‘সহিংস' কন্টেন্ট ঠেকাতে ৩,০০০ কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে ফেসবুক

হত্যা বা ধর্ষণের মতো বিষয়ের লাইভ সম্প্রচার বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচনার মুখে নতুন এক ঘোষণা দিয়েছে ফেসবুক৷ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগ সাইটটি জানিয়েছে, আপত্তিকর কন্টেন্ট মনিটর করতে ৩,০০০ নতুন কর্মী নিয়োগ দেয়া হবে৷

বাড়তি ৩,০০০ কর্মী নিয়োগের ঘোষণাটি ফেসবুক দিয়েছে গত বুধবার৷ সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, আত্মহত্যা এমনকি ধর্ষণের মতো বিষয়াদি ফেসবুকে সরাসরি  সম্প্রচারের ঘটনা ঘটেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালাবিরুদ্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলো পরে সরিয়ে ফেলতেও কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়েছে ফেসবুক৷ ফলে বিশ্ব মিডিয়ায় বিষয়টির তীব্র সমালোচনা শুরু হয়৷

নতুন নিয়োগ প্রসঙ্গে ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সাকারবার্গ বলেন, ‘‘আমরা এসব কন্টেন্ট সম্পর্কে আরো সহজে রিপোর্ট করার ব্যবস্থা করছি যাতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হয়৷ এই পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যে কাউকে সহায়তার বিষয়টিও থাকতে পারে কিংবা পুরো কন্টেন্ট অপসারণ করাও হতে পারে৷''

সমাজ

‘ফেসবুক লাইভ’- এ নির্যাতন

নতুন বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে এক শ্বেতাঙ্গ তরুণের উপর নির্যাতন চালায় চার কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ-তরুণী৷ পুরো ঘটনা ‘ফেসবুক লাইভ’-এর মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল৷ শ্বেতাঙ্গ ঐ তরুণ মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল৷ পেটানোর পাশাপাশি তার চুল কেটে দেয়া হয়৷ অপরাধ করার সময় নির্যাতনকারীরা ট্রাম্প ও শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছিল৷ পুলিশ ঐ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে৷ ফেসবুক ভিডিওটি মুছে ফেলে৷

সমাজ

টুইটারে ধর্ষণের ভিডিও

২০১৬ সালের মে মাসে ব্রাজিলের রিও ডি জানেরোতে এক তরুণীকে ৩০ জনের বেশি মানুষ ধর্ষণ করে৷ তরুণীটি তার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সেখানে তাকে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করা হয়৷ তারপর একে একে তার উপর হামলে পড়ে সবাই৷ অপরাধীদের কেউ কেউ টুইটারে ভিডিও আপলোড করেছিল৷ সেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলে পুলিশের টনক নড়ে৷

সমাজ

লাইভ-এ আত্মহত্যা!

ফ্রান্সের ১৯ বছর বয়সি এক তরুণী ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে৷ এই ঘটনা সে পেরিস্কোপ অ্যাপের সাহায্য সরাসরি প্রচার করেছিল৷ ঘটনাটি ২০১৬ সালের মে মাসের৷

সমাজ

নির্যাতিতার সঙ্গে সেলফি

২০১৪ সালে দুই ইংলিশ তরুণী ৩৯ বছরের অ্যাঞ্জেলা রাইটসনের উপর প্রায় ১৭ ঘণ্টা ধরে অত্যাচার চালায়৷ এই সময় আহতের সঙ্গে সেলফি তুলে ঐ দুই তরুণী সেই ছবি স্ন্যাপচ্যাটে শেয়ার করেছিল৷ নির্যাতনের এক পর্যায়ে মারা যান রাইটসন৷

সমাজ

সেলফির কারণে ধরা পড়া

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় ম্যাক্সওয়েল ম্যারিয়ন মর্টন নামের এক টিনএজার আরেক টিনএজারকে হত্যা করে তার সঙ্গে সেলফি তুলে স্ন্যাপচ্যাটে আপলোড করেছিল৷ সেই ছবির সূত্র ধরে মর্টনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ৷ ঘটনাটি ২০১৫ সালের৷

সমাজ

বান্ধবীকে ধর্ষণ সরাসরি সম্প্রচার!

যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ বছর বয়সি এক তরুণীকে সম্প্রতি এই অভিযোগে নয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে৷ ২০১৬ সালে মারিনা লোনিনা (ছবি) নামের ঐ তরুণী তার বান্ধবীর সঙ্গে রেমন্ড গেটসের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল৷ সেখানে পান করার পর এক পর্যায়ে গেটস লোরিনার বান্ধবীকে ধর্ষণ করতে শুরু করলে পেরিস্কোপ অ্যাপের মাধ্যমে ঐ ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করেন লোরিনা৷ গ্রেপ্তার হওয়ার পর লোরিনা বলেছিল, অপরাধের প্রমাণ রাখতে তিনি ভিডিও করেছিলেন!

সমাজ

ধর্ষণ সম্প্রচারের আরেক ঘটনা

২০১৬ সালের ৩০ মার্চ পেরিস্কোপে ‘লাইভ সেক্স’ শিরোনাম দিয়ে একটি ভিডিও দেখানো হয়৷ ভিডিওটি যারা দেখেছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ‘বাজফিড’ জানিয়েছে, ভিডিওতে লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে তিন তরুণকে এক তরুণীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে দেখা গেছে৷ তবে এটি যে বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনা ছিল, সেটি বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছে বলে বাজফিডকে জানান তারা৷

সমাজ

সরাসরি ‘আত্মহত্যা’

যুক্তরাষ্ট্রের ১২ বছর বয়সি এক মেয়ে তার আত্মহত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচার করেছে৷ কেটলিন নিকোল ডেভিস নামের তরুণীটি গত ৩০ ডিসেম্বর গাছের ডালের সঙ্গে দড়ি বেঁধে আত্মহত্যা করে৷ আত্মহত্যার সময় সে বলে, এক আত্মীয়ের কাছ থেকে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ায় সে আত্মহত্যা করছে৷

আগামী বছর নাগাদ নতুন এই কর্মীদের নিয়োগ দেয়া হবে, যারা প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিটি অপারেশন্স ডিপার্টমেন্টে ইতোমধ্যে কাজ করা ৪,৫০০ কর্মীর সঙ্গে কাজ করবেন৷ তবে লাইভ সম্প্রচার মনিটর করার পাশাপাশি ‘হেট স্পিচ' বা শিশু নিপীড়ন প্রতিরোধেও কাজ করবে বলে জানান সাকারবার্গ৷ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা স্থানীয় বিভিন্ন কমিউনিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখবো, কেননা, তারাই নিজের ক্ষতি করছে এমন কাউকে রক্ষার কিংবা অন্যের দ্বারা ঝুঁকির মুখে আছে, এমন কাউকে বাঁচাতে দ্রুত এগিয়ে আসতে পারেন৷''

মার্ক সাকারবার্গ ফেসবুকের ইতিবাচক দিক সম্পর্কে জানাতে গিয়ে সম্প্রতি আত্মহত্যা থেকে এক ব্যক্তিকে বাঁচাতে সক্ষম হওয়ার ঘটনাটি তুলে ধরেন৷ ফেসবুকে বিষয়টি ধরা পড়ার পর দ্রুত সহায়তা করা সম্ভব হয়েছিল সেই ব্যক্তিকে৷ আরেকটি ক্ষেত্রে অবশ্য চেষ্টা করেও আত্মহত্যাকারীকে বাঁচানো যায়নি, জানান তিনি৷

উল্লেখ্য, ফেসবুকের দ্রুত প্রসারের পাশাপাশি এতে প্রকাশিত আপত্তিকর কন্টেন্ট দ্রুত মুছে ফেলার বিষয়টি সামনে এসেছে৷ বিশেষ করে মার্কিন নির্বাচনের পর ফেসবুকের মাধ্যমে যাতে আর ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য কঠোর আইনের উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন দেশ৷ জার্মানির মন্ত্রিসভা সম্প্রতি এক খসড়া আইন অনুমোদন করেছে৷ সেখানে ফেসবুককে চারশ' কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার সুযোগ রাখা হয়েছে৷

এআই/এসিবি (এএফপি, ডিপিএ, রয়টার্স)