সস্তা বিনোদনের দাপটে কমছে যাত্রার কদর

যাত্রা নিয়ে বাঙালির সেই উন্মাদনা আজ আর নেই৷ শীত পড়লেও যাত্রার আসরগুলো সব ফাঁকা৷ এক সময়ের লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক যাত্রা এখন অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে৷ কিন্তু কেন? উত্তর খুঁজতে ডয়চে ভেলে হানা দিল যাত্রামহলের অন্দরে৷

বছর দশেক আগেও কিন্তু মহকুমার গ্রামগুলি তো বটেই, শহরতলিও ছেয়ে যেত যাত্রার রঙিন পোস্টারে, মাইকে ঘোষণা চলত নিরন্তর৷ পুজোর পর পরই যাত্রার আসর বসে যেত৷ চায়ের ঠেক থেকে অন্দরমহল — সর্বত্রই চলত তার আলোচনা৷ আগে টিকিট কেটে যাত্রার আসর জমাতেন মানুষ৷ কখনও কখনও ভিড়ের চোটে যাত্রার প্যান্ডেলও খুলে দিতে হয়েছে৷ কিন্তু আজ যাত্রা দেখার অভ্যেসটা মানুষ যেন হারিয়ে ফেলেছে৷ ক্লাব, মেলা কমিটি বা পুজো উদ্যোক্তারা যাত্রা বুকিং করলে তবেই ফ্রি-তে যাত্রা দেখে মানুষ৷ টিকিট বিক্রি হয় না৷ কেন মানুষের এই অভ্যাসের পরিবর্তন?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আর্থিক স্বাচ্ছল্যও এসেছে৷ ইন্টারনেট থেকে বিনোদনের হরেক উপাদান এখন মানুষের নাগালে৷ তাই অন্য বিনোদনের সন্ধান মানুষকে যাত্রা থেকে দূরে সরিয়েছে৷ প্রখ্যাত পালাকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র এবং ভৈরব অপেরার কর্ণধার মেঘদূত গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘মূলত মহিলারাই যাত্রার প্রধান দর্শক ছিলেন৷ অতীতে যৌথ পরিবারের বয়স্ক পিসিমা, জ্যেঠিমা, কাকিমাদের হাত ধরে কচিকাঁচারাও ভিড় জমাত যাত্রা মঞ্চে৷ আবার তাঁদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতেন একাধিক পুরুষ৷ এঁরাই ছিলেন যাত্রার দর্শক৷ কিন্তু ইদানীং নিউক্লিয়ার পরিবারের সৌজন্যে, ঘরে ঘরে টিভি চ্যানেলে সারাদিন ধরে চলতে থাকা মেগা সিরিয়ালের স্রোতে মহিলারা এখন বেজায় ব্যস্ত৷ বাড়ির থেকে বেরিয়ে যাত্রা দেখে মনোরঞ্জনের মতো সময় আর তাঁদের হাতে নেই৷’’

পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা সম্মেলন বা প্রোডিউসার গিল্ড-এর চেয়ারম্যান হিসেবে মেঘদূত গঙ্গোপাধ্যায় জানান, বছরে সারা বাংলা মিলিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার ব্যবসা করে যাত্রাদলগুলি৷ এর মধ্যে ৫ কোটি চিৎপুর কেন্দ্রিক আয়৷ ভৈরব অপেরা ২০১০ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে প্রায় ২০০-র কাছাকাছি পালা করেছে৷ কিন্তু রাজনৈতিক পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এবং বেসরকারি চ্যানেলের সাঁড়াশি আক্রমণে সেই সংখ্যাটা অনেক কমে গেছে৷

অডিও শুনুন 02:29
এখন লাইভ
02:29 মিনিট
বিষয় | 05.12.2017

টিভি চ্যানেলে সারাদিন ধরে চলতে থাকা মেগা সিরিয়ালের স্রোতে মহি...

