সরকার বাতিল করছে না, তাই ৫৭ ধারার অপব্যবহার চলছেই

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় আনিসুর রহমান নামের আর এক সাংবাদিককে জেলে পাঠানো হয়েছে৷ সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে আশ্বাস দেয়া হলেও বিতর্কিত এ আইন বাতিল করা হচ্ছে না, এর অপব্যবহারও থামছে না৷

এর আগে সর্বশেষ গত আগস্টে জেলে যেতে হয়েছিল খুলনার সাংবাদিক আব্দুল লতিফকে৷

বুধবার দৈনিক সংবাদ-এর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সাংবাদিক আনিছুর রহমানকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মামলায় আটক করে পুলিশ৷ পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়৷ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করে অন্য দুই ব্যক্তির দেয়া ফেসবুক পোস্ট তিনি শেয়ার করেছেন৷ সাংবাদিক আনিসুর রহমান ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন৷ তিনি আদালতে বলেছেন, এ ধরনের কোনো বিকৃত পোস্ট তিনি শেয়ার করেননি৷ তারপরও আনিসুর রহমানকে আটক করা হলেও যারা ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷

এখন লাইভ
02:15 মিনিট
বিষয় | 02.11.2017

‘‘আমি অপরাধী হলে চার্জশিট দিন’’

এর আগে শুধুমাত্র খবরের লিংক ফেসবুকে শেয়ার করার কারণেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা হয়েছে৷ ‘সকালের খবর'-এর সিনিয়র সাংবাদিক আজমল হক হেলাল এমন মামলার শিকার৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায়৷ মঠবাড়িয়ার সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে পার্লামেন্ট ওয়াচ নামে একটি অনলাইনসহ আরো কয়েকটি দৈনিকে খবর প্রকাশ হয়৷ আর আমি সেই খবরের লিংক ফেসবুকে শেয়ার করি৷ সেই কারণে আমার বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয় জুলাই মাসে৷ আমি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেয়ার পর জেলা আদালত থেকে স্থায়ী জামিন নিয়েছি৷'' 

আজমল হক হেলাল জানিয়েছেন, এখন তাঁকে প্রতি মাসে দু'বার আদালতে হাজিরা দিতে হয়৷ তাঁর দাবি, পুলিশকে তিনি বলেছেন,‘‘আমি অপরাধী হলে চার্জশিট দিন, বিচার শুরু হোক, কিন্তু পুলিশ তা-ও করছে না৷'' জাতীয় দৈনিকের এই সাংবাদিকের মামলার ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হলেও যারা খবরটি পরিবেশন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি৷ 

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেনসহ চার জনের বিরুদ্ধে দিনাজপুরে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয় ৩ জুলাই৷ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী হযরত আলী বেলাল বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন৷ ‘বিচারপতির লাল সিঁড়ি ও দেলোয়ারের ক্র্যাচ' শিরোনামে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ায় এই মামলা হয়৷ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বিচারক ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা হয়েছে৷

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

শাম্মী হক, অ্যাক্টিভিস্ট, বাংলাদেশ

‘‘বাংলাদেশের মানুষ তাদের মনের কথা বলতে পারেন না৷ সেখানে কোনো বাকস্বাধীনতা নেই এবং প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে৷ একজন সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার হিসেবে আমি ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করি, যা ইসলামিস্টরা পছন্দ করেনা৷ তারা ইতোমধ্যে ছয় ব্লগারকে হত্যা করেছে৷ ফলে আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ভেনেজুয়েলা

‘‘বাকস্বাধীনতা হচ্ছে এমন এক ধারণা যার অস্তিত্ব আমার দেশে নেই৷ সাংবাদিকরা জরিমানা আর নিজের জীবনের উপর ঝুঁকি এড়াতে সরকারের সমালোচনা করতে চায়না৷ সরকারের সমালোচনা করলে সাংবাদিকদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়৷ এরকম পরিস্থিতির কারণে অনেক সাংবাদিক দেশ ছেড়ে চলে গেছেন৷ দেশটির আশি শতাংশ গণমাধ্যমের মালিক সরকার, তাই সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

