সাফল্য থাকলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মানুষ খুশি নয়

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি বোঝার জন্য শুধুমাত্র হাসপাতাল, চিকিৎসক, ঔষধ বা হাসাপতালের বেড ও রোগীর অনুপাতের হিসাব দেয়া যথেষ্ট নয়৷ এর সঙ্গে গড় আয়ু, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার এবং চিকিৎসা খরচ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন৷

১৬ কোটি মানুষের দেশে কতজন চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা তাদের মধ্যে কেমন সেটাও জানা জরুরি৷ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সূচক দেশের মানুষের গড় আয়ু৷ বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে৷ এই গড় আয়ু এখন ৭০ বছর ছাড়িয়ে গেছে৷ ২০০৯ সালে একজনের গড় আয়ু ছিল ৬৭. ২ বছর৷ আর ২০১৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭০.১ বছর৷ গত এপ্রিলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসস্টিকস অব বাংলাদেশ' প্রকল্পের প্রাথমিক ফলাফলে এ তথ্য পাওয়া গেছে৷ তাতে বলা হয়েছে, নারীর গড় আয়ু ৭১.৪ বছর আর পুরুষের ৬৮.৮ বছর৷ বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে পৌনে তিন বছর বেশি বাঁচেন৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

জনসংখ্যাবিদ ও বিবিএস গড় আয়ু বাড়ার পিছনে যে কারণগুলোকে চিহ্নিত করেছেন তা হলো- শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, বাল্যবিবাহ প্রবণতা কমে যাওয়া, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকের  অগ্রগতি৷ এখন মানুষ প্রাণঘাতী রোগের দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন৷ তাই এই প্রাণঘাতী রোগ মহামারি আকার ধারণ করতে পারছে না৷ বিবিএস বলছে, প্রতিবছরই গড় আয়ু বাড়ছে৷ একজন বাংলাদেশির গড় আয়ু ২০১০ সালে ৬৭.৭ বছর, ২০১১ সালে ৬৯ বছর ও ২০১২ সালে ৬৯.৪ বছর ছিল৷

অডিও শুনুন 05:42
এখন লাইভ
05:42 মিনিট
বিষয় | 14.10.2016

‘‘সমস্যা সমাধানে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ডাবল শিফট চালু ...

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানের ওপর সর্বশেষ যে র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮ তম৷ সার্কভুক্ত দেশগুলোর ভিতরে বাংলাদেশের উপরে কেবল রয়েছে শ্রীলঙ্কা৷ তাদের অবস্থান ৭৬ তম৷ ভারত ১১২ এবং পাকিস্তান রয়েছে ১২২তম অবস্থানে৷ ভুটান ১২৪, মালদ্বীপ ১৪৭, নেপাল ১৫০ এবং সব থেকে পিছনে রয়েছে আফগানিস্তান, ১৭৩ তম অবস্থানে৷ এই র‌্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভারতের চেয়ে ভালো বলেই প্রতীয়মান হয়৷

বাংলাদেশ মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমিয়ে আনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে৷ আর তার স্বীকৃতিও মিলেছে৷ বাংলাদেশ মা ও নবজাতকের টিটেনাস (এমএনটি) সংক্রমণ নির্মূলে সাফল্যের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে৷ গত মাসে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়৷

বিজ্ঞান পরিবেশ | 11.03.2013

মাত্র এক দশক আগেও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ৷ আর ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে মাতৃমৃত্যু হার শতকরা ৬৯ ভাগ কমেছে, যা এই ৬টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রগতি৷ এই সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুর মৃত্যু হার প্রতি হাজারে ৮৮ জন থেকে কমে ৩৮ জন হয়েছে আর নবজাতকের মৃত্যুর হার ৪২ থেকে কমে ২৩ হয়েছে৷

