সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানকে কারা নিয়ে গেছে?

সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার ধানমন্ডির বাসা থেকে বিমানবন্দর যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মারুফ জামান (৬১)৷ তাঁকে পরিকল্পিতভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য নিশ্চিত করছে৷

প্রায় একই সময়ে তাঁর বাসা থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা নিয়ে যান কয়েকজন ব্যক্তি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

নিজের প্রাইভেট কার নিজেই চালিয়ে বিমানবন্দর যাচ্ছিলেন মারুফ জামান৷ বিমানবন্দরের কাছে খিলক্ষেত এলাকা থেকে সেই গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে৷

ধানমন্ডি ৯/এ সড়কের ৮৯ নম্বর বাসায় পরিবার নিয়ে বাস করেন মারুফ জামান৷ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি বাসা থেকে একাই বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন৷ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাঁর মেয়ে সামিহা জামান বিদেশ থেকে বিমানবন্দরে এসে পৌঁছানোর কথা ছিল৷ মেয়েকে আনতেই তিনি বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু এরপর থেকেই তাঁর আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না৷ তিনি বিমানবন্দরে যাননি, বাসায়ও ফিরে আসেননি৷ মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর মেয়ে সামিহা জামান ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন৷

সমাজ

তথ্য গ্রহণ ও প্রেরণ

বিভিন্ন দেশে গুম হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন কিংবা মানবাধিকার সংগঠনের কাছ থেকে পাওয়া গুম সংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে পাঠিয়ে থাকে জাতিসংঘের সংস্থা ডাব্লিউজিইআইডি৷ এসব ঘটনা নিয়ে সরকারগুলোকে তদন্ত করারও অনুরোধ জানিয়ে থাকে তারা৷ একটি নির্দিষ্ট সময় পর সেসব ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্য নিয়ে থাকে ডাব্লিউজিইআইডি৷

সমাজ

বার্ষিক প্রতিবেদন

ডাব্লিউজিইআইডি-র কাছে ১৯৮০ সাল থেকে তথ্য আছে৷ প্রতিবছর হালনাগাদ তথ্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি৷ ২০১৬ সালের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, ১৯৮০ সাল থেকে গত বছরের ১৮ মে পর্যন্ত ১০৭টি দেশের সরকারের কাছে ৫৫,২৭৩টি গুম সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে৷ এখনও ৪৪ হাজার ১৫৯টি গুমের ঘটনা নিয়ে কাজ করছে তারা৷

সমাজ

শীর্ষে ইরাক

জাতিসংঘের সংস্থাটি ইরাক সরকারের কাছে এখন পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ৫৬০টি গুম সম্পর্কে জানতে চেয়েছে৷ এর মধ্যে ১৯৮৮ সালেই মোট ১১ হাজার ৫৪৬টি গুমের তথ্য পেয়েছে ডাব্লিউজিইআইডি৷

সমাজ

এরপরে শ্রীলংকা

১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে যথাক্রমে ৪,৭০০ ও ৪,৬২৪ জনের ব্যাপারে শ্রীলংকার সরকারের কাছে তথ্য জানতে চায় ডাব্লিউজিইআইডি৷ সব মিলিয়ে সংস্থাটির কাছে সে দেশ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৩৪৯টি গুমের খবর পৌঁছেছে৷

সমাজ

অন্যান্য দেশ

সংখ্যার বিচারে ইরাক আর শ্রীলংকার পরের কয়েকটি দেশ হচ্ছে আর্জেন্টিনা (৩,৪৪৬), আলজেরিয়া (৩,১৬৮), গুয়াতেমালা (৩,১৫৪) ও পেরু (৩,০০৬)৷

সমাজ

বাংলাদেশ

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নিয়মিত গুমের ঘটনা ঘটলেও জাতিসংঘের সংস্থাটির কাছে মোট ৩৬টির তথ্য আছে৷ এর মধ্যে একটি সরকার ও আরেকটির ব্যাপারে সূত্রের কাছ থেকে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়ায় এখন মোট ৩৪টির বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে জাতিসংঘ৷ ডাব্লিউজিইআইডি-র প্রতিবেদনটি পড়তে উপরে + চিহ্নে ক্লিক করুন৷

এদিকে মঙ্গলবার রাতে খিলক্ষেত থানা পুলিশ মারুফ জামানের গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় খিলক্ষেতের তিন শ' ফিট এলাকার রাস্তা থেকে উদ্ধার করে৷