শুধু টিভি নয়, মোবাইলও ঘা মেরেছে যাত্রার শিকড়ে৷ নিউ যাত্রালোক অপেরার সঙ্গে যুক্ত অভিনেতা কান্তিময় ভাণ্ডারী ডয়চে ভেলেকে বলেন, আজকাল যাত্রা করে মানুষকে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখা মুশকিল৷ যাত্রার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িয়ে থাকা এই শিল্পীর বক্তব্য, ‘‘এই প্রজন্ম যাত্রা নিয়ে তেমন আগ্রহী নয়৷ মঞ্চে যাত্রা চলাকালীন এই প্রজন্ম মোবাইলে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ করতেই ব্যস্ত থাকে৷ মন সেখানেই পড়ে থাকে৷ আবার ভালো না লাগলে তাঁদের অনেকে যাত্রা ছেড়ে বেরিয়েও যাচ্ছেন৷’’

সমাজ সংস্কৃতি | 13.05.2014

অস্বীকার করার উপায় নেই যে তথ্য-প্রযুক্তির দ্রুত উত্থানের সঙ্গে খুব অল্প সময়ে যাত্রা তার নিজের জায়গাটা হারিয়েছে৷ তার স্থান নিয়েছে সান্ধ্যকালীন টিভি সিরিয়াল, মঞ্চ কাঁপিয়ে চটুল নাচ-গানের অর্কেস্ট্রা, বুগিউগি ডান্স৷ লোকশিক্ষার অন্যতম মাধ্যম যাত্রা শুধু কি এই কারণেই পিছিয়ে পড়ছে? কান্তিময় ভাণ্ডারীর আপসোস, ‘‘আগে যেখানে ৫-১০ হাজার দর্শক হতো, সেখানে এখন ১ হাজার দর্শক হলেই অনেক৷ দর্শককে যাত্রা মঞ্চে নিয়ে আসাই কঠিন হয়ে পড়েছে৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

প্রাসাদোপম নিবাস

নৈহাটি স্টেশন থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে কাঁটালপাড়া৷ ১৮৪০ সালে এখানেই এই বিশাল অট্টালিকাটি তৈরি করেন বঙ্কিম-পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়৷ তবে যাদবচন্দ্রের উইলে বঙ্কিম এই বাড়ির ভাগ পাননি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পারিবারিক রথ

১৮৬২ সালে বঙ্কিমের দাদা শ্যামাচরণের উদ্যোগে প্রথম রথ বের হয়৷ রথটি নাকি প্রস্তুত হয়েছিল তমলুকে৷ সে বছরই আরম্ভ হয় রথের মেলা৷ পরবর্তীতে এই রথের মেলার একটি ঘটনাই ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের জন্ম দেয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মেলার প্রস্তুতি

বঙ্কিমভবনের সামনে শতাব্দী প্রাচীন রথের মেলা বসে আজও৷ মেলাপ্রাঙ্গনের পেছনেই শিবমন্দির ও বঙ্কিমের বৈঠকখানা৷ ১৮৬৬ সালে বসতবাড়ির দক্ষিণে নিজস্ব বাগানে এই বৈঠকখানা তৈরি করেন বঙ্কিম৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গৃহদেবতা রাধাবল্লভ

বঙ্কিমের মাতামহ রঘুদেব ঘোষাল রাধাবল্লভজিউয়ের কৃপা লাভ করেন৷ তারপর থেকেই চাট্টুজ্জেরা বংশপরম্পরায় রাধাবল্লভের সেবাইত ছিলেন৷ বঙ্কিমের নিজের জীবনে রাধাবল্লভজির প্রভাব ছিল গভীর৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পুনর্নির্মিত নাটমন্দির

সংস্কারের অভাবে দীর্ঘদিনই বঙ্কিমের ভিটে ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়েছিল৷ ১৯৮৪ সালে বাড়িটি রাজ্য সরকার অধিগ্রহণ করে৷ ১৯৯৯ সালে গড়ে ওঠে ‘বঙ্কিম ভবন গবেষণা কেন্দ্র’৷ তাঁদেরই উদ্যোগে চাটুজ্জেদের এই নাটমন্দিরটি নতুন ভাবে নির্মিত হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বারান্দা থেকে দৃশ্যমান রেল

১৮৬২ সালেই বেঙ্গল রেলের উদ্বোধন হয়৷ বঙ্কিম ভবনের পাশ দিয়ে দমদম থেকে রানাঘাট রেল চালু হলো৷ কাঁটালপাড়ার কাছেই ব্যস্ত নৈহাটি স্টেশন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শয়নকক্ষ

বঙ্কিম পত্নী রাজলক্ষ্মী দেবী ছিলেন বাড়ির কল্যাণস্বরূপা৷ সাহিত্যসম্রাট বলেছেন, ‘‘তিনি না থাকিলে আমি কী হইতাম, বলিতে পারি না৷’’ ছবিতে শয়নকক্ষের দেওয়ালে সস্ত্রীক বঙ্কিম৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পাগড়িতে যায় চেনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে যে বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে সকলের থেকে আলাদা করা যায়, তা হলো তাঁর শিরোভূষণ৷ বঙ্কিম ভবনে আজও যা সযত্নে রক্ষিত৷

সমাজ-সংস্কৃতি

আঁতুড়ঘর

যাদবচন্দ্রের তৃতীয় পুত্র বঙ্কিমের জন্ম ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন৷ এই সেই আঁতুড়ঘর৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফলকে লেখা নাম

আঁতুড়ঘরের কেন্দ্রে বইয়ের জোড়া পাতার মতো খোলা এই ফলক৷ তাতেই উৎকীর্ণ বঙ্কিমের আবির্ভাবের অভিজ্ঞান৷

সমাজ-সংস্কৃতি

রক্ষণশীল অন্দরমহল

যাদবচন্দ্রের রক্ষণশীলতা মেনে বঙ্কিম পরিবারের কোনো নারীই তখন বিদ্যালয়মুখী হননি৷ এ বাড়িতে হতো বাল্যবিবাহও৷ বঙ্কিমের নিজের বিয়েই হয়েছে দশ বছর আট মাস বয়সে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

সৃষ্টির ঘর

বঙ্কিম নির্মিত বৈঠকখানাই কালক্রমে হয়ে ওঠে বাংলা নবজাগরণের পীঠস্থান৷ এই ঘরেই লেখা হয়েছিল ‘বন্দেমাতরম’ গানটি৷ বঙ্কিম ব্যবহৃত চেয়ার-টেবিল সেই সৃষ্টিপর্বের সাক্ষী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বঙ্গদর্শনের মজলিস

বৈঠকখানার হলঘরেই বসত বঙ্গদর্শনের মজলিস৷ উপস্থিত থাকতেন দিকপাল সব কবি-সাহিত্যিকরা৷ নবীনচন্দ্র সেন, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ৷ এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গদর্শন, প্রচার ও ভ্রমর পত্রিকা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নবরূপে বঙ্গদর্শন

বঙ্কিম প্রবর্তিত ‘বঙ্গদর্শন’ এখনও প্রকাশিত হয়৷ তাঁর জন্মদিনে প্রকাশিত হল বিশেষ সংখ্যা৷ এবারের বিষয় কলকাতার সংগ্রহশালা৷

নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির সাফল্য যাত্রার মতো লোকশিল্পকে অনেকটাই কোণঠাসা করে দিয়েছে৷ তবে এ জন্য যাত্রাশিল্প নিজেও অনেকটাই দায়ী৷ এমনটাই মনে করেন কলকাতায় যাত্রার পীঠস্থান চিৎপুরের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ৷

৪০ বছর আগে নট্ট কোম্পানির হাত ধরে যাত্রামঞ্চে চলচ্চিত্র শিল্পীদের আগমন ঘটেছিল৷ একসময় পশ্চিমবঙ্গের যাত্রায় মুম্বইয়ের ডাকসাইটে অভিনেত্রীদেরও দেখা পাওয়া গেছে৷ কয়েক বছর আগেই রবীনা ট্যান্ডন, শক্তি কাপুর বা পদ্মিনী কোলাপুরীর মতো বলিউডি অভিনেতারা পশ্চিমবঙ্গের যাত্রামঞ্চে মুখ দেখিয়েছেন৷ তবে অতীতের যাত্রাশিল্পী বীণা দাশগুপ্তা, গুরুদাস ধাড়া, শান্তিগোপাল, অশোক কুমার, ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়, স্বপন কুমার প্রমুখদের উজ্জ্বল উপস্থিতি যাত্রায় আজ নেই৷