২০০৭ সালে যেখানে শতকরা ২৩ জন নবজাতকের জন্মের সময় প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সহয়তা নিতেন, এখন তা হয়েছে শকরা ৪২ ভাগ৷ মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সাফল্য আছে৷ প্রতি এক লাখে ১৯৯০ সালে মাতৃমৃত্যু হার ছিল ৩৯৯  আর ২০১৫ সালে তা কমে দাড়িয়েছে ১৭৬ জনে৷ মাতৃমৃত্যু  ১৯৯০ সালে প্রতি এক লাখে ছিল ৫৭৪ জন, ২০০৬ সালে তা হয়েছে ৩২০ জন৷

চিকিৎসা এবং অকাঠামো

স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ২,৮৯৪ জনের জন্য রেজিষ্টার্ড চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন৷ আর সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১,৬৯৮ জনের জন্য আছে একটি বেড৷ বাংলাদেশে মোট হাসপাতালের সংখ্যা সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ৩,৫৭৫টি৷ এরমধ্যে সরকারি হাসলপাতাল মাত্র ৫৯২ টি৷ সরকারি হাসপাতালের মধ্যে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল আছে ৪৬৭টি আর ১২৫টি হাসপাতাল বিশেষায়িত এবং জেলা পর্যায়ে৷

আর এতে স্পষ্ট যে সরকারি স্বাস্থ্য সেবার চেয়ে বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার অবকাঠামো বেশি৷ এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে৷ বেসরকারি খাতে ৫,২২০টি ডয়াগনস্টিক সেন্টার আছে৷ এর একাংশ  আবার অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতালের কার্যক্রমও পরিচালনা করে৷ তাদের সেবার মান নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ৷ অভিযোগ রয়েছে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেখানে ঠিকমতো সেবা না দিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি আগ্রহী৷

রাজনীতি

বহু পুরনো হাসপাতাল

ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল৷ ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালটি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল৷ সরকারি এ হাসপাতালটি ২০১৫ সালে প্রায় আট লক্ষ রোগীকে সেবা প্রদান করেছে৷

রাজনীতি

জরুরি বিভাগ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ভিড় করেন অসংখ্য রোগী৷

রাজনীতি

ভিড় লেগেই থাকে

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের টিকেট কাউন্টারের সামনে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের ভিড়৷ স্বল্প খরচে চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালটি একটি ভালো জায়গা৷ মাত্র ১০ টাকা টিকেট এবং ১৫ টাকা ফি দিয়ে এ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হতে পারেন একজন রোগী৷

রাজনীতি

ব্যস্ত চিকিৎসক

ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে চিকিসায় নিয়োজিত দু’জন চিকিৎসক৷ প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সঙ্কট রয়েছে হাসপাতালটিতে৷

রাজনীতি

প্রাথমিক চিকিৎসার পর...

জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা৷ এখানে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দেয়ার পর নির্দিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয় রোগীদের৷

রাজনীতি

মেঝেতে রোগী

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একটি ওয়ার্ডের চিত্র৷ বিছানা না পাওয়ায় হাসপাতালের মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিতে হয় অনেককে৷

রাজনীতি

প্রতিদিন চারশ’ নতুন রোগী

এটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আরেকটি ওয়ার্ড৷ প্রতিদিন এ হাসপাতালটিতে কমপক্ষে চারশ নতুন রোগী ভর্তি হন৷

রাজনীতি

বারান্দায় রোগীর ভীড়

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী থাকায় হাসপাতালের বারান্দায়ও রোগীদের অবস্থান নিতে হয়৷ ২৬০০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে দিনে ৩৬০০-৪০০০ রোগীর সেবা দিতে হয়৷

রাজনীতি

নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে খাবার৷ তবে এ খাবারের মান নিয়ে রোগীদের অনেক অভিযোগ আছে৷ অনেক রোগী অভিযোগ করেছেন, তাদের যে খাবার দেয়া হয়, তা খুবই নিম্নমানের৷

রাজনীতি

গরমে স্বস্তির সন্ধান

ওয়ার্ডের ভেতরে গাদাগাদি অবস্থা আর অস্বাভাবিক গরম৷ এই রোগীকে তাই তার স্বজনরা স্যালাইনসহ বাইরে নিয়ে এসেছেন একটু স্বস্তি দিতে৷

রাজনীতি

দালালদের খপ্পরে পড়েন অনেকে

প্যাথোলজিক্যাল বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে সঠিক সেবা পান না রোগীরা৷ সেজন্য অনেক সময় দালালদের খপ্পরেও পড়তে হয় তাঁদের৷

বাংলাদেশে এখন ডেন্টাল সার্জন বাদে মোট নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৭৭৬ জন৷ আর হাসপাতালে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে বেডের সংখ্যা ৯২,৮০৪ টি৷ বাংলাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক আছে৷ সেখানে কাজ করেন ১৩ হাজার ২৪০ জন কমিউিনিটি স্বাস্খ্যকর্মী৷ এসব ক্লিনিক প্রধানত মা ও শিশুদের সেবায় নিয়েজিত৷ শিশুদের প্রয়োজনীয় টিকা সরকারি উদ্যোগেই দেয়া হয়৷

টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদশের সাফল্য ঈর্ষনীয়৷ এ ক্ষেত্রে সাফল্য প্রায় শতভাগ৷ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার আরেকটি দিক হলো, এখন প্রায় ৯৭ ভাগ পরিবার নলকুপ বা টেপের পানি পান করেন৷ আর ৬৩ ভাগ পরিবার স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করে৷

যেখানে সব সাফল্য ম্লান হয়ে যায়:

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির চিত্র নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৪ সালে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে৷ তাতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার চিত্র তুলে ধরা হয়৷ প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালগুলোতে চাহিদার তুলনায় শয্যার স্বল্প৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টিকিট কাউন্টার এবং নারী রোগীর জন্য বহির্বিভাগে পৃথক বসার ব্যবস্থা নেই৷

জেলা সদর হাসপাতালে সিসিইউ, আইসিইউ, সিটি স্ক্যান যন্ত্র এবং লিফট নেই৷ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেই৷ উপজেলা পর্যায়ে এ সমস্যাটি আরও প্রকট৷ জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর জন্য জ্বালানি তেলের বরাদ্দ পর্যাপ্ত নেই৷ হাসপাতালে মজুদ ওষুধের তালিকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেমন টানানো হয় না, তেমনি নিয়মিত তা হালনাগাদও করা হয় না৷

অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে যন্ত্র সচল থাকে না৷ এছাড়াও আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে ফিল্ম ও ইসিজি যন্ত্রের অভাব রয়েছে৷ জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে ডিজিটাল এক্স-রে, ইকো-কার্ডিয়াক, মাইক্রোস্কোপ প্রভৃতির অভাব রয়েছে৷ হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্সও কম৷ অনুমোদিত অ্যাম্বুলেন্সের সবগুলো আবার সচল নয়৷

দুর্নীতি, অনিয়ম:

টিআইবি'র প্রতিবেদনে বলা হয়,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে ১০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিতে হয়৷ সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগনির্ণয় কেন্দ্র ও দালালদের কমিশন ভাগাভাগির সম্পর্ক রয়েছে৷

অডিও শুনুন 07:28
এখন লাইভ
07:28 মিনিট
বিষয় | 14.10.2016

‘‘বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে অভিযোগ আছে এবং সে অভিযোগ কিছুট...

অ্যাডহক চিকিৎসক নিয়োগে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে জানায় টিআইবি৷

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, হাসপাতালে রোগীর পথ্যের সরবরাহকারী বাছাইয়ে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে৷ এতে সব ঠিকাদারের দরপত্রে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকে না৷ ঠিকাদার দরপত্র কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমঝোতা আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ আদায় করে৷ দরপত্রে উল্লিখিত খাদ্যসহ নানা দ্রব্য সঠিকভাবে সরবরাহ করা হয় না৷

চিকিৎসকদের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশনভিত্তিক চুক্তি থাকে৷ এ কমিশনের হার নির্ভর করে কোনো ডাক্তার কত রোগী পাঠায়, তার ওপর৷ এ কমিশনের হার ৩০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত হয়৷ একইভাবে দালালদের কমিশন ১০ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে৷

সরকারি চিকিৎসকরা বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালেই সময় দেন বেশি৷ রোগীদের সেখানেই যেতে বলেন৷ বেসরকারি হাসপাতালে অনেক ক্ষেত্রে প্যাথোলজিস্ট না রেখে তাদের সিল ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রতিবেদন তৈরি করে রোগীদের রিপোর্ট দেয়া হয়৷ আর সেখানে কোন পরীক্ষার কত খরচ তার কোনো নিয়মনীতি নেই৷ চিৎিসকরাও মোটা অংকের ফি আদায় করেন৷

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় অনেক চড়া হলেও মান দেখার যেন কেউ নেই৷

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ছে কিন্তু পর্যাপ্ত নয়

স্বাস্থ্য খাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছে৷ এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৪শ' ৮৭ কোটি টাকা৷ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি৷ যা মোট বাজেটের ৫.৬ শতাংশ, গত অর্থ বছরের তুলনায় ১.৩ শতাংশ বেশি৷ স্বাস্থ্য খাতে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল মোট ১২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪.৩ শতাংশ৷ আর  ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সার্বিক উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলিয়ে এ খাতের জন্য ১১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা মোট বাজেটের ৪.৪৫ শতাংশ ছিল৷ এর আগে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বাজেটের ৪.৮৬ শতাংশ বরাদ্দ ছিল৷

যা জানালেন একজন চিকিৎসক

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের অধ্যাপক এবং নাক, কান ও গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মনি লাল আইচ লিটু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে  এখনো চিকিৎসা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য সেবা অপ্রতুল৷ এখানে যেমন চিকিৎসক এবং হাসপতালের বেড প্রয়োজনের তুললায় অনেক কম, তেমনি রোগ নির্নয়ের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই৷ ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো চাইলেও রোগীদের ঠিকমতো চিকিৎসা দিতে পারেনা৷ প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে সরকারি হাসপাতালে লম্বা লাইন হয়৷''

তিনি বলেন, ‘‘এটা সত্য যে এর বিপরীতে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার অনেক দাম৷ সবার পক্ষে তাই সেই সেবা নেয়া সম্ভব হয়না৷''

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘কমিশন খাওয়া, ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ৷ এসব যারা করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আইনে আছে৷''

টেলিমেডিসিন

তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা সেবা দেয়ার নাম টেলিমেডিসিন৷ এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা মোবাইল ফোন ও ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন৷

বাংলাদেশে টেলিমেডিসন

উন্নত দেশে অনেক আগেই টেলিমেডিসিন সেবা চালু হলেও বাংলাদেশে সম্প্রতি এটা শুরু হয়েছে৷ গত দুই বছরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ টেলি মেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পেয়েছে, বলে গত জুনে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম৷

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতিটি উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ ও ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ওয়েব ক্যামেরা প্রদান করা হয়েছে৷ ফলে নিম্ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীদের জন্য উচ্চ পর্যায়ের হাসপাতালসমূহে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে৷

গ্রামে টেলিমেডিসিন

ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রে স্কাইপে ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবহার করে টেলিমেডিসিন সেবা দেয়া হচ্ছে৷ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বসে চিকিৎসকগণ বিনামূল্যে প্রতি কর্মদিবসে এই সেবা দিচ্ছেন বলে অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে৷

কমিউনিটি ক্লিনিকে টেলিমেডিসিন

কমিউনিটি ক্লিনিকে টেলিমেডিসিন সেবা চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ ইতিমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওয়েব ক্যামেরাযুক্ত মিনি ল্যাপটপ কম্পিউটার সরবরাহ করা শুরু হয়েছে৷

বিজিবি হাসপাতালে টেলিমেডিসিন

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সাল থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি-র সব হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা চালু হয়েছে৷ এর ফলে ঢাকার বাইরে থাকা বিজিবি-র বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বিজিবি সদস্যরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ নিতে পারবেন৷

মোবাইল ফোনে স্বাস্থ্য সেবা

প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে সরকার একটি করে মোবাইল ফোন দিয়েছে৷ রোগীরা সেখানে দিনের যে-কোনো সময় ফোন করে সরকারি চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা ও পরামর্শ নিতে পারবেন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে৷ আপনার এলাকার ফোন নম্বর পাবেন এই লিংকে... http://app.dghs.gov.bd/inst_info/mobile_search.php

এসএমএস-এর মাধ্যমে প্রসূতি পরামর্শ

একজন মা গর্ভধারণ করলে তিনি এসএমএস-এর মাধ্যমে প্রসূতি পরামর্শ নিতে পারেন৷ এ জন্য তাঁকে আগে নিবন্ধিত হতে হবে৷ তাহলে তিনি নিয়মতিভাবে প্রসূতি বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ পেতে থাকবেন৷ নিবন্ধনের নিয়মের জন্য যেতে হবে এই লিংকে.. http://www.dghs.gov.bd/index.php/bd/e-health/2013-06-18-09-06-38/279-pregnancy-care-advice-by-sms

‘আপনজন’

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও প্রসূতি মায়েদের মোবাইলের মাধ্যমে পরামর্শ ও সেবা দেয়ার ব্যবস্থা চালু আছে৷ এমন একটি সেবার নাম ‘আপনজন’৷ এর মাধ্যমে গ্রাহকরা বার্তা পাওয়ার পাশাপাশি কম খরচে টেলিফোনে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে পারেন৷ এই লিংকে (http://aponjon.com.bd/Content.php?MId=36&SubMId=25) গেলে গ্রাহক হওয়ার নিয়ম জানা যাবে৷

অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটুর প্রস্তাব, ‘‘সমস্যা সমাধানে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ডাবল শিফট চালু করা যেতে পারে৷ তাতে কর্মঘন্টা বেড়ে যাবে এবং বেশি মানুষ চিকিৎসা সেবা পাবে৷''

তিনি জানান, ‘‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা চালু হয়েছে এবং সুফল পাওয়া যাচ্ছে৷ এজন্য অবশ্য সরকারে খবরচ বাড়বে৷ তবে গ্রহণযোগ্য ফি'র বিনিময়েও দ্বিতীয় শিফট চালু করা যায়৷''

মনিলাল আইচ লিটু দাবি করেন, ‘‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে নানা অনিয়ম এবং অব্যবস্থা থাকলেও এখন ওষুধ সরবরাহের বিষয়টি বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে৷ সরকারি হাসপাতাল থেকে এখন ১৫০ ধরণের ওষুধ দেয়া হয় বিনামূল্যে৷''

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক যা বললেন

স্বাস্থ্য অথিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ডয়চে ভেলেকে বলেন ‘‘পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে৷ ৩৩তম বিসিএসে আমরা ছয় হাজার ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছি৷ তাদের উপজেলা পর্যায়ে পোস্টিং দিয়েছি৷ তারা কিন্তু দু'বছর ধরে উপজেলা পর্যায়ে আছেন৷ কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গেছি৷ এখন ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন হাসপাতালগুলোর সার্বিক অবস্থা মনিটর ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে৷ এরপরও অব্যবস্থাপনা যে নেই তা নয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছি৷''

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে অভিযোগ আছে এবং সে অভিযোগ কিছুটা সত্যও৷ আমরা অবৈধ ক্লিনিক হাসপাতালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাই৷''

বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি- এটা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা স্বাস্থ্যবিমা চালু করছি৷ ধনী লোকরা নিজেরাই প্রিমিয়ামের টাকা দেবেন, গরিব মানুষের প্রিমিয়াম দেবে সরকার৷ এটা ২০৩০ সালের আগেই হবে৷ তখন সরকারি আর বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেদ দূর হবে৷ তাছাড়া মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হচ্ছে, তাই এই সেবার প্রতি তাদের আগ্রহ এবং চাপ বাড়ছে৷ এটাও একটা অগ্রগতি৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