‘সিরীয় হলেই শরণার্থীর আবেদন গ্রহণ করতে হবে এমন নয়'

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে সিরিয়া থেকে জার্মানিতে আসা সবাইকে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে এমন নয়, বলছেন জার্মানির এক আদালত৷

২০১৫ সালে সিরিয়ার ৪৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তি জার্মানিতে এলে তাঁকে ‘সাবসিডিয়ারি প্রোটেকশন' দেয়া হয়৷ কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন, সিরিয়া থেকে আসার কারণে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তাঁর শরণার্থী হিসেবে থাকার সুযোগ পাওয়া উচিত৷ এই অধিকার পেতে তিনি নর্থরাইন ওয়েস্টাফালিয়া রাজ্যের ম্যুনস্টার শহরের প্রশাসনিক আদালতে আপিল করেন৷ আদালত তাঁর পক্ষে রায় দিলেও উচ্চ আদালতের বিচারকরা তা বাতিল করে দেন৷ তাঁরা বলেন, সিরীয়রা দেশে ফিরে গেলে যে তাঁদের উপর নিপীড়ন চালানো হবে, এমন কোনো প্রমাণ নেই৷ কাউকে শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করতে হলে তিনি যে তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ কিংবা ধর্মের কারণে নিজ দেশে নিপীড়িত হতে পারেন, সেরকম প্রমাণ থাকতে হবে৷ এছাড়া কাউকে যদি তাঁর নিজ দেশে ফেরত পাঠালে তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাঁকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও মত দেন উচ্চ আদালত৷

আলেপ্পোয় সুখি সংসার

২০১৬ সালে তোলা কোটা পরিবারের ছবি৷ খলিল, তাঁর স্ত্রী হামিদা, সন্তান মান্নান, ডোলোভান, আয়াজ এবং নের্ভানা৷ তখন সিরিয়ায় কোনো গৃহযুদ্ধ ছিল না, ছিল না ধ্বংসলীলা৷

দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত

সিরিয়ায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর সময় খলিল কোটো সেদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি শাখার প্রধান ছিলেন৷ গৃহযুদ্ধ শুরুর পর চাকুরি হারান এই ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার৷ একসময় খাদ্য এবং পানির অভাব প্রকট হতে থাকে৷ ২০১৪ সালের এপ্রিলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তারা তুরস্ক চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে খলিলের মা বাস করতেন৷

ধাপে ধাপে আগানো

খলিল তুরস্কে কোনো কাজ খুঁজে পাননি৷ তাই ২০১৪ সালের জুলাইয়ে তাঁর পরিবার জার্মানিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন৷ খলিলের ভাই ইউরোপে বাস করেন৷ তিনিই পরিবারটিকে জার্মানিতে আসতে উৎসাহ যোগান৷ শরণার্থী হিসেবে জার্মানিতে আসার পথে বুলগেরিয়ায় একটি শরণার্থী শিবিরে ছয় মাস কাটান কোটো পরিবার৷ এই চামচটি সেই শিবিরের এক স্মৃতিচিহ্ন৷

জার্মানিতে স্বাগতম

অবশেষে জার্মানিতে কোটো পরিবার৷ জার্মানির উত্তরের শহর ব্রেমেনে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে৷ সেখানকার এক নারী খলিলকে এই জিন্সের প্যান্টটি দিয়েছেন, জার্মানিতে পাওয়া তাঁর প্রথম পোশাক এটি৷

অনিশ্চিত ভবিষ্যত

খলিলের সন্তানরা এখন জার্মান স্কুলে যাচ্ছেন৷ আর খলিল এবং তাঁর স্ত্রী হামিদা শিখছেন জার্মান৷ ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার জার্মানিতে একটি চাকরি পাবেন বলে আশা করছেন৷ সিরিয়ায় ফেলে আসা অতীত মাঝে মাঝে মনে করে আনন্দ খোঁজেন তারা৷ আয়াজের সিরিয়ার স্কুলের আইডি কার্ড এটি৷

উল্লেখ্য, সাবসিডিয়ারি প্রোটেকশন পাওয়া ব্যক্তিরা জার্মানিতে এক বছর থাকার ভিসা পান৷ আর যাঁরা শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা দেয়া হয় এবং তাঁরা জার্মানিতে পরিবার নিয়ে আসার সুযোগ পান৷

এদিকে, উচ্চ আদালতের এই রায়কে প্রশাসনিক আদালতগুলোর বিচারকদের জন্য একটি শক্তিশালী সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে৷ কারণ, শুধু নর্থরাইন ওয়েস্টফালিয়া নামের একটি রাজ্যের প্রশাসনিক আদালতগুলোতেই ১২ হাজারেরও বেশি আপিল জমা হয়েছে, যেখানে সিরীয়রা সাবসিডিয়ারি প্রোটেকশনের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন৷

সিরিয়া নিয়ে শান্তি আলোচনা

জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রায় ১০ মাস পর জেনেভায় শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে৷ সিরিয়ার সরকার ও বিরোধীরা চতুর্থ রাউন্ডের এই আলোচনায় অংশ নেবেন৷ শেষ আলোচনা হয়েছিল গত এপ্রিলে৷ সেই সময় সিরিয়ায় সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ এরপর সিরিয়ার সরকার বিদ্রোহীদের হাত থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে সমর্থ হন৷ এর মধ্যে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেয়া৷

জেডএইচ/এসিবি (কেএনএ, ডিপিএ, এপি)

সমাজ

যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যতা থেকে পালানো

২০১৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘ইসলামিট স্টেট’-এর বিস্তার ঘটার পর সিরীয়দের দেশত্যাগের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়৷ একইসময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নিগার এবং কসভোর অনেক মানুষ ইউরোপমুখী হন৷

সমাজ

সীমান্তের ওপারে আশ্রয় খোঁজা

সিরীয় শরণার্থীদের অধিকাংশই ২০১১ সাল থেকে সে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন তুরস্ক, লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন৷ কিন্তু ২০১৫ সাল নাগাদ সেসব দেশের শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা সন্তানদের শিক্ষা দিতে না পারায় এবং কাজ না পাওয়ায় এক পর্যায়ে আরো দূরে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

সমাজ

পায়ে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি

২০১৫ সালে ১৫ লাখের মতো শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে পায়ে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে চলে আসেন৷ সেসময় ইউরোপের শেঙেন চুক্তি, যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশের মধ্যে ভিসা ছাড়াই চলাচাল সম্ভব, নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ কেননা শরণার্থীরা গ্রিস থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলোর দিকে আগাতে থাকেন৷

সমাজ

সমুদ্র পাড়ির উন্মত্ত চেষ্টা

সেসময় হাজার হাজার শরণার্থী ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করেন৷ লিবিয়া থেকে ইটালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত আটশ’ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

সমাজ

সীমান্তে চাপ

ইউরোপের বহির্সীমান্তে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কয়েকটি রাষ্ট্র চাপে পড়ে যায়৷ হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক পর্যায়ে সীমান্তে বেড়া দিয়ে দেয়৷ শুধু তাই নয়, সেসময় শরণার্থী আইন কঠোর করা হয় এবং শেঙেনভুক্ত কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে৷

সমাজ

বন্ধ দরজা খুলে দেয়া

জার্মান চ্যান্সেল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর ‘ওপেন-ডোর’ শরণার্থী নীতির কারণে বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অনেক শরণার্থীই ইউরোপে আসতে উৎসাহ পেয়েছেন৷ এক পর্যায়ে অবশ্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে জার্মানিও৷

সমাজ

তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি

২০১৬ সালের শুরুতে ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যে একটি চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির আওতায় গ্রিসে আসা শরণার্থীদের আবারো তুরস্কে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করে৷ নভেম্বর মাসে অবশ্য তুরস্কের ইইউ-তে প্রবেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণার পর, সেই চুক্তি আবারো নড়বড়ে হয়ে গেছে৷

সমাজ

পরিস্থিতি বদলের কোনো লক্ষণ নেই

ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকলেও সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলার কোনো সঠিক পন্থা এখনো খুঁজে পাননি৷ কোটা করে শরণার্থীদের ইইউ-ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সহিংসতার ইতি ঘটার কোনো লক্ষণও নেই৷ ওদিকে, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে৷