সমাজ সংস্কৃতি | 08.07.2010

অনেকের মতে, যাত্রার নিজস্ব গুণী শিল্পীদের যে শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে, সেই হিসেবে যাত্রা দলগুলি কোনো প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রীকেও তুলে আনতে পারছে না৷ নবাগতরা যাত্রার তুলনায় টেলিভিশনে মুখ দেখানোয় বেশি আগ্রহী বলে দাবি করলেন চিৎপুরের এক প্রযোজক৷ তিনি বললেন, নবীন নাট্যকারদের কলমের সংলাপে সেই ধারও নেই যা মানুষকে যাত্রামুখী করে তুলতে পারবে আগের মতো৷ যাত্রার জগতে প্রতিভার অভাব এখন দৃশ্যমান৷ সবাই অবশ্য এতটা হতাশ নন৷ তবে অভিনেত্রী ও পালা নির্দেশিকা রুমা দাশগুপ্তার কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে কর্মশালার আয়োজন করে, তাতে অনেক নতুন ছেলেমেয়ে উঠে আসছে৷ এ বছরই ১০-১২টা নতুন ছেলেমেয়ে উঠেছে৷ তাদের মধ্যে ৪-৫ জন আমারই দলে৷ এদের তৈরি করে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের, যাঁরা কর্মশালার শিক্ষক হিসেবে থাক৷’’ 

টিভির সঙ্গে যুদ্ধে যাত্রা হেরে গিয়েছে, এটা মেনে নিতে দ্বিধা নেই ২২ বছর ধরে যাত্রার সঙ্গে জড়িত অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারীর৷ এ বছরও যাত্রায় অভিনয় করছেন তিনি৷ কীভাবে টিভি হারিয়ে দিল যাত্রাকে? চলচ্চিত্র তথা টেলিজগতের জনপ্রিয় মুখ পাপিয়া বললেন, ‘‘টিভি সিরিয়াল আর গেম শো মানুষকে টেনেছে৷ বিশেষত কৌন বনেগা ক্রোড়পতি-র মতো গেম শো ইচ্ছেপূরণের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে৷ যাত্রার তুলনায় দর্শক ওই উইশফুল থিঙ্কিংয়ে বেশি আনন্দ পাচ্ছেন৷’’ মেঘদূতের মতো পাপিয়া অধিকারীও মহিলা দর্শকদের আগ্রহ হারানোর কথা বলেছন৷ অভিনেত্রীর মতে, গৃহিণীরা যাত্রার প্রধান দর্শক ছিলেন, তাঁরা এখন সিরিয়াল আর গেম শো-তে বিনোদন খুঁজে নিচ্ছেন৷ তাই সার্বিকভাবে দর্শকের সংখ্যা কমছে৷

অডিও শুনুন 07:40
এখন লাইভ
07:40 মিনিট
বিষয় | 05.12.2017

কৌন বনেগা ক্রোড়পতি-র মতো গেম শো ইচ্ছেপূরণের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছ...

অবশ্য যাত্রা যে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, সেটা মেনে নিতে চাইছেন না যাত্রাভিনেত্রী তথা সংগ্রামী যাত্রা প্রহরী বা আর্টিস্ট গিল্ড-এর কর্ত্রী রুমা দাশগুপ্তা৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘যাঁরা বলছেন যে টিভি সিরিয়ালের দৌড়ে যাত্রা হেরে গিয়েছে, তাঁরা ঠিক বলছেন না৷ একটা সময় আমরা প্রায় ১০ বছর এই টিভি সিরিয়ালের জন্য ভুগেছি৷ সন্ধে ৫টা-৬টা থেকে বাড়ির মহিলারা সেই যে টিভি খুলতেন, তা সাড়ে ১০টা-১১টার আগে বন্ধ হতো না৷ তবে বিগত চার বছর মানুষ টেলিদুনিয়ার কৃত্রিম জগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন৷ এই ৪-৫ বছর প্রত্যেকেই খুব ভালো শো পাচ্ছেন৷ সবাই খুব ভালো ব্যবসা করেছে৷ শুধু গতবছর নোট বাতিলের কারণে কিছুটা অসুবিধা হয়েছিল৷ অনেক শো বাতিল হয়েছিল৷ এ বছর অসময়ের বৃষ্টির জন্যও কিছু অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়েছিল৷ তবে এগুলো তাৎক্ষণিক৷ যাত্রা সব সংকট কাটিয়ে আবার মরা গাঙে জোয়ার এনেছে৷’’

পৌরাণিক পালা পরবর্তী যুগে ‘রক্তে রোয়া ধান’, ‘মা মাটি মানুষ’, ‘স্পার্টাকাস’, ‘আট ঘণ্টার লড়াই’ প্রভৃতি সামাজিক পালার মতো ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র মতো বড় হিটও পশ্চিমবঙ্গের যাত্রাপ্রিয় মানুষ দেখেছেন৷ অনেকের মতে, সামাজিক পালা তৈরির প্রবণতা ক্রমশ কমছে৷ টিভি সিরিয়ালের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে যাত্রা নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে সাংসারিক পালায়৷ ২০১৭ সালে অবশ্য বেশ কিছু সামাজিক বিষয় উঠে আসছে৷ সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতার কারণে রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, যুবশ্রী ইত্যাদি প্রকল্পও সামাজিক বিষয় হিসেবে যাত্রায় উঠে আসছে৷ দিগ্বীজয়ী অপেরা ‘কন্যাশ্রীর জোয়ারে বিশ্বজয়ী মমতা’ নামে একটি পালা মঞ্চস্থ করছে৷ সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, গ্রামীণ উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপরে জোর দিয়েছেন পালাকার৷

সমাজ-সংস্কৃতি

‘বর্তমানের কবি আমি ভাই’

কবি, গীতিকার এবং সাহিত্যিকরূপে চুরুলিয়ার দুখুমিঞা, ওরফে কাজী নজরুল ইসলাম বন্দিত৷ বাংলাদেশের জাতীয় কবি হলেও তাঁর জন্ম ও কর্ম এপার বাংলায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

আসরের মধ্যমণি

কখনও লেটোর দলে গান গেয়ে, কখনওবা মুখে মুখে কবিতা লিখে তাক লাগিয়ে দিতেন তিনি৷ ১৩-১৪ বছর বয়সে উর্দু গজল গেয়ে কবিগানের আসর মাত করেছিলেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গানে গানে

কাজী নজরুল রচিত গানের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি৷ প্রতিরোধ, সাম্যবাদ থেকে প্রেম — সব রকম গানেই সাবলীল তাঁর নিজস্ব সংগীত রীতি৷ জন্মদিনে কবিকে তাঁর সুরের অর্ঘ্যেই সার্থক প্রণতি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

একই বৃন্তে দুটি কুসুম

হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে আজও বাঙালির সেরা হাতিয়ার তিনি৷ তাই স্কুল-কলেজের পাশাপাশি নজরুলকে গানে-কবিতায় শ্রদ্ধা জানাতে বিপুল আয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

চলার পথে নজরুল

রবীন্দ্রনাথের পাশে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি৷ তাই কবিগুরুর সঙ্গে বিদ্রোহী কবির সমাদর এপার বাংলায়৷ ভারতের প্রাচীন মেট্রো রেল স্টেশনের নামকরণে সেই দুখুমিঞা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পথের সাথি কবি

কলকাতা কবি নজরুলের শ্রেষ্ঠ কীর্তির সাক্ষী৷ শহরের নানা প্রান্তে তাঁর স্মরণচিহ্ন৷ কলকাতা বিমানবন্দরগামী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কবির নামে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নজরুল মেলা

বর্ধমানের চুরুলিয়ায় কবির জন্মভিটায় প্রতি বছর এ সময় বসে নজরুল মেলা৷ তারই অনুকরণে নজরুল জয়ন্তীতে কলকাতা শহরেও বসেছে মেলা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

