১০ লাখ আফগান অভিবাসী শিশুর শিক্ষার জন্য কি ব্যবস্থা নিচ্ছে ইরান?

ইরানে শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ৷ কিন্তু সেদেশে থাকা ১০ লাখ আফগান অভিবাসী শিশুর শিক্ষার জন্য কি ব্যবস্থা নিচ্ছে ইরান? ডয়চে ভেলে এ বিষয়ে কথা বলেছেন ইরানের শিশু অধিকার কর্মী এবং বিশ্লেষকদের সঙ্গে৷

২০১৫ সালে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই ইরানের শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আদেশ দেন যাতে তারা আফগান শিশুদের দেশটির সরকারি স্কুলগুলোতে ভর্তির সুযোগ করে দেয়৷ বৈধভাবে এবং অবৈধভাবে আসা, অর্থাৎ সব আফগান শিশুরই পড়ার সুযোগ করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি৷ আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ইরানে ৯৫ ভাগেরও বেশি অভিবাসী আফগানিস্তান থেকে আসা এবং তাদের মোট সংখ্যা অন্তত ১৫ লাখ৷ খামেনেইয়ের এই নির্দেশের পরও সরকারি স্কুলগুলো অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের স্কুলে নিবন্ধন করতে রাজি হয়নি৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

কাত করা ব্ল্যাকবোর্ড

সবুজ রঙের ব্ল্যাকবোর্ডটি টেবিলের ওপর কাত করে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে খাড়া করা আছে৷ এক শিক্ষার্থী টেবিলের ওপর চড়ে চক দিয়ে তাতে কি যেন লিখছে৷ শিক্ষার্থীর অভাব নেই৷ ইরানের জনগণের গড় বয়স ৩০, তাদের এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৮-র নীচে৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

‘যত বেশি শিশু, ততই মঙ্গল’

তবুও ইরান সরকার আরো বেশি সন্তান চায়৷ ‘পনেরো কোটি নাগরিকের দেশ হবে ইরান’ অথবা ‘যত বেশি শিশু, ততই মঙ্গল’, এ ধরনের স্লোগান দিয়ে সরকার দম্পতিদের আরো বেশি সন্তানের জন্ম দিতে উদ্বুদ্ধ করতে চাইছেন৷ কিন্তু এখনই সারা দেশে ৫২,০০০ শিশুর স্কুলে স্থান অকুলান৷ শিক্ষাক্ষেত্রে জিডিপির তিন শতাংশের বেশি ব্যয় করে না ইরান৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

ছেলে-মেয়ের আলাদা শ্রেণিকক্ষ

ইরানে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা আলাদা শ্রেণিকক্ষে পড়ানো হয়৷ রাজধানী তেহরানে স্কুলঘর বা ক্লাসের চেয়ারটেবিলের অবস্থা স্বভাবতই মফস্বলের চেয়ে অনেক ভালো৷ শিক্ষকরাও রাজধানীর স্কুলে চাকরি পেতে চান৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

নীল আকাশের নীচে

শিক্ষার্থীরা রোজ তাদের ব্ল্যাকবোর্ড আর অঙ্কের হোমওয়ার্ক বাড়িতে নিয়ে যায়৷ পরের দিন আবার ঘাড়ে করে ব্ল্যাকবোর্ড আনতে হয় এই জঙ্গলে, শিক্ষকও যেখানে আসেন৷ স্কুলঘর তৈরির টাকার অর্ধেক আসে সরকারি বাজেট থেকে, বাকি অর্ধেক বিভিন্ন নিধি থেকে৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

গরুর গোয়াল...

গরুর গোয়াল বলে পড়ুয়াদের অপমান করা হচ্ছে না৷ স্কুলবাড়িটা আসলে একটা মুরগির খাঁচা৷ কচিকাঁচাদের পড়াশুনার জন্য এর চাইতে ভালো কিছু জোটেনি এই প্রত্যন্ত প্রদেশে৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

বরফে কিছু আসে যায় না

বরফ পড়লে স্কুলে যাওয়াটাই একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ বহু ছাত্রছাত্রীর পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে আর ফিরতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়৷ তারপর আবার অনেককে ক্ষেতে বা বাড়ির কাজে হাত লাগাতে হয়৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

শিক্ষকই ফেরি

আলোকচিত্রী মোহাম্মদ গোলচিন তাঁর ছবিতে এসব অসমসাহসী ছাত্র আর শিক্ষকদের কাহিনী শুনিয়েছেন৷ দরকার হলে শিক্ষক নিজে গিয়ে ছাত্রদের ঝর্না পার করে দিয়ে আসেন৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

মরুভূমি পার হয়ে...