বুধবার মারুফ জামানের ছোট ভাই রিফাত জামান পরিবারের পক্ষ থেকে এক লিখিত বিবৃতি দেন৷ তাতে জানানো হয়েছে, ‘‘৪ ডিসেম্বর ছোট মেয়ে সামিহা জামানকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসতে মারুফ জামান সন্ধ্যায় ধানমন্ডির বাসা থেকে গাড়ি চালিয়ে বের হন৷ তার কিছুক্ষণ পর ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ বাসার ল্যান্ডফোনে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গৃহপরিচারিকাকে বলেন, তাঁর বাসায় কম্পিউটার নিতে কেউ একজন আসবেন৷ এর কিছুক্ষণ পর ৮টা ৫ মিনিটের দিকে তিন জন সুঠামদেহী ভদ্রলোক বাসায় এসে তাঁর ল্যাপটপ, বাসার কম্পিউটারের সিপিইউ, ক্যামেরা, একটি স্মার্টফোন নিয়ে যায় ও তাঁর ঘরে তল্লাশি চালায়৷ সেসময় তাঁর ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি৷’’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘‘৫ ডিসেম্বর দুপুরে ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয় (জিডি নং ২১৩)৷ সন্ধ্যায় তাঁর গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো-গ-২১-১৩৯৯) পুলিশ খিলক্ষেত থেকে উদ্ধার করে৷ তবে মারুফ জামানের সঙ্গে কোনও ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি৷ পরিবারের সদস্যরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন৷ আমরা তাঁকে যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধারের দাবি জানাই৷’’

পরিবারের সদস্যরা বুধবার লিখিত বক্তব্য ছাড়া সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা থেকে বিরত আছেন৷ তবে মারুফ জামানের বোন টিনা কামাল মঙ্গলবার রাতে জানান, ‘‘যারা ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে তারা মেরামতের কথা বলেই নিয়ে যায়৷ বাসায় গৃহকর্মী ছিল৷ আমার ভাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বেরিয়ে যান৷ সাড়ে সাতটার দিকে তাঁর পরিচয়ে ল্যান্ডফোনে ফোন করে কম্পিউটার সারার লোক আসার কথা এবং তাদের কম্পিউটার দিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়৷ গৃহকর্মীই তাদের বাসায় ঢুকতে দেয়৷’’

ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা গাড়িটি উদ্ধার করতে পারলেও মারুফ জামানের খোঁজ এখনো পাইনি৷ তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি৷ তাতে কয়েকজন লোককে ওই সময়ে ঢুকতে, বের হতে দেখা গেছে৷ কিন্তু তারা ছিলেন ক্যাপ ও মুখোশ পরা৷ তাই তাদের চেনা যাচ্ছেনা৷ আমরা ওই ফুটেজ ধরে চেষ্টা করছি চিহ্নিত করতে৷’’

এদিকে এরই মধ্যে পুলিশ ধানমন্ডির বাসায় কয়েক দফা গিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে৷ পুলিশ জানায়, ‘‘আমরা নানাভাবে তাঁর নিখোঁজের ক্লু পাওয়ার চেষ্টা করছি৷’’

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বিএনপি নেতা আজম খান ও তাঁর পুত্র, একজন ব্যবসায়ী এবং নর্থ সাউথের শিক্ষক মোবাশ্বারসহ সম্প্রতি আরো কয়েকটি তুলে নেয়ার ঘটনার সঙ্গে মিল আছে৷ যারা তুলে নিয়ে গেছে তারা দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং সুশৃঙ্খল৷ তারা শুধু ব্যক্তিকেই তুলে নিয়ে যায়না তারা তাদের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ক্যামেরা প্রভৃতিও নিয়ে যায়৷ এতে বোঝা যায় অপহৃত বা তুলে নেয়া ব্যক্তির প্রতি তাদের যে আক্রোশ তার সঙ্গে কোনো তথ্যের সম্পর্ক আছে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘এই ঘটনাগুলোতে রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয়না৷ ফলে বন্ধ হচ্ছেনা৷’’

প্রসঙ্গত, মারুফ জামান কাতার ও ভিয়েতনামে রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যে কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব৷ ২০১৩ সালে তিনি অবসর নেন৷ তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোরের (ষষ্ঠ শর্ট কোর্স) একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন৷

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে...