স্টুটগার্টে পার্টির নাম দেখে ভোট দেবেন না ভোটাররা

বলা হয়ে থাকে জার্মানির শান্তিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম স্টুটগার্ট৷ সেই শহরের মোট বাসিন্দার প্রায় ৪০ ভাগই হলো অভিবাসী৷ কাজেই ভোটের ফলাফল নির্ধারণে এই অভিবাসীরাই ‘বড় ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে৷

মোটর গাড়ির রাজধানী বলে খ্যাত স্টুটগার্টে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি জার্মানের সংখ্যা এখন কম নয়৷ জার্মান ডিগ্রি, অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি এদের অনেকেই অর্জন করেছেন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতাও৷ এই অর্জনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে তাই বেশ ভেবেচিন্তেই এগোচ্ছেন সবাই৷ তবে বাংলাদেশের মতো কোনোভাবেই কেবল পার্টির ‘লেবেল’ দেখে কেউ ভোট দেবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়েছেন৷ 

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বহু বছর ধরে জার্মানিতে আছেন প্রকৌশলী আদনান সাদেক৷ আদনানের মতে, ‘‘বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন বলতে আমরা সারা দেশ নিয়ে কথা বলি৷ কিন্তু এখানে তা নয়৷ ধরুন যদি স্টুটগার্টের কথাই বলি, এখানে নির্বাচনের সময় স্থানীয় বিষয় অনেক বেশি প্রাধান্য পায়৷ একজন প্রার্থী কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা আদৌ বাস্তবায়ন করছেন কি না অথবা অন্য প্রার্থী এলাকার উন্নয়নে ভিন্ন কিছু ভাবছে কি না সেসব নিয়ে সবাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে৷ যেমন অনেক উদ্বাস্তু এখন জার্মানিতে আসছে, এটা একটা জাতীয় ইস্যু বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে জার্মানির ভূমিকা কী হবে অথবা আফগানিস্তানে জার্মানি সৈন্য পাঠাবে কি না এ সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও ভোটাররা এখানে প্রথমে বিবেচনা করে তার নিজের কাজ ঠিক থাকছে কি না, বাচ্চারা সঠিক শিক্ষা পাচ্ছে কি না, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে কি না, চিকিৎসা মিলছে কি না – এসব চিন্তা করে তারা প্রার্থী বাছাই করে৷’’

Deutschland Bundestagswahlen deutsch-bangladeschische Wähler

বহু বছর ধরে জার্মানিতে থাকা প্রকৌশলী আদনান সাদেক জানাচ্ছেন তাঁর ভাবনা

‘‘এই মুহূর্তে স্টুটগার্টের বড় ইস্যু হলো প্রধান রেল স্টেশনের পুনর্নির্মাণ আর অন্যটি হলো গাড়ির ধোঁয়া থেকে পরিবেশ দূষণ কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণ৷ এই দুই ইস্যুতে যে প্রার্থী যৌক্তিকভাবে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারবেন, আমার মনে হয় ভোটাররা তার দিকে বা সেই দলের দিকেই যাবে বেশি৷’’ – বিশ্লেষণ করলেন আদনান সাদেক৷

তাহমিনা বিনতে বাতেন একটি প্রতিষ্ঠানে ড্যাটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন৷ দেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আসার পরও জার্মানিতে এসে আরও একটি মাস্টার্স করেছেন কেবল চাকুরির সুবিধার্থে৷ তাহমিনার কাছে কাজের সুযোগ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ তিনি বললেন, কষ্ট করে পড়াশুনা শেষ করে চাকুরির ক্ষেত্রে কেমন সুযোগসুবিধা পাচ্ছি, চাকুরি শেষে পেনশন, অথবা বিদেশি হিসেবে আমাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে সেই বিষয়গুলো আমি সব সময় বিবেচনা করি৷ এদেশে ছেলে-মেয়ের পার্থক্য নেই, সবাই সব কাজ করে এবং সুবিধা পায়৷ কিন্তু মুশকিল হলো ‘নন টেকনিক্যাল’ ব্যাকগ্রাউণ্ড যাদের তাদেরকে এখানে খুব হিমশিম খেতে হয় কাজ পেতে৷ আমি একজন ডেন্টিস্ট৷ আমি খুব ভালভাবেই জানি কী কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে৷ কাজেই ‘নন টেকনিক্যাল’ ব্যাকগ্রাউণ্ডের লোকজনদের জন্যও যেন কাজের সুযোগ তৈরি হয় আমি তা ভাববো৷ কারণ আমরা কিন্তু বাংলাদেশ থেকে তৈরি হয়ে আসা মানুষ৷ সে কারণেই আমি ভেবে দেখি যে বিদেশিদের জন্য কারা নমনীয়৷’’ 

প্রকৌশলী মিনহাজ দীপন অবশ্য জানালেন, ‘‘ভিনদেশি বলে তিনি কখনো অবমূল্যায়নের শিকার হননি৷ নাগরিকদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের কথা এদেশে নিজেদের খুব একটা না ভাবলেও চলে৷ বরঞ্চ এসব নিয়ে সরকারেরই মাথাব্যথা বেশি৷ প্রায় ১৫ বছরের জার্মান প্রবাস জীবন তাকে এই বার্তাই দিয়েছে৷ কাজেই সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে নতুন নতুন মাত্রা কে যোগ করছেন, কে ভিন্নভাবে ভাবছেন সেগুলো দেখার বিষয় আছে৷ গড়পড়তা সিদ্ধান্ত এদেশের মানুষ নেন না৷ তারা ব্যক্তি দেখে ও কাজ দেখে বিবেচনা করেন কাকে ভোট দেবেন৷’’

একইভাবে শিরিন আলম, আমিনুল হক রতনসহ কথা হলো আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি জার্মান ভোটারের সঙ্গে৷ তারা জানালেন, বহু বছর ধরে বাস করলেও মুসলমান বলে কখনও কোন বিরূপ পরিস্থিতিতে তাদের পড়তে হয়নি৷ এমনকি হিজাব পরলেও কেউ আড়চোখে তাকায় না৷ তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজের ক্ষেত্রে আগে থেকেই বলে নেয়া হয় যে, ‘হিজাব পরা যাবে না’৷ এছাড়া আর কোন পরিস্থিতিতে কাউকে কখনও পড়তে হয়নি৷ তবে ইদানীং কোন কোন রাজনৈতিক দল মুসলিম ও অভিবাসী বিদ্বেষী কথা বলছেন৷ তারা অবশ্য স্টুটগার্টে খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না বলেই বিশ্বাস এই ভোটারদের৷ দেশ থেকে স্বজনদের এনে একটু লম্বা সময় রাখার ব্যাপারেও আরেকটু উদারতা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তারা আশা করেন বলেও জানালেন৷

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে...

ডিজিটাল বিশ্ব

খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল (সিডিইউ)

টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল নির্বাচনি পোস্টারে এখন আর কোনো অপরিচিত মুখ নন৷ তাঁর দল সিডিইউ ২০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে গোটা জার্মানিতে ২২,০০ প্ল্যাকার্ড বসাচ্ছে৷ এতে জার্মান চ্যান্সেলরের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে জার্মান পতাকা ব্যবহারে করে দলটির দেশপ্রেম বোঝানো হয়েছে৷ আর স্লোগানে প্রাধান্য পেয়েছে নিরাপত্তা, পরিবার এবং কাজের মতো বিষয়৷

ডিজিটাল বিশ্ব

সামাজিক গণতন্ত্রী (এসপিডি)

সামাজিক গণতন্ত্রীরা তাদের দীর্ঘদিনের লাল আর বর্গাকারের লোগোকে পোস্টারে প্রাধান্য দিয়েছে৷ তাদের পোস্টারে শিক্ষা, পরিবার, পেনশন, বিনিয়োগ এবং বেতন বৈষম্যের মতো বিষয়াদি গুরুত্ব পাচ্ছে৷ ২৪ মিলিয়ন ইউরোর নির্বাচনি প্রচারণার পর নির্বাচনের ঠিক আগে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নাকি একটি বোমা ফাটাতে পারে এসপিডি, তবে সেসম্পর্ক কিছু এখনো জানা যায়নি৷

ডিজিটাল বিশ্ব

মুক্তগণতন্ত্রী দল (এফডিপি)

মুক্তগণতন্ত্রীদের নির্বাচনি প্রচারণায় খরচ হচ্ছে পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার৷ সাদাকালো ফটোশুটের মাধ্যমে পোস্টারে আধুনিক মার্কেটিংয়ের ছাপ ফুটিয়ে তুলেছে সেদেল৷ তাদের পোস্টারে শোভা পাচ্ছেন একজন: ক্রিস্টিয়ান লিন্ডার৷ তবে পোস্টারে ছোট করে লেখা নানা কথা পড়তে ভোটারদের বেশ কষ্টই করতে হবে৷ ‘অস্থিরতাও একটা গুণ’, লেখা হয়েছে পোস্টারে৷

ডিজিটাল বিশ্ব

সবুজ দল

সবুজ দল তাদের দলীয় নীতিকেই নির্বাচনের পোস্টারে তুলে ধরছেন৷ সেদলের স্লোগানে জায়গা করে নিয়েছে পরিবেশ, ইন্টিগ্রেশন এবং শান্তির মতো বিষয়৷ তাদের স্লোগান হচ্ছে, ‘‘পরিবেশই সবকিছু নয়, তবে পরিবেশ ছাড়া সবকিছুই অর্থহীন৷’’

ডিজিটাল বিশ্ব

জার্মানির জন্য বিকল্প (এএফডি)

তবে আসন্ন নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত প্ল্যাকার্ড তৈরি করেছে ডানপন্থি এএফডি পার্টি৷ আপাত দৃষ্টিতে এই পোস্টারটি দেখলে মনে হবে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী হাসছেন৷ কিন্তু স্লোগান কী বলছে জানেন? ‘‘নতুন জার্মান? তাদের আমরাই তৈরি করবো৷’’ দলটির আরেক পোস্টারে বিকিনি পরা তিন নারীকে দেখা গেছে৷ আর তাতে লেখা: ‘‘বোরকা? আমরা বিকিনি পছন্দ করি৷’’

ডিজিটাল বিশ্ব

বামদল

বামদলের পোস্টারে বিভিন্ন ফস্টের বর্ণিল উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে৷ ‘‘[বর্নিল] মানুষ৷ স্পষ্টভাবে ডানপস্থি ঘৃণার বিরোধী’’, বলছে তাদের স্লোগান৷ দলটির নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্ব পাচ্ছে সাশ্রয়ী ভাড়া, আরো স্বচ্ছ পেনশনের নিশ্চয়তা এবং অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের মতো বিষয়৷