স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নিজের মুখ ‘সামলাতে' না পারলে দেশ সামলাবেন কিভাবে?

বন্দুক আর মুখ – এই দু'টো জিনিস সামলাতে না পারলে খুব মুশকিল৷ গুলি ফসকালে প্রাণহানির আশঙ্কা৷ মুখ ফসকালে মান –প্রাণ দু'টোই যেতে পারে৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন যা-ই বলুন, তিনি কিন্তু কোনোটাই সামলাতে পারছেন না৷

বাংলাদেশে চলছে হত্যার ধারাপাত৷ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কাল হিন্দু দর্জি, পরশু ব্লগার বা সমকামী অধিকারকর্মী, পরের সপ্তাহে পীর সাহেব, তারপর হিন্দু পুরোহিত, পরের সুর্যোদয়ে খ্রিষ্টান, সুর্যাস্তেই হয়ত কোনো বিদেশি নাগরিক বা শিয়া মসজিদের মুয়াজ্জিন...৷ নিয়মিতই কেউ-না-কেউ বর্বরতার শিকার৷ ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে কিংবা না দিয়ে কাপুরুষ গুপ্ত ঘাতকেরা খেলেই যাচ্ছে রক্তের হোলি৷ শনিবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের উপর চাকপাড়া গ্রামে রক্তাক্ত লাশ হলেন বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসা ওরফে উ গাইন্দ্যা৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

৭৫ বছর বয়সি এই ভিক্ষুকেও কুপিয়েই হত্যা করা হয়৷ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দু'জন রোহিঙ্গাও রয়েছে৷ পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার সঙ্গে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত কিনা, নাকি জমি নিয়ে বিরোধ বা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে উ গাইন্দ্যাকে প্রাণ দিতে হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷

কিন্তু পুলিশের তদন্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে৷ তদন্ত ঠিকভাবে হবে কিনা এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়৷ সংশয়ের কারণ স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তাঁর একটি মন্তব্য৷

এমন ঘটনার পর সবাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকেই সবার আগে তাকান৷ বড় কিছু প্রত্যাশার তো উপায় নেই৷ এমনটি ভাবার জো নেই যে, আজ কাউকে হত্যা করা হলো আর কালই প্রকৃত হত্যাকারীকে বা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে ফেলবে পুলিশ৷ দেশের মানুষ তো কত হত্যাকাণ্ডের পর কত ২৪ ঘণ্টা, ৪৮ ঘণ্টা, সপ্তাহ-মাস-বছর পার হতে দেখেছে, প্রকৃত অপরাধী টিকিটিও কেউ দেখেনি৷ বড় আশা মানুষ করবে কীভাবে!

আজকাল মানুষ প্রাথমিকভাবে শুধু আশা করে পুলিশের বিবৃতিটা, প্রতিমন্ত্রী-মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটা একটু বাস্তবানুগ এবং দায়িত্বশীল হবে এবং সেই অনুযায়ী ধীরে হলেও তদন্তটাও এগোবে৷ বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসা ওরফে উ গাইন্দ্যা হত্যার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ওই প্রত্যাশাটুকু পূরণেও নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন৷

বান্দরবানে শনিবার ভোরে পাওয়া যায় বৌদ্ধ ভিক্ষুর লাশ৷ সেদিন দুপুরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দেন, ‘‘এটি একটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা'৷ এর সঙ্গে তাঁর (ভিক্ষু) আত্মীয়-স্বজন জড়িত রয়েছে বলে মনে করছি৷''

অথচ তদন্ত কর্মকর্তা নন, অকুস্থলে তিনি যাননি, আলামত দেখেননি, এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেননি, এমনকি কোনো তদন্তকর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করেও এমন বক্তব্য দেননি৷ তাঁর শুধু মনে হয়েছে বান্দরবানে প্রৌঢ় ভিক্ষুকে তাঁর স্বজনরা হত্যা করে থাকতে পারে এবং সেই মনে হওয়া কথটাই তিনি বলে দিয়েছেন৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে তো দূরের কথা, স্বাভাবিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন সাধারণ কোনো মানুষের কাছেও এমন বক্তব্য কেউ আশা করে না৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক বক্তব্যে অনেকেই ক্ষুব্ধ৷ অনেকেই ইতমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ বান্দরবান রাজগুরু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ মহাথের উচহ্লা ভান্তে বলেছেন, ‘‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ত দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি, নয়ত তাঁর মাথা খারাপ৷ নইলে তিনি এ কথা কেন বললেন যে স্বজনরা জড়িত? দেশের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তাঁর প্রতিটি কথা সারা বিশ্ব শোনে৷''

সমালোচনার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ‘‘কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে৷'' এর জবাবও দিয়েছেন অধ্যক্ষ মহাথের উচহ্লা ভান্তে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘‘ আমরা চাই, মুখ ফসকেও যেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কথা না বলেন৷ আমরা চাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ হবে লোহার মতো শক্ত৷ আর চাই প্রতিটি আইনি ব্যবস্থায় বিশ্ববাসী যেন বুঝতে পারে বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা শান্তিতে আছে৷''

দেখে তো মনে হয় বাংলাদেশে শুধু বর্বর গুপ্তঘাতকরাই শান্তিতে আছে৷ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর বড় বড় বিবৃতি আর আশ্বাস তো অনেক মন্ত্রীকেই দিতে শোনা যায়৷ কাজ কি খুব একটা দেখা যায়?

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

মন্ত্রীরা সবসময়ই যেন কথা বলার জন্য অস্থির৷ তাই আমরা শুধু বড় বড় কথা শুনি৷ ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন এমন মন্ত্রী-মিনিস্টার অবশ্য কখনোই খুব কম ছিলনা৷ আগের ‘নিয়ম' অনুসরণ করে এখনকার মন্ত্রীরাও প্রায়ই কথা বলার সময় নিজের মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে বক্তব্যের বিষয় মিলছে কিনা তা-ও ভেবে দেখেন না৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেটা দেখেছেন৷ নিজের মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিষয়েই কথা বলেছেন তিনি৷ শুধু এত তাড়াতাড়ি কিছু বলা উচিত কিনা, বললে কী বলা উচিত – এ সব না ভেবেই তিনি স্বজনদের ‘টার্গেট' করে ফেলেছিলেন৷ তবু ভালো, ‘মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি' বলে নিহত বৌদ্ধ ভিক্ষুর আত্মীয়-পরিজন কিংবা অন্য কোনো ভিক্ষুকে ‘পুলিশের ছত্রিশ ঘা' থেকে বাঁচিয়েছেন৷

এবার সন্ত্রাসীদের বন্দুক, চাপাতি সামলিয়ে দেশটাকে বাঁচান৷ কথা ফস্কে যাওয়া বন্ধ করতে মুখটাকেও একটু ‘সামলান' এবার৷ মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নিজের মুখই সামলাতে না পারলে, পুরো দেশটা সামলাবেন কিভাবে?

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে হত্যা করা হয় ঢাকায়, গত ৩০ মার্চ৷ তিন দুর্বৃত্ত মাংস কাটার চাপাতি দিতে তাঁকে কোপায়৷ সেসেময় কয়েকজন হিজরে সন্দেহভাজন দুই খুনিকে ধরে ফেলে, তৃতীয়জন পালিয়ে যায়৷ আটকরা জানায়, তারা মাদ্রাসার ছাত্র ছিল এবং বাবুকে হত্যার নির্দেশ পেয়েছিল৷ কে বা কারা এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছে জানা যায়নি৷ বাবু ফেসবুকে ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে লিখতেন৷

বাংলাদেশে চলছে হত্যার ধারাপাত৷ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কাল হিন্দু দর্জি, পরশু ব্লগার বা সমকামী অধিকারকর্মী, পরের সপ্তাহে পীর সাহেব, তারপর হিন্দু পুরোহিত, পরের সুর্যোদয়ে খ্রিষ্টান, সুর্যাস্তেই হয়ত কোনো বিদেশি নাগরিক বা শিয়া মসজিদের মুয়াজ্জিন...৷ নিয়মিতই কেউ-না-কেউ বর্বরতার শিকার৷ ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে কিংবা না দিয়ে কাপুরুষ গুপ্ত ঘাতকেরা খেলেই যাচ্ছে রক্তের হোলি৷ শনিবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের উপর চাকপাড়া গ্রামে রক্তাক্ত লাশ হলেন বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসা ওরফে উ গাইন্দ্যা৷

৭৫ বছর বয়সি এই ভিক্ষুকেও কুপিয়েই হত্যা করা হয়৷ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দু'জন রোহিঙ্গাও রয়েছে৷ পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার সঙ্গে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত কিনা, নাকি জমি নিয়ে বিরোধ বা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে উ গাইন্দ্যাকে প্রাণ দিতে হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷

কিন্তু পুলিশের তদন্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে৷ তদন্ত ঠিকভাবে হবে কিনা এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়৷ সংশয়ের কারণ স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তাঁর একটি মন্তব্য৷

এমন ঘটনার পর সবাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকেই সবার আগে তাকান৷ বড় কিছু প্রত্যাশার তো উপায় নেই৷ এমনটি ভাবার জো নেই যে, আজ কাউকে হত্যা করা হলো আর কালই প্রকৃত হত্যাকারীকে বা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে ফেলবে পুলিশ৷ দেশের মানুষ তো কত হত্যাকাণ্ডের পর কত ২৪ ঘণ্টা, ৪৮ ঘণ্টা, সপ্তাহ-মাস-বছর পার হতে দেখেছে, প্রকৃত অপরাধী টিকিটিও কেউ দেখেনি৷ বড় আশা মানুষ করবে কীভাবে!

আজকাল মানুষ প্রাথমিকভাবে শুধু আশা করে পুলিশের বিবৃতিটা, প্রতিমন্ত্রী-মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটা একটু বাস্তবানুগ এবং দায়িত্বশীল হবে এবং সেই অনুযায়ী ধীরে হলেও তদন্তটাও এগোবে৷ বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসা ওরফে উ গাইন্দ্যা হত্যার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ওই প্রত্যাশাটুকু পূরণেও নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন৷

বান্দরবানে শনিবার ভোরে পাওয়া যায় বৌদ্ধ ভিক্ষুর লাশ৷ সেদিন দুপুরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দেন, ‘‘এটি একটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা'৷ এর সঙ্গে তাঁর (ভিক্ষু) আত্মীয়-স্বজন জড়িত রয়েছে বলে মনে করছি৷''

অথচ তদন্ত কর্মকর্তা নন, অকুস্থলে তিনি যাননি, আলামত দেখেননি, এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেননি, এমনকি কোনো তদন্তকর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করেও এমন বক্তব্য দেননি৷ তাঁর শুধু মনে হয়েছে বান্দরবানে প্রৌঢ় ভিক্ষুকে তাঁর স্বজনরা হত্যা করে থাকতে পারে এবং সেই মনে হওয়া কথটাই তিনি বলে দিয়েছেন৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে তো দূরের কথা, স্বাভাবিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন সাধারণ কোনো মানুষের কাছেও এমন বক্তব্য কেউ আশা করে না৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক বক্তব্যে অনেকেই ক্ষুব্ধ৷ অনেকেই ইতমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ বান্দরবান রাজগুরু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ মহাথের উচহ্লা ভান্তে বলেছেন, ‘‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ত দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি, নয়ত তাঁর মাথা খারাপ৷ নইলে তিনি এ কথা কেন বললেন যে স্বজনরা জড়িত? দেশের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তাঁর প্রতিটি কথা সারা বিশ্ব শোনে৷''

সমালোচনার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ‘‘কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে৷'' এর জবাবও দিয়েছেন অধ্যক্ষ মহাথের উচহ্লা ভান্তে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘‘ আমরা চাই, মুখ ফসকেও যেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কথা না বলেন৷ আমরা চাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ হবে লোহার মতো শক্ত৷ আর চাই প্রতিটি আইনি ব্যবস্থায় বিশ্ববাসী যেন বুঝতে পারে বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা শান্তিতে আছে৷''

দেখে তো মনে হয় বাংলাদেশে শুধু বর্বর গুপ্তঘাতকরাই শান্তিতে আছে৷ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর বড় বড় বিবৃতি আর আশ্বাস তো অনেক মন্ত্রীকেই দিতে শোনা যায়৷ কাজ কি খুব একটা দেখা যায়?

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

মন্ত্রীরা সবসময়ই যেন কথা বলার জন্য অস্থির৷ তাই আমরা শুধু বড় বড় কথা শুনি৷ ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন এমন মন্ত্রী-মিনিস্টার অবশ্য কখনোই খুব কম ছিলনা৷ আগের ‘নিয়ম' অনুসরণ করে এখনকার মন্ত্রীরাও প্রায়ই কথা বলার সময় নিজের মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে বক্তব্যের বিষয় মিলছে কিনা তা-ও ভেবে দেখেন না৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেটা দেখেছেন৷ নিজের মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিষয়েই কথা বলেছেন তিনি৷ শুধু এত তাড়াতাড়ি কিছু বলা উচিত কিনা, বললে কী বলা উচিত – এ সব না ভেবেই তিনি স্বজনদের ‘টার্গেট' করে ফেলেছিলেন৷ তবু ভালো, ‘মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি' বলে নিহত বৌদ্ধ ভিক্ষুর আত্মীয়-পরিজন কিংবা অন্য কোনো ভিক্ষুকে ‘পুলিশের ছত্রিশ ঘা' থেকে বাঁচিয়েছেন৷

এবার সন্ত্রাসীদের বন্দুক, চাপাতি সামলিয়ে দেশটাকে বাঁচান৷ কথা ফস্কে যাওয়া বন্ধ করতে মুখটাকেও একটু ‘সামলান' এবার৷ মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নিজের মুখই সামলাতে না পারলে, পুরো দেশটা সামলাবেন কিভাবে?

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্লগার খুন

একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুন হন ব্লগার এবং লেখক অভিজিৎ রায়৷ কমপক্ষে দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে৷ এসময় তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদও গুরুতর আহত হন৷ বাংলাদেশি মার্কিন এই দুই নাগরিককে হত্যার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’৷ পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে৷

বাড়ির সামনে খুন

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে হত্যা করা হয় ঢাকায়, গত ৩০ মার্চ৷ তিন দুর্বৃত্ত মাংস কাটার চাপাতি দিতে তাঁকে কোপায়৷ সেসেময় কয়েকজন হিজরে সন্দেহভাজন দুই খুনিকে ধরে ফেলে, তৃতীয়জন পালিয়ে যায়৷ আটকরা জানায়, তারা মাদ্রাসার ছাত্র ছিল এবং বাবুকে হত্যার নির্দেশ পেয়েছিল৷ কে বা কারা এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছে জানা যায়নি৷ বাবু ফেসবুকে ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে লিখতেন৷

সিলেটে আক্রান্ত মুক্তমনা ব্লগার

শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ গত ১২ মে সিলেটে নিজের বাসার কাছে খুন হন নাস্তিক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস৷ ভারত উপমহাদেশের আল-কায়েদা, যাদের সঙ্গে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’-এর সম্পর্ক আছে ধারণা করা হয়, এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷ দাস ডয়চে ভেলের দ্য বব্স জয়ী মুক্তমনা ব্লগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন৷

বাড়ির মধ্যে জবাই

ব্লগার নিলয় চট্টোপাধ্যায়কে, যিনি নিলয় নীল নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, হত্যা করা হয় ঢাকায় তাঁর বাড়ির মধ্যে৷ একদল যুবক বাড়ি ভাড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ৮ আগস্ট তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে৷ নিজের উপর হামলা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন নিলয়৷ কিন্তু পুলিশ তাঁকে সহায়তা করেনি৷ ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে, তবে তার সত্যতা যাচাই করা যায়নি৷

জগিংয়ের সময় গুলিতে খুন বিদেশি

গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে জগিং করার সময় ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় খুন হন ইটালীয় এনজিও কর্মী সিজার তাবেলা৷ তাঁকে পেছন থেকে পরপর তিনবার গুলি করে দুর্বৃত্তরা৷ জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করেছে জিহাদিদের অনলাইন কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখা একটি সংস্থা৷ তবে বাংলাদেশে সরকার এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে ‘এক বড় ভাইয়ের’ তাঁকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা৷

রংপুরে নিহত এক জাপানি

গত ৩ অক্টোবর রংপুরে খুন হন জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও৷ মুখোশধারী খুনিরা তাঁকে গুলি করার পর মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়৷ ইসলামিক স্টেট এই হত্যাকাণ্ডেরও দায় স্বীকার করেছে, তবে সরকার তা অস্বীকার করেছে৷ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন না যে তাঁর দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীটির উপস্থিতি রয়েছে৷

হোসনি দালানে বিস্ফোরণ, নিহত ১

গত ২৪ অক্টোবর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হোসনি দালানে শিয়া মুসলমানদের আশুরার প্রস্তুতির সময় বিস্ফোরণে এক কিশোর নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হন৷ বাংলাদেশে এর আগে কখনো শিয়াদের উপর এরকম হামলায় হয়নি৷ এই হামলারও দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট, তবে সরকার সে দাবি নাকোচ করে দিয়ে হামলাকারীরা সম্ভবত নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠী জেএমবি-র সদস্য৷ সন্দেহভাজনদের একজন ইতোমধ্যে ক্রসফায়ারে মারা গেছে৷

ঢাকায় প্রকাশক খুন

গত ৩১ অক্টোবর ঢাকায় দু’টি স্থানে কাছাকাছি সময়ে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়৷ এতে খুন হন এক ‘সেক্যুলার’ প্রকাশক এবং গুরুতর আহত হন আরেক প্রকাশক ও দুই ব্লগার৷ নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের সঙ্গে ঢাকায় খুন হওয়া ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল৷ জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আনসার-আল-ইসলাম’ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷

প্রার্থনারত শিয়াদের গুলি, নিহত ১

গত ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশের বগুড়ায় অবস্থিত একটি শিয়া মসজিদের ভেতরে ঢুকে প্রার্থনারতদের উপর গুলি চালায় কমপক্ষে পাঁচ দুর্বৃত্ত৷ এতে মসজিদের মুয়াজ্জিন নিহত হন এবং অপর তিন ব্যক্তি আহত হন৷ তথকথিত ইসলামিক স্টেট-এর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা দাবি করা স্থানীয় একটি গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