সব উদ্বাস্তুর আঙুলের ছাপ নেওয়ার প্রস্তাব

জার্মানির অভিবাসন সংস্থা আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলোর প্রতি সব উদ্বাস্তুর আঙুলের ছাপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে৷ উদ্দেশ্য হলো, একাধিক পরিচয় ব্যবহার করে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার প্রচেষ্টা রোখা৷

জার্মানির অভিবাসন ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত ফেডারাল কার্যালয় মঙ্গলবার জানায় যে, বর্তমানে জার্মানিতে যত উদ্বাস্তু অবস্থান করছেন, তাঁদের সকলের আঙুলের ছাপ নেওয়ার ডাক দিয়েছে বিএএমএফ৷ এর ফলে ভুয়া পরিচয় দিয়ে আর কেউ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পারবে না৷

এখন থেকে জার্মানির আঞ্চলিক অভিবাসন কার্যালয়গুলিকে উদ্বাস্তুদের আঙুলের ছাপ নিতে হবে বলে বিএএমএফ-এর নতুন প্রধান ইয়ুটা কর্ড এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন৷ ‘‘যাঁরা (এই সব আঞ্চলিক অভিবাসন কার্যালয়ে) নাম লেখাবেন, তাঁদের আঙুলের ছাপ নিয়ে তা একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে,’’ বলেছেন কর্ড৷

সমাজ

যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যতা থেকে পালানো

২০১৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘ইসলামিট স্টেট’-এর বিস্তার ঘটার পর সিরীয়দের দেশত্যাগের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়৷ একইসময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নিগার এবং কসভোর অনেক মানুষ ইউরোপমুখী হন৷

সমাজ

সীমান্তের ওপারে আশ্রয় খোঁজা

সিরীয় শরণার্থীদের অধিকাংশই ২০১১ সাল থেকে সে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন তুরস্ক, লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন৷ কিন্তু ২০১৫ সাল নাগাদ সেসব দেশের শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা সন্তানদের শিক্ষা দিতে না পারায় এবং কাজ না পাওয়ায় এক পর্যায়ে আরো দূরে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

সমাজ

পায়ে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি

২০১৫ সালে ১৫ লাখের মতো শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে পায়ে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে চলে আসেন৷ সেসময় ইউরোপের শেঙেন চুক্তি, যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশের মধ্যে ভিসা ছাড়াই চলাচাল সম্ভব, নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ কেননা শরণার্থীরা গ্রিস থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলোর দিকে আগাতে থাকেন৷

সমাজ

সমুদ্র পাড়ির উন্মত্ত চেষ্টা

সেসময় হাজার হাজার শরণার্থী ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করেন৷ লিবিয়া থেকে ইটালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত আটশ’ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

সমাজ

সীমান্তে চাপ

ইউরোপের বহির্সীমান্তে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কয়েকটি রাষ্ট্র চাপে পড়ে যায়৷ হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক পর্যায়ে সীমান্তে বেড়া দিয়ে দেয়৷ শুধু তাই নয়, সেসময় শরণার্থী আইন কঠোর করা হয় এবং শেঙেনভুক্ত কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে৷

সমাজ

বন্ধ দরজা খুলে দেয়া

জার্মান চ্যান্সেল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর ‘ওপেন-ডোর’ শরণার্থী নীতির কারণে বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অনেক শরণার্থীই ইউরোপে আসতে উৎসাহ পেয়েছেন৷ এক পর্যায়ে অবশ্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে জার্মানিও৷

সমাজ

তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি

২০১৬ সালের শুরুতে ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যে একটি চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির আওতায় গ্রিসে আসা শরণার্থীদের আবারো তুরস্কে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করে৷ নভেম্বর মাসে অবশ্য তুরস্কের ইইউ-তে প্রবেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণার পর, সেই চুক্তি আবারো নড়বড়ে হয়ে গেছে৷

সমাজ

পরিস্থিতি বদলের কোনো লক্ষণ নেই

ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকলেও সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলার কোনো সঠিক পন্থা এখনো খুঁজে পাননি৷ কোটা করে শরণার্থীদের ইইউ-ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সহিংসতার ইতি ঘটার কোনো লক্ষণও নেই৷ ওদিকে, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে৷

গতবছরের হেমন্ত থেকে বিএএমএফ নিজেই নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উদ্বাস্তুদের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখছে এবং ‘‘রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়ায় একাধিক আইডি-র সম্ভাবনা নির্মূল করতে’’ পেরেছে৷ বিএএমএফ-এর কাছে আপাতত প্রায় চার লাখ ত্রিশ হাজার রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমেছে৷

গত সোমবার হানোফারের এক ২৫ বছর বয়সি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীকে ২১ মাসের সাস্পেন্ডেড কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ২০০ ঘণ্টা সমাজ সেবাও আছে৷ তার বিরুদ্ধে প্রতারনার অভিযোগ ছিল৷ অভিযুক্ত স্বীকার করেছে যে, সে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন নাম নিয়ে জার্মানির একাধিক শহরে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে৷

গত জানুয়ারি মাসে উত্তর জার্মানির ব্রাউনশোয়াইগ শহরে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন বসানো হয়েছে, যার কাজ হবে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা যেভাবে ভুয়া পরিচয় দিয়ে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকে, সে ধরনের ৩০০টির বেশি ঘটনার তদন্ত করা৷ শুধুমাত্র লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্যেই ৩০ থেকে ৫০ লাখ ইউরো এভাবে জুয়াচুরি করে নেয়া হয়েছে বলে প্রকাশ৷

আরএস/এসি/এসিবি (এএফপি, এনডিআর)