রোমান দবরোখটভ এবং একাতেরিনা কুজনেটসোভা, সাংবাদিক, রাশিয়া

রোমান: ‘‘রাশিয়ায় সরকার আপনাকে সেন্সর করবে৷ আমাদের ওয়েবসাইটটি ছোট এবং লাটভিয়ায় নিবন্ধিত৷ ফলে আমি সেন্সরশিপ এড়াতে পারছি৷ তা সত্ত্বেও সরকার মাঝে মাঝে আমাদের সার্ভারে হামলা চালায়৷’’ একাতেরিনা: ‘‘রাশিয়ায় বাকস্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই৷ ইউরোপের মানুষ রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে স্বাধীন৷ আমি আশা করছি, রাশিয়ার পরিস্থিতিও বদলে যাবে৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, সিরিয়া

‘‘বেশ কয়েক বছর ধরেই সিরিয়ায় বাকস্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই৷ এমনকি আসাদের শাসনামল সম্পর্কে অনুমতি ছাড়া মতামতও প্রকাশ করা যায়না৷ এটা নিষিদ্ধ৷ কেউ যদি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাহলে খুন হতে পারে৷ আমি যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনামূলক কিছু লিখি, তাহলে বেশিদিন বাঁচতে পারবো না৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

আয়েশা হাসান, সাংবাদিক, পাকিস্তান

‘‘পাকিস্তানে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’ শব্দ দু’টি খুবই বিপজ্জনক৷ এগুলোর ব্যবহার আপনার ক্যারিয়ার বা জীবন শেষ করে দিতে পারে৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

রাবা বেন দউখান, রেডিও সাংবাদিক, টিউনিশিয়া

‘‘আমাদের অভ্যুত্থানের একমাত্র ফল হচ্ছে বাকস্বাধীনতা৷ আমরা এখন আমাদের সরকারের সমালোচনা করার ব্যাপারে স্বাধীন৷ এবং আমি যখন আমাদের অঞ্চলের অন্য দেশের বাসিন্দাদের বাকস্বাধীনতার কথা জিজ্ঞাসা করি, তখন একটা বড় ব্যবধান দেখতে পাই৷ আমাদের দেশে দুর্নীতিসহ নানা সমস্যা আছে সত্যি, তবে বাকস্বাধীনতা কোনো সমস্যা নয়৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

খুসাল আসেফি, রেডিও ম্যানেজার, আফগানিস্তান

‘‘বাকস্বাধীনতা আফগানিস্তানে একটি ‘সফট গান৷’ এটা হচ্ছে মানুষের মতামত, যা সম্পর্কে সরকার ভীত৷ এটা চ্যালেঞ্জিং হলেও আমাদের প্রতিবেশীদের তুলনায় আমাদের অবস্থা ভালো৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

সেলিম সেলিম, সাংবাদিক, ফিলিস্তিন

‘‘ফিলিস্তিনে সাংবাদিকদের খুব বেশি স্বাধীনতা নেই৷ একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, সাংবাদিকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করতে পারে না৷ ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করছে৷ তারা যদি ফেসবুকে তাদের মতামত জানায়, তাহলেও সরকার গ্রেপ্তার করে৷ তবে সিরিয়া বা ইরাকের চেয়ে অবস্থা ভালো৷’’

বাকস্বাধীনতা যেখানে যেমন

অনন্য আজাদ, লেখক, বাংলাদেশ

‘‘আমাদের দেশে কোনো বাকস্বাধীনতা নেই৷ আপনি ইসলাম বা সরকারের সমালোচনা করে কিছু বলতে পারবেন না৷ ইসলামী মৌলবাদীরা ঘোষণা দিয়েছে, কেউ যদি ইসলামের সমালোচনা করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে৷ আমি একজন সাংবাদিক এবং গত বছর আমাকে ইসলামিস্ট জঙ্গিরা হত্যার হুমকি দিয়েছে৷ ফলে আমাকে দেশ থেকে পালাতে হয়েছে৷’’

