সীমান্ত হত্যা বন্ধে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা

সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ-এর হাতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বেড়ে চলেছে৷ ভারত তার প্রতিশ্রতি রাখছে না৷ যারা নিহত হচ্ছে, তারা হয় সাধারণ মানুষ অথবা চোরাচালানকারী৷

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেব অনুযায়ী, গত চার বছরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বেড়েছে৷ এই হত্যাকাণ্ড মূলত ঘটছে গুলি ও নির্যাতনে৷ তাদের মতে, ২০১৩ সালে মোট ২৭ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করে বিএসএফ সদস্যরা৷ ২০১৪ সালে হত্যা করা হয় ৩৩ জন বাংলাদেশিকে৷ এরপর ২০১৫ সালে বিএসএফ-এর হাতে নিহত হন ৪৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক৷ আর চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত, অর্থৎ প্রথম ছ'মাসে সীমান্তে ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

অডিও শুনুন 04:13
এখন লাইভ
04:13 মিনিট
বিশ্ব | 26.09.2016

‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া উচিত’

চলতি মাসে লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ ও কুড়িগ্রামসহ ভারতে সীমান্ত বন্ধ ও বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের নাগরিক করার প্রস্তুতিবাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অন্তত ছ'জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়৷ সর্বশেষ শনিবার, কুড়িগ্রাম সীমান্ত বরাবর নিহত হন দু'জন৷ হিসেবে দেখা যায়, গত সাড়ে তিন বছরে ১২২ জন বাংলদেশি নিহত হয়েছেন বিএসএফ-এর হাতে৷ এছাড়া ২০১৩ সাল থেকে অব্যাহতভাবে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বাড়ছে৷

২০০৮ সালে ভারত সরকার ও বিএসএফ বাংলাদেশের জনগণকে আশ্বস্ত করেছিল যে, সীমান্তে প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, যাতে হতাহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কমানো সম্ভব হয়৷

পরে ২০১১ সালে বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাচারকারী ও অবৈধপথে সীমান্ত পার হওয়া নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার চুক্তি করে৷ ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার কথা বলা হয় বার বার৷ কিন্তু সীমান্তে বিএসএফ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করেনি, পালটায়নি তাদের আচরণ৷

আসক-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার নেতা নূর খান ডয়চে বলেন, ‘‘ভারত তার প্রতিশ্রুতি রাখছে না৷ তাই আমার মনে হয়, এখন আমাদের তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে এর সমাধান চাওয়া দরকার৷ সেটা হতে পারে জাতিসংঘ বা অন্য কোথাও৷''

অডিও শুনুন 03:59
এখন লাইভ
03:59 মিনিট
বিশ্ব | 26.09.2016

‘মাদক চোরাচালানকারীরা নিরাপদেই ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক পাচার...

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এখনও কাশ্মীর সীমান্ত থেকে রক্ষীদের এনে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে৷ তারা ভাষা বোঝে না৷ এছাড়া তাদের মধ্যে থাকে একটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব৷ ফলে তারা গুলি চালায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর৷ এদের অধিকাংশই হয় সাধারণ মানুষ অথবা চোরাচালানকারী৷ আগে বলা হতো গরু চোরাচালান সীমান্ত হত্যার প্রধান কারণ৷ কিন্তু এখন তো তা কমে গেছে৷ অথচ তারপরও সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বাড়ছে৷''

সীমান্তে ফেলানী হত্যা মামলার আইনজীবী এবং সীমন্ত হত্যা নিয়ে কাজ করা অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘গরু চোরাচালানকারীদের হত্যা করা হয়, কিন্তু মাদক চোরাচালানকারীরা নিরাপদেই ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক পাচার করছে৷ এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার৷ আবার ভারত বিশ্বে গরুর মাংস রপ্তানিতে শীর্ষে৷ কিন্তু বাংলাদেশে গরু আসতে দেবে না৷ মজার ব্যাপার, এই গরুই যখন আবার হরিয়ানা বা মধ্য প্রদেশ থেকে আসে তখন তাদের বাধা দেয়া হয় না৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বাধা দেয় হয়৷ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার আছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘কোনো হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ শুধু প্রতিবাদ জানায় এবং লাশ ফেরত চায়৷ আমার মনে হয়, প্রতিটি ঘটনায় বাংলাদেশের বিচার চাওয়া উচিত৷ যাদের হত্যা করা হয় তারা কেউই তো আক্রমণকারী নয়৷ তাহলে কেন গুলি চালানো হয়?''

আব্রাহাম লিংকনও মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কেঠায় নামতে৷

সীমান্তরক্ষীদের নতুন দায়িত্ব

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২,২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত পাহারা দেয়ায় নিয়োজিত প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় সৈন্যকে নতুন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে৷ সেটা হলো, ভারতীয় গরু যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশে পৌঁছতে না পারে৷ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএসএফ সদস্যদের এই নির্দেশ দেন যেন ‘বাংলাদেশের মানুষ গরুর মাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়’৷

গরু পবিত্র

হিন্দুদের কাছে গরু একটি পবিত্র প্রাণী৷ তাই ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করতে চায়৷ রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘ আরএসএস এর পশ্চিমবঙ্গের মুখপাত্র বলেছেন, ‘‘গরু জবাই কিংবা চোরাই পথে চালান, আর হিন্দু মেয়েকে ধর্ষণ করা বা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা একই কথা৷’’

চার যুগের ইতিহাস

ভারত থেকে চোরাই পথে আসা গরুই এতদিন বাংলাদেশের মানুষের মাংসের প্রধান উৎস ছিল৷ গত চার দশক ধরে সেটা হয়ে আসছে৷ এর সঙ্গে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য জড়িয়ে আছে৷

দাম বেড়ে গেছে

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গরুর মাংস রপ্তানিকারক বেঙ্গল মিট এর সৈয়দ হাসান হাবিব গত জুলাই মাসে রয়টার্সকে জানান, ভারতের এই সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে৷ আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাঁর কোম্পানির মাংস রপ্তানি প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে৷

চাকরি হারিয়েছে প্রায় ৪,০০০

বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশন এর প্রেসিডেন্ট শাহীন আহমেদ জানিয়েছেন, জুন পর্যন্ত চামড়া শিল্পে কর্মরত প্রায় চার হাজার কর্মীর চাকরি গেছে৷ আর ১৯০টি ট্যানারির মধ্যে ৩০টি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে৷

ভারতীয় গরুর মাংস ভালো

বেঙ্গল মিট এর সৈয়দ হাসান হাবিব বলেন, তিনি এখন নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার থেকে মাংস আমদানির চিন্তা করছেন৷ কিন্তু ভারতীয় মাংস ও চামড়ার মান ভালো বলে জানান তিনি৷ উল্লেখ্য, ভারত গরুর মাংসের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক৷

ভারতের সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন মাংসের জন্য বাংলাদেশকে নতুন উৎস খুঁজে বের করতে হবে কেননা ভারত তার সিদ্ধান্তে অটল থাকবে৷

হারুন উর রশীদ স্বপন, ঢাকা

দেবারতি গুহ

সীমান্ত হত্যা বন্ধের ব্যাপারে কি ভারত আদৌ আন্তরিক? আপনার বক্তব্য জানান নীচের ঘরে৷