‘সাম্প্রদায়িকতা বন্ধে কড়া আইন প্রয়োজন'

বাংলাদেশের মানুষ মোটা দাগে সাম্প্রদায়িক না হলেও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কড়া আইনের পক্ষে ব্লগার আরিফ জেবতিক৷ ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সাম্প্রদায়িকতার নানাদিকে আলোকপাত করেন৷

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে মাঝেমাঝেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কথা শোনা যায়৷ সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে৷ সাম্প্রদায়িকতা ছড়াতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম কতটা ভূমিকা রাখছে?

আরিফ জেবতিক: এটার দু'টো দিক৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এটা ছড়াতে ভূমিকাও রাখছে, আবার প্রতিরোধেও কাজ করছে৷ উভয়ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ভূমিকা রাখছে৷ যখনই কোনো সাম্প্রদায়িক হামলার খবর শোনা যায়, বা এ ধরনের কিছু, তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটা নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়, এবং এক ধরনের সচেতনতা বৃদ্ধি করে৷

পাশাপাশি, এ কথাও খুবই সত্য যে, সাম্প্রদায়িক হামলা বা সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরিতে খুবই শক্তমাত্রায় কাজ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম৷ কারণ হচ্ছে, এটা মানুষের একটা অন্ধকার দিক৷ যেটা মানুষ হয়ত তার পরিবেশে বা সমাজে হয়ত এককভাবে বলতে পারে না, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এসে যেটা হয়, সে মুখোশের আড়ালে থেকে তার অন্ধকার জায়গাটা উগড়ে দিতে পারে৷ এবং তখন অন্য এলাকার আরেকজন লোক যখন দেখে যে, আমার মতো চিন্তাভাবনার আরেকটা লোক আছে, তখন সে এক ধরনের নৈতিক বা মানসিক শক্তি পায়৷ তখন দেখা যায়, এই ক্রিমিনালরা সাম্প্রদায়িক উসকানি দিতে এক ধরনের অর্গানাইজড হয়, তারা বিভিন্ন পেইজ তৈরি করে এবং সেসব পাতার মাধ্যমে উসকানিগুলোকে ছড়িয়ে দেয়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের বাইরে আর কীভাবে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে?

সাম্প্রদায়িকতার আসলে অনেকগুলো দিক আছে৷ একটা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দিক৷ আমাদের দেশে, সংখ্যালঘু মানুষের জায়গা, জমি দখল করার এক ধরনের প্রবণতা আছে৷ বিশেষ করে অনেক জায়গায় ক্ষমতা যারা চর্চা করে, যারা শক্তিশালী লোকজন, তারা তখন সাম্প্রদায়িক ধোঁয়া তৈরি করে৷ আপনি যদি বাংলাদেশে গত কয়েক বছরের সাম্প্রদায়িক হামলার ট্রেন্ড পর্যালোচনা করেন, তাহলে দেখবেন, এটার মধ্যে অন্যতম ছিল জমিজিরাত বা ব্যক্তিগত শত্রুতা, যা পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক হামলার দিকে নিয়ে এসে সেই লোকটাকে কোণঠাসা করে তার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা ছিল৷

দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাপার হলো, আমাদের এখানে যে ধর্মীয় ওয়াজমাহফিল হচ্ছে, এখানে কিছু কিছু বক্তা খুবই উগ্র, সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলে থাকে৷ আপনি দেখবেন, ইউটিউবে তাদের ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে ওরা বলছে যে, ‘‘আমাদের জন্ম হয়েছে মূর্তি ভাঙার জন্য, আমাদের জন্ম হয়েছে কাফির নিধনের জন্য৷'' এ ধরনের কথাবার্তা বলে উস্কানি দিচ্ছে৷ এই ওয়াজের শ্রোতারা সহজ, সরল মানুষ, তারা যখন ধর্মীয় ব্যাখ্যায় মনে করে যে, সত্যিই যখন আমার ধর্ম বলেছে, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করতে বা তাদেরকে ঘৃণা করতে, তখন জনমানসে এটার একটা প্রতিক্রিয়া হয়, যেটা খুবই বিপজ্জনক৷

সমাজ

সাদেকা হালিম, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে৷ শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে৷ এছাড়া দেশের প্রতিটি মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে একসঙ্গে কাজ করলে অসাম্প্রদায়িক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব৷ এ ব্যাপারে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে৷ আরেকটি বিষয় হলো, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সকল ধর্মের সবাই মিলে যার যার অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে৷

সমাজ

গোলাম কুদ্দুস, সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

কোনো ধর্মই মানুষের অকল্যাণের কথা বলে না৷ পৃথিবীর সব ধর্মই মানুষের কল্যাণের কথা বলে৷ তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে কেউ যাতে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে৷ দেশের প্রতিটি মানুষকে যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় তাহলেও দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর হবে৷

সমাজ

আইনুন নাহার সিদ্দিকা, আইনজীবী

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সব রকমের রাজনৈতিক উস্কানি বন্ধ করতে হবে৷ আমরা যেন এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের পেছনে কখনো না লাগি৷ সবাই সবার ধর্মকে সম্মান করি৷

সমাজ

শেখ শাফায়াতুর রহমান, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কখনো শক্তি আর অস্ত্র দিয়ে লড়াই করা যাবে না৷ আমাদেরকে আমাদের বুদ্ধি আর মেধা দিয়ে লড়াই করতে হবে৷ গ্রামে-গঞ্জে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে৷

সমাজ

রেখা শাহা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে দেশের সর্বত্র সকল ধর্মের উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ সবাই যেন সবার ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশ নিতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ এছাড়া সবাই মিলে একটি দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারলে সাম্প্রদায়িকতাও দেশ থেকে দূর হবে৷

সমাজ

খরাজ মুখোপাধ্যায়, অভিনেতা, পশ্চিমবঙ্গ

আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ৮৫ শতাংশ মেকআপ আর্টিস্টই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের৷ কই, আমাদের তো সমস্যা হয় না! আমরা মন থেকে কোনও বিভেদে বিশ্বাস রাখি না৷ তাই নিজেদের মধ্যেও বিভেদ জন্মায় না৷ মনের অন্ধকার দূর করাটাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বড় হাতিয়ার৷

সমাজ

রঞ্জন চক্রবর্তী, উপাচার্য, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়

সত্যিকারের জ্ঞান মনের সংকীর্ণতা দূর করে৷ তাই শুধু ডিগ্রি দিয়ে লাভ নেই৷ জ্ঞানের আলো জ্বালাতে প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে৷ সেটাই হবে আদর্শ জ্ঞাননির্ভর সমাজ৷ সেই সমাজ এমন মানুষ তৈরি করবে, যার মধ্যে উগ্রতা থাকবে না৷

সমাজ

পতিতপাবন রায়, পিয়ারলেস, পশ্চিমবঙ্গ

ব্যক্তিগতস্তরে ধর্মীয় অনুশাসন মানতে অসুবিধে নেই৷ কিন্তু সমষ্টিগতস্তরে মানতে হবে রাষ্ট্রীয় অনুশাসন৷ দেওয়ানি বিধির অধীনে সবাইকে রাখতে হবে৷ রাজনীতির অনুপ্রবেশ রুখে সবার জন্য সমান আইন প্রণয়ন দরকার৷ তবেই রাস্তা আটকে নামাজ পড়া বা মণ্ডপ তৈরি নিয়ে দাঙ্গা হবে না বা রক্তও ঝরবে না৷

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কেউ কেউ এটাও বলার চেষ্টা করেন যে, ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের উসকে দিচ্ছে কিছু ব্লগার, যারা নিজেদের নাস্তিক মনে করে এবং ধর্মবিরোধী লেখালেখি করে৷ এটা আপনি কীভাবে দেখছেন?

এটা একটা খুব উদ্ভট বিষয়৷ আপনি যদি মনে করেন যে, সূর্য পূর্বদিকে উঠছে, এ কারণে সাম্প্রদায়িক হামলা বেড়ে যাচ্ছে, সেটাও আপনি বললে তো আটকানোর কিছু নেই৷ কারণ, ইন্টারনেটের যুগে আর কত আটকাবেন৷ আর কয়টা লোকই বা ধর্মবিদ্বেষ নিয়ে লেখে৷ যারা লেখে, মানে ধরেন, একটা হিন্দু লোক তো মুসলমানকে গালি দিচ্ছে না, বা ঐ জিনিসটা হচ্ছে না৷ যারা ঐ ধরনের উগ্র ধর্মবিদ্বেষ লিখছে, তাদের কাছে ইসলামও পছন্দ না, হিন্দুত্ববাদও পছন্দ না, খ্রিষ্টানও পছন্দ না৷ সে হচ্ছে ধর্মহীন একটা লোক৷ সে ধর্মের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না৷ সুতরাং তার কারণে আপনি তো একজন হিন্দু লোককে মারতে পারেন না৷ একটা বৌদ্ধকে মারতে বা একটা রামু তৈরি করতে পারেন না৷

আপনি যদি রসরাজের ঘটনা দেখেন বা রামুর হামলার কথা বললাম, এ সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে, একটা লোক ইন্টারনেটে কিছুই বলে নাই, অথচ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, সে আমাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হেনেছে৷ রসরাজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল না, বেচারা ইন্টারনেট জানে না, জেলে মানুষ৷ কিন্তু তাকেও জড়িয়ে, ভুয়া অভিযোগ করে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে৷ এটার পেছনে জমিজিরাত এবং স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের একটা ব্যাপার ছিল৷  

সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে কী করা যেতে পারে?

সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে দু'টো কাজ করা যেতে পারে৷ প্রথমত, এক ধরনের নীতির মধ্যে তো থাকতে হবে৷ আপনি দেখবেন যে, পশ্চিমা বিশ্বে কিছুদিন আগেও কিন্তু রেসিজম ছিল৷ কিন্তু এখন যেটা হয়েছে, এটাকে একটা নীতিমালা, কড়া আইনের মধ্যে আনা হয়েছে, যে কারণে আপনি চাইলেই একজন মানুষকে তাঁর বর্ণের জন্য বা ডিফারেন্ট রেইসের জন্য ট্রিট করতে পারেন না৷ এটার একটা বিচার হয়৷

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কোনো ধরনের নীতিমালা বা আইন আছে কিনা আমরা জানি না৷ থাকলেও এটার কোনো প্রয়োগ নেই৷

পুরো সাক্ষাৎকারটি শুনতে অডিও ফাইলে ক্লিক করুন৷

এ বিষয়ে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