সমকামের স্বীকৃতি মিলবে ভারতে?‌ আশায় বুক বাঁধছেন সমকামীরা

সমলিঙ্গের যৌনাচারে শাস্তি দেয়া সমাজে ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে৷ গোপনীয়তার অধিকার মামলায় রায়দানের সময় এ মন্তব্য সুপ্রিম কোর্ট‌ের৷ যৌন পছন্দ ব্যক্তির অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ তাহলে কি উঠে যাবে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা?‌‌‌

যৌন পছন্দ বেছে নেওয়ার দাবিতে লড়াই, অধিকার-আন্দোলন দীর্ঘ দিনের৷ বিশ্বের বহু উন্নত দেশ স্বীকৃতি দিলেও ভারতে এখনও সমকামিতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ তবে এবার আশা, সমকামের ছাড়পত্র মিলবে৷ দিল্লি হাইকোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে অপরাধের শ্রেণি থেকে বাইরে রাখলেও, সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে রয়েছে মামলা৷ পরিস্থিতি অবশ্য ক্রমেই বদলাচ্ছে৷ একের পর এক ঐতিহাসিক রায় দিয়ে বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত৷ এই তো ক'‌দিন আগেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে ব্যক্তির যৌন পছন্দকেও মৌলিক অধিকার হিসেবে মেনে নিয়েছে শীর্ষ আদালত৷ উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ নং অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারের বিষয়টি৷ আধার কার্ডে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে আসার বৈধতা-‌সংক্রান্ত একটি মামলায় রায় ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট৷ গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে৷ ঐ রায়ে বলা হয়েছে, ‘‌‘‌জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে পৃথক করা যায় না৷ সমতা, স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অধিকারের সমান এটি৷ এলজিবিটি সম্প্রদায় যৌন সংখ্যালঘু হতে পারেন, কিন্তু সেই যুক্তিতে তাঁদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়৷'‌'‌ যদিও এলজিবিটি ( লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়্যাল এবং ট্রান্সজেন্ডার)‌ বিষয়ক মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটি বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানি চলছে৷ সেক্ষেত্রে এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায়দান করবে সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর বেঞ্চটি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সদ্য প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি জগদীশ সিং খেহর, বিচারপতি আর কে আগরওয়াল, বিচারপতি এস আব্দুল নাজির, বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড় একসঙ্গে যে রায়টি লিখেছেন, তাতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা নিয়ে ২০১৩ সালে সু্প্রিম কোর্টের রায় যে ‘ভুল' ছিল, তা স্বীকার করা হয়েছে৷ বিচারপতি এস কে কউল এবং বিচারপতি এস এ ববডে আলাদা করে যৌন স্বাধীনতার পক্ষে রায় লিখেছেন৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই ৩৭৭ নিয়ে যে কিউরেটিভ পিটিশন এখনও সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন, তাতে জয়ের আশা দেখছেন সমকামীরা৷

নেদারল্যান্ডস

২০০১ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নেদারল্যান্ডসে সমকামী বিয়ে বৈধ ঘোষণা করা হয়৷ ছবিতে সমকামী দম্পতিকে বিয়ের পর কেক কাটতে দেখা যাচ্ছে৷ ২০১১ সালে দেশটিতে সমকামী বিয়ে বৈধ হওয়ার ১০ বছর পূর্তিতে তাঁরা বিয়ে করেন৷

ইংল্যান্ড

২০১৩ সালের জুলাইতে সমকামী বিয়ে বৈধ করে আইন পাস হয়৷ এরপর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এলটন জন তাঁর সঙ্গীকে বিয়ে করেন৷

ফ্রান্স

দেখছেন দেশটির প্রথম সমকামী জুটির বিয়ের ছবি৷ ২০১৩ সালের মে মাসে ফ্রান্সে এই বিয়ের বৈধতা দেয়া হয়৷

লুক্সেমবুর্গ

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সমকামী বিয়েকে বৈধতা দেয়া হয়৷ এর চার মাস পর সঙ্গীকে বিয়ে করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সাভিয়ের বেটেল (ডানে)৷

আয়ারল্যান্ড

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আয়ারল্যান্ডে ২০১৫ সালের মে মাসে গণভোটের মাধ্যমে সমকামী বিয়ে বৈধ করা হয়৷

ইউরোপের অন্যান্য দেশ

২০০৩ সালে বেলজিয়াম, ২০০৫ সালে স্পেন, ২০০৯ সালে নরওয়ে, একই বছর সুইডেন, ২০১০ সালে পর্তুগাল, একই সময়ে আইসল্যান্ড, ২০১২ সালে ডেনমার্ক, ২০১৪ সালে ফিনল্যান্ড এবং ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে গ্রিসে সমকামী বিয়ের বৈধতা দেয়া হয়৷

দক্ষিণ আফ্রিকা

আফ্রিকার প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০৬ সালে থেকে সমকামী বিয়ে বৈধ৷ একই সময় থেকেই তাঁরা সন্তানেরও অভিভাবক হওয়ার অনুমতি পায়৷

আর্জেন্টিনা

ল্যাটিন অ্যামেরিকার প্রথম দেশ হিসেবে ২০১০ সালে এরকম বিয়ের বৈধতা দেয় আর্জেন্টিনা৷ এরপর ঐ মহাদেশের ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও কলম্বিয়ায় সমকামী বিয়ে বৈধ করা হয়েছে৷

ব্রাজিল

ল্যাটিন অ্যামেরিকার তৃতীয় দেশ হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে ব্রাজিলে সমকামী বিয়ে বৈধ৷ ছবিটি ঐ বছরের ৮ ডিসেম্বর তোলা৷ সেদিন প্রায় ১৩০ সমকামী জুটি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন৷ এক অনুষ্ঠানে এতজন সমকামীর বিয়ে করার ওটিই ছিল তখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ৷

যুক্তরাষ্ট্র

দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে সমকামী বিয়ে বৈধ ঘোষণা করে৷ উত্তর অ্যামেরিকার ক্যানাডা ও মেক্সিকোর পাঁচটি রাজ্যেও এখন এই বিয়ে বৈধ৷

নিউজিল্যান্ড

এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের একমাত্র দেশ যেখানে ২০১৩ সালের এপ্রিলে সমকামী বিয়ে বৈধ করা হয়৷ ছবিতে নিউজিল্যান্ডের কুইন্সটাউন থেকে অকল্যান্ডগামী একটি ফ্লাইটে এমন একটি বিয়ে পড়ানোর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে৷

এর আগে ২০০৯ সালে নাজ ফাউন্ডেশনের মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট জানায়, ‘‌‘‌৩৭৭ ধারার ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌনকর্ম' অংশটি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক৷'‌'‌ সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যান জ্যোতিষী কৌশল৷ ২০১৩ল সালের ডিসেম্বরে দেশের শীর্ষ আদালত রায় দেয়, ‘‌‘‌৩৭৭ ধারা অসাংবিধানিক নয়৷ তবে কেন্দ্র সরকার চাইলে নতুন আইন করতে পারে৷''‌‌ আদালতের সেদিনের রায়ে অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন৷ এরপর দিন কয়েক আগে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে তাঁরাই বেজায় খুশি৷ গত আড়াই দশক ধরে ভারতে সমকামী আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক পবনী ঢালি বা কলকাতার ‘‌ট্রান্সজেন্ডার উন্নয়ন বোর্ড'‌-‌এর সদস্য, রূপান্তরকামী নারী রঞ্জিতা সিং বলেন, ‘‘‌আমার বিশ্বাস, মূল ধারার বাইরের যৌনতাও আইনি স্বীকৃতি পাবে৷ কিন্তু, তা নিয়ে আরও অনেক জলঘোলা হওয়ার আশঙ্কা করেছিলাম৷ এত তাড়াতাড়ি আশার আলো দেখব ভানিবি৷'‌'‌ একই বক্তব্য, রূপান্তরকামী মানুষদের৷ তাই শোরগোল পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও৷

সমকামিতা নিয়ে সদ্য প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি খেহর-সহ চার বিচারপতিই একমত৷ তাঁরা বলেছেন, ‘‌‘‌সুরেশ কৌশল বনাম নাজ ফাউন্ডেশন মামলার রায়ে যেভাবে সু্প্রিম কোর্ট দিল্লি হাইকোর্টের রায় খারিজ করে বলেছিল, এলজিবিটি-দের ‘তথাকথিত অধিকার' রক্ষার উৎসাহেই হাইকোর্ট নানা দেশের দৃষ্টান্তে আস্থা রেখেছে, সেটা ‘ঠিক' হয়নি৷'‌'‌  এঁদের মতে, ‘‌‘‌যৌন সত্তা ব্যক্তির অস্তিত্বের অচ্ছেদ্য অংশ৷ সমতা, স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অধিকারের সমান৷ এলজিবিটি সম্প্রদায় যৌন সংখ্যালঘু হতে পারেন, কিন্তু সেই যুক্তিতে তাঁদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না৷ তথাকথিত মূলস্রোত বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যৌন সংখ্যালঘুদের নিয়ে কী ভাবছেন, তাতেও কিছু আসে-যায় না৷'‌'‌ বিচারপতিরা মনে করছেন, ‌ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় সামান্য কয়েকজন শাস্তি পেয়েছেন৷ ফলে তাতে বিশাল কোনো অধিকার লঙ্ঘন হয়নি – কৌশল মামলার এই যুক্তি ‘ত্রুটিপূর্ণ এবং সমর্থন-অযোগ্য৷

এখনও ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারা রদ করার লড়াই চলছে৷ এই প্রসঙ্গে বিচারপতিরা বলেছেন, ‘‌‘‌অন্য বেঞ্চে বিচারাধীন মামলায় অন্য বেঞ্চ রায় দেবে৷'‌'‌ তবে সমাজকর্মীরা মনে করছেন, আদালতের এই পর্যবেক্ষণে ৩৭৭ রদ করার লড়াই অনেকটাই এগিয়ে রইল৷ সমকামী নারীদের এক সংগঠনের নেত্রী মালবিকার কথায়, ‘‘সাতরঙা সমাজ গড়তে ৩৭৭ রদ করতেই হবে৷''

পরিবেশ

লম্বা গলার জিরাফ

জিরাফদের সমলিঙ্গের মধ্যে ভালোবাসার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়৷ এমনকি গবেষকরা বলছেন, জিরাফদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই সমলিঙ্গের সঙ্গীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়৷

পরিবেশ

বোতলনাক ডলফিন

এই প্রজাতির স্ত্রী ও পুরুষ দুই ধরনের ডলফিনের মধ্যেই সমকামিতা দেখা যায়৷ মুখ এবং নাক দিয়ে স্পর্শ করে সঙ্গীকে আদর করে তারা৷ পুরুষ ডলফিনরা সাধারণত উভকামী৷

পরিবেশ

সিংহের আনুগত্য

পশু রাজ সিংহের মধ্যেও সমকামিতা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার৷ দুই থেকে চারটি পুরুষ সিংহ একটি জোট গঠন করে, যাতে সিংহীরা তাদের কাছে আসতে না পারে৷ অন্য জোট থেকে বাঁচতে একে অপরের উপর ভীষণ নির্ভরশীল তারা৷

পরিবেশ

বাইসন

পুরুষ বাইসনদের মধ্যে সমকামিতা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার৷ কেননা স্ত্রী বাইসনদের সঙ্গে বছরে একমাত্র একবার মিলন হয় তাদের৷ তাই প্রজনন মৌসুমে পুরুষ বাইসনরা একে অপরের সঙ্গে দিনে বহুবার মিলিত হয়৷

পরিবেশ

বানরদের ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’

ম্যাকাক প্রজাতির নারী ও পুরুষ বানর – উভয়ের মধ্যে এই প্রবণতা রয়েছে৷ যেখানে পুরুষরা মাত্র একরাতের জন্য সমলিঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়, সেখানে স্ত্রী বানররা নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তোলে এবং একে অপরের সঙ্গে থেকে যায়৷

পরিবেশ

অ্যালবাট্রসদের বন্ধন

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের লেসন অ্যালবাট্রসরা তাদের সমকামী বন্ধনের জন্য ভীষণভাবে পরিচিত৷ এরা এতটাই বন্ধনে জড়িয়ে যায় যে পুরো জীবন একসাথে কাটিয়ে দেয়, যেন মনে হবে একটি সন্তান সহ স্বামী-স্ত্রীর সুখি পরিবার৷

পরিবেশ

যৌন-বিকারগ্রস্ত বনোবো

পিগমি শিম্পাঞ্জী বা বনোবোকে বলা হয় মানবজাতির সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ প্রাণী৷ তারা খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মিলিত হতে থাকে, এমনকি সমলিঙ্গের সঙ্গে৷ নিজেদের আনন্দের জন্যই এটা করে তারা৷ তবে এটা ঠিক তারা এটাকে নিজেদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করা এবং দুশ্চিন্তা দূর করার উপায় হিসেবেও মনে করে৷ স্ত্রীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি৷

পরিবেশ

প্রতি ৫টির মধ্যে একটি রাজহাঁস সমকামী

অনেক পাখিদের মতো রাজহাঁসরাও একগামী এবং বছরের পর বছর ধরে তারা এক সঙ্গীর সঙ্গে কাটিয়ে দেয়৷ এদের মধ্যে অনেকেই সঙ্গী হিসেবে সমলিঙ্গের হাঁসকে বেছে নেয়৷ শতকরা ২০ ভাগ রাজহাঁস সমকামী এবং তারা প্রায়ই পরিবার গঠন করে৷

পরিবেশ

সিন্ধুঘোটক

পুরুষ সিন্ধুঘোটক চার বছর বয়সের আগে যৌনসক্ষমতা লাভ করে না৷ এর আগ পর্যন্ত তাদের প্রায় সবাই সমকামী থাকে৷ যখন তাদের চার বছর হয় তখন হয় তারা উভগামী হয়, না হলে কেবল প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী সিন্ধুঘোটকদের সঙ্গে মিলিত হয়৷

পরিবেশ

ভেড়াদের পছন্দ

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পুরুষ ভেড়ার পালের ৮ ভাগ ভেড়াই সঙ্গী হিসেবে পুরুষদের পছন্দ করে, এমনকি প্রজননের সময়ও৷

প্রতিবেদনটি নিয়ে আপনার মন্তব্য জানান, লিখুন নীচের ঘরে৷