জনগণের কবি

কবিতা বা গানের পাশাপাশি নিজের উদার জীবনচর্চায় বাঙালি জীবনের উজ্জ্বল আইকন তিনি৷ আজও জনপ্রিয় তাঁর গান৷ রবীন্দ্রসদন মুক্তমঞ্চে মগ্ন শ্রোতারা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ছোটদের নজরুল

ছেলেবেলায় বাবুদের তালপুকুর বা কাঠবেড়ালির পেয়ারা খাওয়ার ‘কিসসা’ কে না পড়েছে! তাঁর জীবন ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর আকাদেমি৷ মেলায় বিকোচ্ছে সেই বই৷

সমাজ-সংস্কৃতি

কবি প্রণাম

স্বনামধন্য নজরুলগীতি শিল্পী প্রয়াত মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় অগ্রণী সুরসাধক৷ গায়ক-তনয়া মানসী মুখোপাধ্যায়ও দুই বাংলায় অনেকের প্রিয় শিল্পী৷ কবির জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপনে রবীন্দ্র সদনে মানসী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গানে গানে মম প্রণতি

স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবেই পরিচিত৷ দেবব্রত বিশ্বাসের মতো তিনিও গীতিকবির সুর গলায় নিয়েছেন৷ রবীন্দ্রসদনে নজরুলে মুখরিত সন্ধ্যায় স্বাগতালক্ষ্মীও উপস্থিত৷

সমাজ-সংস্কৃতি

কবির সেলফি

পাঠ্যপুস্তকে ‘ছাত্রদলের গান’ বা ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ দিয়ে পরিচয় শুরু৷ যুবা বয়স ভরে ওঠে তাঁর প্রেমের গানে৷ একান্ত মুহূর্তে নজরুল ধরা পড়েন যুগলের নিজস্বীতে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

প্রথম পূর্ণাবয়ব

রাজ্যজুড়ে কবির আবক্ষ মূর্তি রয়েছে অনেক৷ কিন্তু, পূর্ণাবয়ব মূর্তি ছিল না৷ দমদম রোডে, হনুমান মন্দিরের কাছে ১১ জ্যৈষ্ঠ বসেছে এই মূর্তিটি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফুলের জলসায় নীরব

তিনি বলেছেন, ‘‘দুঃখ সয়েছি, আঘাতকে হাসিমুখে বরণ করেছি, কিন্তু আত্মার অবমাননা করিনি৷ নিজের স্বাধীনতাকে কখনো বিসর্জন দিইনি৷’’ তাঁর এই মন্ত্রবলে বাঙালি জেগে, নতুন যুগের ভোরে৷

তবুও বলতে হয়, নিছক টিভির সঙ্গে পাল্লা দিতেই কি অশ্লীলতা আমদানি করা হয়েছে যাত্রায়? কাহিনির প্রয়োজনে নাকি নিছকই দর্শক টানার চেষ্টায় স্বল্পবাস পরিহিতা নায়িকা হাজির হচ্ছেন সেখানে! তথাকথিত ‘হট সিন’ দিয়ে যাত্রাকে সিরিয়ালের সমতুল করে তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে৷ এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে৷ আগে যেখানে ৮ থেকে ৮০ সকলেই ছিলেন যাত্রার দর্শক, সেখানে যাত্রার প্রচার দেখেই অনেকে মঞ্চের দিকে পা বাড়াচ্ছেন না৷ এ সব দৃশ্যের টানে উঠতি বয়সের ছেলেপুলেরা আসছে বটে, কিন্তু এটা যে যাত্রাশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক হচ্ছে না, সেটা বোঝাই যাচ্ছে৷

রাজ্য সরকারের সাহায্য যে যাত্রাশিল্পকে অনেকখানি চাঙ্গা করেছে, তাতে সায় দিলেন বঙ্গলক্ষ্মী অপেরার রমেন পালিত৷ তাঁর মতে, বিগত কয়েক বছরের থেকে তাঁরা এবার বেশিই শো পাচ্ছেন৷ এর কারণ কী? সরকারি পরিকাঠামো উন্নত হয়েছে৷ আগে যাত্রার অনুমতি নেওয়ার বিস্তর ঝামেলা ছিল৷ এখন সে সব নেই৷ ১০০ টাকার টিকিট অবধি করছাড়৷

পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা আকাদেমি প্রতি বছর যাত্রা উৎসবের আয়োজন করে৷ ১৯ জানুয়ারি থেকে ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ মঞ্চে চলবে সেই উৎসব৷ অনেক মানুষ টিকিট কেটে যাত্রা দেখতে আসেন৷ কিন্তু শহর কলকাতার তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই যাত্রার চাহিদা প্রবল ছিল একসময়৷ এছাড়া যাত্রায় এখন বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে, কেবল চিৎপুরেই সীমাবদ্ধ নেই৷ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমার, নিমতৌড়ি, পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন স্থানে খুলেছে যাত্রার দল৷ জনপ্রিয়তার নিরিখে টিভির বিপরীতে যাত্রার জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নমুখী, তবু এই শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লড়াই জারি থাকবে বলে জানান পাপিয়া অধিকারী৷ তাঁর কথায়, ‘‘ইতিহাস, পুরাণ, লোককথার বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে আমাদের হাতে৷ তাকে ব্যবহার করে যাত্রার হারানো জায়গা ফেরানো যায়৷ আধুনিকতার নিরিখে পাল্লা দিলে হবে না৷ তাতে যাত্রার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নষ্ট হবে৷ টিভি বা সিনেমার মতো করে তাকে তোলা যাবে না৷’’

অডিও শুনুন 08:47
এখন লাইভ
08:47 মিনিট
বিষয় | 05.12.2017

যাত্রাটাকে তুলে ধরার জন্য অনেক চেষ্টা হচ্ছে: সুধাংশু

যাত্রাকে রক্ষা করার জন্য শেষ পর্বের লড়াই চলছে, এ কথা বললে বাড়াবাড়ি হয় না৷ ২০০-র বেশি অপেরার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২০ হাজারের বেশি শিল্পী, কলাকুশলী৷ সরকারি তরফে এঁদের জন্য বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ এ বছর সেই ভাতার পরিমাণ বার্ষিক ৯ হাজার টাকা৷ এছাড়া তপনকুমার পুরস্কার (১ লক্ষ টাকা), বীণা দাশগুপ্তা পুরস্কার (৫০ হাজার টাকা) চালু করা হয়েছে৷ দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য তহবিলও হয়েছে৷ এরপরও ডয়চে ভেলে সন্ধান পেল সুধাংশু পাত্রের মতো যাত্রা কুশীলবের৷ মমতাময়ী অপেরার এই ম্যানেজার ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ কাজে যুক্ত৷ অবসরের মুখে এসে স্বীকৃতিহীন, অরক্ষিত ভবিষ্যৎ দেখে আজ তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন৷

রুমা দাশগুপ্তা, রমেন পালিতদের কথায় যতই আশাবাদ থাক, চিৎপুরের যাত্রাপাড়া ঘুরলে কিন্তু হতাশা ও আক্ষেপের সুরটাই মূলত কানে আসে৷ আদতে শিল্পীর নিষ্ঠা, একাগ্রতা, আজীবন পরিশ্রমের থেকে বেশি মূল্য পায় বাজারের চাহিদা৷ আজকের দুনিয়ায় বাজার ও প্রযুক্তি ঠিক করে দেয়, মানুষ কোনটা দেখবে, শুনবে, কোথায় বিপণন সম্ভাবনা বেশি৷ এর থেকে যাত্রার মুক্তি কোথায়? যাত্রাশিল্পের দীর্ঘদিনের সৈনিক অভিনেতা কান্তিময়ের আক্ষেপ, অনেক বেশি পরিশ্রম দিয়েও যাত্রা শিল্পীরা টেলি সিরিয়ালের শিল্পীদের তুলনায় জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে৷ জনতার সেল্ফি তোলার হিড়িকে তাঁরা কোথাও নেই৷ ফিতে কাটার উৎসবে তাঁরা ব্রাত্য৷ জীবিকার নিশ্চয়তা নেই, তবুও মঞ্চ ভালোবেসে দিনরাত যাত্রাই যেন ঘরবাড়ি, আশাবাদের জয়তু যাত্রাই তাঁদের মূলমন্ত্র৷

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে...