1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ কেন বাড়ছে?

হারুন উর রশীদ স্বপন ঢাকা
৩০ জুন ২০১৭

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের টাকার পরিমান এক বছরে আরো বেড়েছে৷ ২০১৫ সালে তুলনায় ২০১৬ সালে টাকা রাখার পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেশি৷ বাংলাদেশ অবশ্য দাবি করেছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য তাদের কাছে নাই৷

https://p.dw.com/p/2fi9S
একটি সুইস ব্যাংকের ‘সেফ বক্স’ছবি: Reuters

বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত কয়েক বছরে ব্যাংকের লোপাট হওয়া কয়েক হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংকে জমা হওয়ার কারণেই বাংলাদেশিদের জমার পরিমান বেড়েছে৷

২০১৬ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ থেকে টাকা জমা রাখা হয়েছে ৬৬ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ ৷ বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার পাঁচশ' ৬৬ কোটি টাকা৷ এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৫ সালে এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে টাকা জমা করা হয়েছিল প্রায় ৫৫ কোটি সুইস ফ্রাঁ৷ বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় চার হাজার সাতশ' ১৭ কোটি টাকা৷ ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে টাকা জমা রাখার পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেশি৷ বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬' শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে৷

ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে নাগরিকদের সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক ও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রাখার পরিমাণ কমলেও বাংলাদেশ থেকে টাকা রাখার পরিমাণ বেড়েছে৷ ২০০৯ সালের পর থেকে ২০১০ সাল ও ২০১৪ সাল ছাড়া বাকি প্রতিটি বছরেই এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে টাকা জমা রাখার পরিমাণ বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে৷ ২০১৬ সালে এসে এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে রাখা টাকার পরিমাণ ২০০৯ সালের তুলনায় চার গুণেরও বেশি৷

এসএনবি'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে যুক্তরাজ্য থেকে৷ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান, দ্বিতীয় ভারত এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ৷ তবে গত এক বছরে ভারত থেকে টাকা জমার পরিমাণ কমে প্রায় অর্ধেক হয়েছে৷ আর সার্বিকভাবে সারাবিশ্ব থেকে ২০১৬ সালে টাকা জমা হয়েছে আগের বছরের তুলনায় ৩.৪ শতাংশ কম৷

ধারণা করা হয়, সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রাখার পরিমাণ বেড়ে যায়৷ এ ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোকেই অগ্রাধিকারভিত্তিতে বেছে নেন আমানতকারীরা৷ কারণ, গ্রাহকদের তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এসব ব্যাংক অর্থ গোপন করার জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত৷

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা সাংবাদিকদের জানান, ‘‘সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনটি কিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, সে সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক অবগত নয়৷ তবে মানি লন্ডারিং রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড়ভাবে কাজ করছে৷’’

সুইস ব্যাংক আমানতকারীদের ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করেনা: ড. নাজনীন

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস)-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যে টাকার হিসাব দেয়া যায়না বা যার উৎস বৈধ নয়, শোনা যায় এমন টাকাই বাংলাদেশিরা সুইস ব্যাংকে জমা রাখেন৷ কারণ, সুইস ব্যাংক তার আমানকারীদের ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করে না৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশের কালো অর্থনীতির আকার ফরমাল অর্থনীতির প্রায় সমান৷ আর কালো অর্থনীতির টাকা অপ্রদর্শিত অবৈধ টাকা৷ এই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধভাবে  পাচার হয়৷ এই টাকা আর কখনো বাংলাদেশে আসবে না৷’’

আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার ধারণা প্রধানত তিনটি কারণে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের  আমানত বাড়ছে৷ সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার টাকা লুট হয়েছে৷ সেই ব্যাংক লুটের টাকা সুইস ব্যাংকে জমা হয়েছে৷ এটা ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতিরই ফল৷ আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে টাকা পাচার ছাড়াও ঘুষের টাকা পাচার বেড়েছে৷ এবং বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিক যাঁরা ব্যবসা করছেন, অর্থ উপার্জন করছেন, তাঁদেরও একটি  অংশ সুইস ব্যাংকমুখী হয়েছেন৷’’

তিনটি কারণে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বাড়ছে: খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

প্রসঙ্গত, গত ২ মে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে৷ তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে৷ বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমান ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা৷ এবারের প্রতিবেদনে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা৷ এই অর্থ বাংলাদেশের দুটি বাজেটের সমান৷

আর পাচার করা এই অর্থের একটি অংশ সুইস ব্যাংকে জমা রাখা হয়৷ সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে অর্থ পাচার বেড়ে যায়৷ আর এই অর্থ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কারা পাচার করেন, তা বোঝা যায়৷ অর্থমন্ত্রী অর্থ পাচারের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কোনো পক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না৷