সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে তোলপাড়

সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা বাংলাদেশি এক নারী গৃহকর্মীর ভিডিও নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে৷ ওই গৃহকর্মী ফেরার পথে রিয়াদ বিমানবন্দরে তাঁকে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন৷ বাংলাদেশ বিষয়টির তদন্ত করছে৷

ভাইরাল হওয়া ওই ইউটিউব ভিডিওর তথ্য অনুযায়ী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে৷ তাতে বলা হয়েছে, সাত মাস আগে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে গিয়ে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশি এক নারী৷ মঙ্গলবার রিয়াদ বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে বসে এক আরবকে ওই নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি৷ তাঁর বক্তব্য ভিডিও করেছেন ওই আরব৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ভিডিওতে ওই নারীর এক হাতে ক্ষতচিহ্ন, আরেক হাতে গোটা গোটা ফোস্কা দেখা যায়৷ এক প্রশ্নের জবাবে ওই নারী বলেন, সৌদি আরবে কাজে আসার পর প্রতিদিন তাকে ছয় থেকে সাতবার গরম কিছু দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হত৷ ওই ছ্যাঁকাতেই হাতে ফোস্কা হয়েছে৷ 

অডিও শুনুন 01:09
এখন লাইভ
01:09 মিনিট
বিশ্ব | 27.08.2017

‘আমরা এখন ওই নারী গৃহকর্মীর বক্তব্য গ্রহণ করব’

কেন নির্যাতন করা হত জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কারও সাথে, বিশেষ করে স্বামীর সাথে কথা বলতে চাইলে মালিক দিত না৷ দেশে ফিরতে চাইলে নির্যাতন করা হত৷ এভাবে নির্যাতনের পর সৌদি মালিক তাঁকে বিমানবন্দরে রেখে চলে যায়৷  ওই নারী বলেন, এই কয় মাসে তাঁকে কোনো বেতন দেওয়া হয়নি৷ কিন্তু বিমানবন্দরে রেখে যাওয়ার সময় বেতন নিয়েছেন মর্মে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন মালিক৷ ভিসা ও পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতিত ওই বাংলাদেশি নারীর বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়৷ তিনি গত ২২ জানুয়ারি সৌদি আরব যান৷ সৌদিতে তার নিয়োগকর্তা আজিজা নাশহাত মোহাম্মদ আলী কাকা৷

এই বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর সরওয়ার আলম ডয়চে ভেলে বলেন, ‘‘আমরা ওই নারীকে নির্যাতনের ভিডিও সম্পর্কে জেনে তদন্ত শুরু করেছি৷ আমরা বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব দু'জায়গায়ই যোগাযোগ করেছি৷ আমরা এখন ওই নারী গৃহকর্মীর বক্তব্য গ্রহণ করব৷''

তিনি বলেন, ‘‘তিনি এখন বাংলাদেশেই তাঁর গ্রামের বাড়িতে আছেন৷ তাঁর বক্তব্য নেয়া হচ্ছে৷ আর আমরা সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি৷''

সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী নির্যাতনের আরো অভিযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কিছু অভিযোগ এর আগেও পেয়েছি৷'' এদিকে, চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় সাংবাদিক মেহেদি হাসান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নির্যাতিত ওই নারীর নাম সালমা৷ তিনি গ্রামে ফিরে আসার পর তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ তাঁর শরীরে নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে৷ তিনি শুধু বলেছেন আমার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তা বললে আপনারা স্তব্ধ হয়ে যাবেন৷'' 

পাঁচ কোটি ৩০ লক্ষ

২০১৩ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলও-র এক প্রতিবেদন বলছে, সারা বিশ্বে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫৩ মিলিয়ন৷ এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই নারী৷ তবে প্রকৃত সংখ্যাটি যে আরও কয়েক মিলিয়ন বেশি হতে পারে, সে কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এদিকে ১৫ বছরের কমবয়সি শিশু গৃহকর্মীদের সংখ্যা আইএলও-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি – ২০০৮ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৭৪ লক্ষ৷

আইনের বাইরে

আইএলও-র প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের গৃহকর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশই শ্রম আইনের সুবিধাবঞ্চিত৷

সাপ্তাহিক ছুটি

বিশ্বের প্রায় অর্ধেক (৪৫ শতাংশ) গৃহকর্মী সাপ্তাহিক ছুটি পান না৷ তাছাড়া তাঁদের এমন কোনো বার্ষিক ছুটি নেই, যার জন্য তাঁদের অর্থ প্রাপ্য (পেইড লিভ)৷

প্রসূতি সুরক্ষা

প্রতি তিনজনের একজন গৃহকর্মী এই সুবিধা পায় না বলে জানিয়েছে আইএলও৷

বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার!

গৃহকর্মী মানেই যেন কম টাকা দিয়ে বেশি ঘণ্টা কাজ করানো৷ এভাবে গৃহকর্মীদের প্রতারিত করে তাঁদের নিয়োগদাতারা অবৈধভাবে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে বলে জানিয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স ফেডারেশন’৷

‘কাফালা’ যেন দাসপ্রথার অন্য রূপ

গাল্ফ দেশগুলোতে এই ব্যবস্থা থাকার কারণে গরিব দেশ থেকে সেখানে যাওয়া গৃহকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হলেও তাঁদের নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে না৷ কারণ কাফালা ব্যবস্থার কারণে নির্যাতিতরা চাইলেও নিয়োগদাতার ছাড়পত্র ছাড়া দেশ ত্যাগ করতে পারেন না৷ ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন’ এই অবস্থাকে দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করেছে৷ আইএলও-র হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২১ লক্ষ৷

হংকংয়ে গৃহকর্মীদের অবস্থা

তিন হাজার গৃহকর্মীর উপর চালানো এক জরিপে উত্তরদাতাদের প্রায় ৫৮ শতাংশ বলেছে, তাঁদের মৌখিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে৷ ১৮ শতাংশ তাঁদের উপর শারীরিক নির্যাতনের কথা বলেছে৷ আর যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছে ৬ শতাংশ৷

বাড়ি তো নয়, যেন কারাগার!

উন্নত দেশ অস্ট্রেলিয়াতেও ভালো নেই গৃহকর্মীরা৷ ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনে সেখানে গৃহকর্মীদের সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো, বেতন না দেয়া ও শারীরিক নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে৷ প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িগুলোকে ‘কারাগার’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে৷

একা বাড়ির বাইরে নয়

না, ছোট্ট শিশুদের কথা বলা হচ্ছে না৷ ইংল্যান্ডের মতো দেশে প্রায় ৬০ শতাংশ গৃহকর্মীদের একা বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হয় না বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ‘কালায়ন’৷

সৌদি আরব এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ হাজারের মতো নারী গৃহকর্মী নিয়েছে৷ এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বা ৪০ হাজার নারী গৃহকর্মীকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷ নিয়োগকারীরা কারণ হিসেবে তাদের কাজে অনীহার কথা বললেও একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, ‘‘বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের কাজে অনীহার কারণ ভিন্ন৷ তাঁরা নির্যাতনের শিকার এবং তাঁদের বেতনও খুব কম দেয়া হয়৷''

পাঠক ভাবনা | 22.10.2015

গতবছর রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তিনটি কারণে নারী গৃহকর্মীরা তাদের কাজ ছেড়ে পালাচ্ছেন৷ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, গৃহকর্মীদের দিয়ে কঠিন কাজ করানো, গৃহকর্মীদের নিজের বাড়ির প্রতি দুর্বলতা থাকা এবং গৃহকর্তার কাছ থেকে নানা দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া

কেবল বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরাই নয়, সৌদি নাগরিকদের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ অন্য দেশগুলোও করেছে৷ ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতনের একটি খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিন্দার ঝড় তুলেছিল৷ সেবার গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েন এক সৌদি নাগরিক৷ স্বামীর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সেই নারী ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন৷

একই বছর এক ভারতীয় গৃহকর্মী তার কাজ থেকে মুক্তি চাইলে গৃহকর্তা তার ওপর হামলে পড়েন৷ কেবল তাই নয়, ক্ষুব্ধ হয়ে গৃহকর্তা একটি ছুরি দিয়ে ওই গৃহকর্মীর হাত কেটে ফেলেন৷

আপনি কি সৌদি আরবে থাকেন? সেখানে কাজের পরিবেশ কেমন? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

আরো প্রতিবেদন...