব্যবহারকারীদের আগ্রহের উপর৷ কেননা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ায় ফেসবুকের উপর আস্থার সংকট রয়েছে৷ তার উপর এই পরিবর্তনের পথে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের আইনি বাধাও তাদের পেরুতে হবে৷

আমাদের অনুসরণ করুন