একই দিনে আরেকটি মামলা করা হয় দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, সিনিয়র রিপোর্টার তৌফিকুল ইসলাম বাবরের বিরুদ্ধে৷ গত ২২ জুন ‘খুনের মামলার আসামিরা হাছান মাহমুদের ক্যাডার' শিরোনামে একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় মামলাটি করা হয়৷ ওই মামলা করেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হোসেন চৌধুরী৷

এর আগে মে মাসে বিডিনিউজটোয়েন্টি ফোর ডটকম-এর প্রতিবেদক গোলাম মুজতবা ধ্রুব'র বিরুদ্ধে একই আইনে মামলা করেন মানিকগঞ্জের এক বিচারক৷ ১১ জুন ‘একটি অসুস্থ শিশু, বিচারকের ট্রাক ও একটি মামলা..' শিরোনামের প্রতিবেদনের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি করেন সিনিয়র সহকারী জজ মাহবুবুর রহমান৷

এছাড়া ৭ জুন সাংবাদিক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী৷ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, আফসান চৌধুরী সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর ছেলেকে নিয়ে ফেসবুকে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন৷

তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ছিল ২০১৫ সালের একটি মামলা৷ সে বছরের ১৬ আগস্টে এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন এবং ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে ঢাকায় আটক করা হয় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে৷ পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে তাঁকে জামিনে ছাড়া হলেও মামলা প্রত্যাহার হয়নি৷ ফরিদপুরে দায়ের করা তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মামলার বিচার শুরু হয়েছে ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাবুন্যালে৷ প্রবীর শিকদার সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার বিচার শুরু হয়ে গেছে৷ আমাকে এখন নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে৷'' তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘‘এ দেশের সাধারণ মানুষ আইনি হয়রানির শিকার হয়৷ আমিও তো একজন সাধারণ মানুষ৷ এই হয়রানি তো আমাকে মেনে নিতেই হবে৷''

২০১৫ সালে এই আইনটি সংশোধন করে ৫৭ ধারা যুক্ত হওয়ার পর থেকে  এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ওই ধারায় মামলার খবর জানা যায়৷ 

এখন লাইভ
01:23 মিনিট
বিষয় | 02.11.2017

‘‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় কালো আইন’’

সাইবার সিকিউরিটি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্য মতে, সারাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের হওয়া ৭শ' ৪০টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ মামলা রয়েছে ৫৭ ধারার৷ ২০১৩ সালে প্রথম ৩টি মামলা হওয়ার পর প্রতি বছর মামলার সংখ্যা বেড়েছে৷ ২০১৪ সালে সারাদেশে ৩৩টি মামলা হলেও ২০১৫ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫২৷ ২০১৬ সালে মামলার সংখ্যা ২শ' ৩৩টি, আর এ বছর জুলাই পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩১৯টি৷ আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়েরের সংখ্যা বেড়েছে৷

আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর শাদাত ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি এমন যে, এটা নানাভাবে অপব্যবহারের সুযোগ আছে৷ আর শক্তিমানরা এটা তাদের স্বার্থে বিশেষ করে ব্যবহার করছে৷ সরকার এই আইন বাতিলের কথা বলেছে৷ কিন্তু তারপরও এর অপব্যবহার হচ্ছে৷ সরকারের উচিত হবে নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত এই আইনটির ব্যবহার বা প্রয়োগ বন্ধ রাখা৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় কালো আইন৷ এই আইন যত ব্যবহার করা হবে সরকারের ভাবমূর্তি ততই ক্ষুন্ন হবে৷ নতুন আইনে যেন এই কালো আইনের কোনো ছায়া না থাকে৷'' 

এ বিষয়ে আপনার কোন মতামত থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন