সাংবাদিক ভাইবোনেরা ‘অনুসন্ধান’ শব্দটি ভুলে যাবেন না প্লিজ

যেখানে বসে লেখা শুরু করলাম তার একটু সামনে ডানদিকে থাকা একটি ছবি যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ সাগর ভাই আর রুনি আপার ছবি৷ দু’জনই যেন আমাকে দেখছেন আমি কী করি৷

আগে ব্যাপারটি সেভাবে লক্ষ্য করিনি৷ যদিও ছবিটি আজ যেখানে আছে সেখানেই আছে বেশ অনেকদিন ধরে৷ আজ যখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে লিখতে বসেছি তখনই মনে হলে যে, তাঁরা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

অনেক পাঠক হয়ত ধরতে পেরেছেন আমি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির কথা বলছি৷ ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁরা ঢাকার বাসায় খুন হন৷ সাগর ভাই একসময় ডয়চে ভেলেতে কাজ করতেন৷ তাই তাঁদের ছবি এখনও বাংলা বিভাগের রুমে রাখা আছে৷ সঙ্গে আছে শোক প্রকাশের বই৷ দেখতে দেখতে সাড়ে চার বছরের বেশি হয়ে গেলেও কেন আর কারা তাঁদের হত্যা করলো তা জানা যায়নি৷ পরিচিতজনরা প্রায়ই এ বিষয়ে জানতে চান৷ সাংবাদিক হিসেবে সত্য-মিথ্যা যেরকম খবর পাই তা তাঁদের জানাই৷ তবে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারিনা৷ তেমনি একবার শুনলাম একজন সাংবাদিক এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে অনেক দূর এগিয়েছিলেন৷ কিন্তু পরিবারের সদস্যদের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার হুমকি পেয়ে নিরূপায় হয়ে অনুসন্ধান থেকে ফিরে আসেন তিনি৷

ভিডিও দেখুন 05:01
এখন লাইভ
05:01 মিনিট
বিষয় | 23.06.2016

‘‘বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গটি নানাভাবে আসে’’

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত না হলেও শ্রেষ্ঠ অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের জন্য ২০১৪ সালে তিনজন সাংবাদিক ‘সাগর-রুনি স্মৃতিপদক' পান৷ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) আর গ্রামীণফোন যৌথভাবে এই পদক দিয়েছে৷ খেয়াল করুন, সাংবাদিক সংগঠন ডিআরইউ-র সঙ্গে আছে শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটর গ্রামীনফোন, যাদের সহ অন্য তিন মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সরকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ এনেছে৷ এছাড়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম গত বছর মোবাইল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকার কথা বলেছিলেন৷ বিশেষ করে গ্রামীণফোনের ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো' আচরণ, প্যাকেজ অফার দিয়ে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া, কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে সেবা নিতে দুর্ভোগ, ইন্টারনেট ধীরগতিসহ গ্রাহকের বিভিন্ন অভিযোগ একে একে প্রোজেক্টরে দেখিয়ে পড়ে শুনিয়েছিলেন টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী৷ এ থেকে বোঝা যায়, এসব কোম্পানি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার অনেক সুযোগ রয়েছে৷ কিন্তু সেরকমটি দেখা যায় না৷ এমনকি চারটি ফোনের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির যে সরকারি অভিযোগ সেই খবরটি প্রকাশে গড়িমসি করেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো৷

ফিরে যাই সাগর-রুনি দম্পতির কথায়৷ তাঁরা দু'জনই নিজেদের সহকর্মী হওয়ায় সাংবাদিকরা অন্তত তাঁদের হত্যা রহস্য উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন৷

সেই কালোরাত

২০১২ সালের এগারোই ফেব্রুয়ারি৷ সেদিন খুব ভোরবেলা জানা গিয়েছিল, ঢাকায় নিজের ভাড়া বাসায় খুন হয়েছেন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার এবং মেহেরুন রুনি৷ একই ফ্ল্যাটে থাকলেও প্রাণে বেঁচে যান তাদের একমাত্র শিশুপুত্র মেঘ৷

সাগর সরওয়ার

দেশি-বিদেশি একাধিক গণমাধ্যমে কাজ করার পর ২০১১ সালে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন সাগর সরওয়ার (ডানে)৷ সর্বশেষ সেই টেলিভিশন চ্যানেলেই কাজ করেছেন তিনি৷ ২০১২ সালের দশই ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে কাজ থেকে বাসায় ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুন হন সাগর৷

মেহেরুন রুনি

একাধিক দৈনিকে কাজ করার পর কয়েক বছর আগে টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলায় কাজ শুরু করেন মেহেরুন রুনি (বামে)৷ মাঝে স্বামীর সঙ্গে বছর দেড়েক জার্মানিতে কাটিয়েছেন তিনি৷ এরপর ২০১১ সালে আবারো ফিরে যান নিজের কর্মস্থলে৷

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার!

১১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন৷ বলাবাহুল্য, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি৷

সাংবাদিকদের আন্দোলন

বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের মধ্যে মতের অমিল থাকলেও সাগর-রুনি ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের ঘোষণা প্রদান করে সব সংগঠন৷ খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গত এক বছরে বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন৷

আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ

সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে গর্জে ওঠে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালিরা৷ জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়৷ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনও খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিবৃতি প্রকাশ করেছে৷

ব্লগারদের প্রতিরোধ

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনের পাশাপাশি ব্লগাররা এই দম্পতি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজপথে নামে৷ গত বছর এই ইস্যুতে ব্লগ ‘ব্ল্যাক আউট’ পালন করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ব্লগ৷ সামহয়্যার ইন ব্লগে এখনো রয়েছে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্যানার৷

রিপোটার্স উইদাআউট বর্ডার্স

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে রাজপথে ব্লগারদের সক্রিয় আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকাসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ইত্যাদি ইস্যুতে ব্লগ লিখে ডয়চে ভেলের দ্য বব্স প্রতিযোগিতার রিপোটার্স উইদাআউট বর্ডার্স অ্যাওয়ার্ড জয় করে আবু সুফিয়ানের বাংলা ব্লগ৷ ছবিতে আন্দোলনরত আবু সুফিয়ান৷

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাটকীয় ঘোষণা

গত অক্টোবর মাসে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে ‘জড়িত’ আটজনকে চিহ্নিত করে সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান৷ বাকি একজনকে গ্রেপ্তার করা হয় গত সপ্তাহে৷ ব়্যাব গ্রেপ্তারকৃতদের বলছে ‘সন্দেহভাজন’৷ আর পরিবার মনে করছে, এদেরকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কার্যত ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজানো হচ্ছে৷

আন্তর্জাতিক তদন্ত চান পরিবার

সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের এক বছর হলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই৷ ধরা পড়েনি মূল অপরাধীরা৷ তাই তাদের পরিবার এখন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করেছেন৷ রুনির ভাই নওশের রোমান জানিয়েছেন, তারা (ব়্যাব) তদন্তের চেয়ে হয়রানি করতে বেশি উৎসাহী৷ সাগর রুনির একমাত্র সন্তান মেঘের নিরাপত্তাও প্রত্যাহার করা হয়েছে৷

জজ মিয়া নাটক চান না সাগরের মা

সাগরের মা সালেহা মনির এখনও কাঁদেন৷ তাঁর দাবি হচ্ছে, প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে হবে৷ এক বছর পর দারোয়ান এনামুলকে গ্রেফতার তাঁর কাছে জজ মিয়া নাটক ছাড়া কিছুই নয়৷ তাঁর মতে, এক বছরে নানা টালবাহানা করে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে৷

কিন্তু সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতোই আলোচিত তনু হত্যাকাণ্ডের রহস্যের সমাধানে কোনো অনুসন্ধান চোখে পড়ছে না৷ চলতি বছরের মার্চে কুমিল্লা সেনানিবাসে তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়৷ সেনানিবাস এলাকায় ঘটনাটি ঘটার কারণে শুরুতে অনেক তথ্য ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে৷ এখনও তা চলছে৷

জুলাইতে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার কিছু বিষয় নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা দূর করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না৷ যেমন ৩ আগস্ট তাহমিদ হাসিব খানকে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রায় দুই মাস পর গতমাসের শুরুতে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয়৷ একইসঙ্গে আটক দেখানো হাসনাত করিমকে এখনও কারাগারে আটক রাখা হয়েছে৷ যদিও তাঁর বিরুদ্ধে এখনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি৷ সামাজিক মাধ্যমে অস্ত্র হাতে তাহমিদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে৷ ভিডিওতে হাসনাত করিমকে জঙ্গিদের সঙ্গে দেখা গেছে৷ যদিও এসবে তাঁরা অপরাধী প্রমাণিত হন না তবুও তাহমিদকে কেন ছেড়ে দেয়া হলো, আর হাসনাতকে এতদিন ধরে অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটকে রাখা হচ্ছে, এই বিষয়গুলো জানতে চান পাঠক ও দর্শক৷ কিন্তু এক্ষেত্রে শুধু পুলিশ পরিবেশিত সংবাদ প্রকাশ আর প্রচার হতে দেখছি আমরা৷ অথচ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারেন সাংবাদিকরা৷

DW Bengali Mohammad Zahidul Haque

জাহিদুল হক, ডয়চে ভেলে

এভাবে একে একে অনেক ঘটনার কথা বলা যাবে যেগুলো নিয়ে অনুসন্ধান হওয়া উচিত ছিল৷ পুলিশের সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যার পর তাঁকেই একরকম জোর করে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়ার পেছনে কাঁরা ছিলেন, লিমনকে ভয়ংকর ‘সন্ত্রাসী' বানানোর পেছনে কাঁরা আছেন, দিনের পর দিন ক্রসফায়ারের সাজানো গল্পের পেছনে কাঁরা – এ সব যদি সাংবাদিকরা খুঁজে বের না করেন তাহলে নাগরিকরা কোনোদিনও সেসব জানতে পারবেন না৷ অথচ রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে এ সব কাজ৷ তাই সাংবাদিক ভাইদের কাছে অনুরোধ, বছরে একটি করে হলেও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন করবেন আপনারা৷ যে যে বিটে (যেমন ক্রাইম, টেলিকম, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি) কাজ করেন সে বিষয়েই যদি সবাই প্রতিবছর অন্তত একটি করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দেন তাহলেই দেশের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে৷ আর আপনারাও আপনাদের কাজ ঠিকমতো পালন করতে পারায় আনন্দ অনুভব করবেন৷ 

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