মরুভূমি পার হয়ে স্কুলের পথে৷ দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের যে অংশটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তের কাছে, সেই হতদরিদ্র সিস্তান ও বেলুচিস্তানে শুধু যে নতুন স্কুল নেই, তা-ই নয়, অন্তত ৬,০০০ ক্লাসঘর ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে৷ এছাড়া আরো ৮,০০০ শিক্ষকের প্রয়োজন পড়বে৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

শিক্ষা ও অন্ন দুইয়েরই অভাব

সিস্তান ও বেলুচিস্তানের বহু পরিবার এতই গরীব যে, তারা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠান না৷ ওদিকে এই অঞ্চলে একটানা খরা চলেছে৷ বিশ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

‘পড়িয়ে কী হবে? বিয়ে দাও!’

আইন অনুযায়ী ইরানে স্কুলের পড়া নিখর্চায়৷ তা সত্ত্বেও প্রায় সব স্কুলই ‘স্বেচ্ছাপ্রদত্ত’ ফি দাবি করে থাকে৷ ফি দিতে না পারলে শিক্ষার সেখানেই ইতি - বিশেষ করে মেয়েদের৷

ইরানেও গ্রাম আছে, আছে পাঠশালা

মেয়েরা এগিয়ে আসছে

অথচ ইরানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষায় কিন্তু মেয়েরাই বেশি ভালো ফল করে থাকে৷ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ শতাংশের চেয়ে বেশি৷ তবে বহু স্নাতকই শেষমেষ বিদেশে চলে যান৷

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানবিদ নাদের মুসাভি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘খামেনেইয়ের আদেশ কার্যকর হলে তিন চতুর্থাংশ আফগান শিশু স্কুলে পড়ার সুযোগ পেতো৷''  মুসাভি নিজেও একজন আফগান৷ তেহরানের আফগান শিশুদের স্কুলের ব্যবস্থাপনার কাজ করছেন গত ১৯ বছর ধরে৷ তিনি জানালেন, ঐ আদেশের পরপরই ২০০ থেকে ৩০০ আফগান শিক্ষার্থী ইরানের সরকারি স্কুলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল৷ এখন যেসব স্কুলে আফগান শিশুরা পড়ে, সেগুলো বেসরকারি এবং আফগানদের দ্বারা পরিচালিত৷ ইরানি কর্তৃপক্ষ এই স্কুলগুলোকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি৷ এসব স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা আফগান দূতাবাস থেকে সার্টিফিকেট পেয়ে থাকে৷

ইউনিসেফে কর্মরত শিশু অধিকার কর্মী আকরাম খাতাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ইরানে আফগান শরণার্থীদের এখনো সেভাবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই৷'' অনেক বিশ্লেষক অবশ্য তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন৷ তাঁরা বলছেন, ধীরে ধীরে আফগান শরণার্থী ও অভিবাসীদের প্রতি ইরানের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে৷ যেমন মুসাভি বললেন, ‘‘ইরানের তরুণ প্রজন্ম আফগান অভিবাসীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়৷ বর্তমানে অনেক ইরানিই আফগান অভিবাসীদের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে৷''

টুইটারে ‘মেহর হ্যাশট্যাগ' ব্যবহার করে ইরানের শিশু অধিকার কর্মীরা কয়েক সপ্তাহ আগে একটা প্রচারণা শুরু করেছেন, যাতে চলতি বছরে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সময় আফগান অভিবাসী শিশুদের স্কুলে পড়ার অনুমতি দেয়া হয়৷ এই সামাজিক আন্দোলনের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রী তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, কোনো আফগান শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না৷

অধিকারকর্মীরা এবং শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা ৫ বছর আগে একটা জরিপ চালিয়েছিলেন, যেখানে দেখা গেছে ইরানে ৪ থেকে ৫ লাখ শিশু স্কুলে যায় না এবং এদের প্রায় শতভাগ অভিবাসী৷ সম্প্রতি তারা একটি প্রতিবেদনে দেখেছেন, এই সংখ্যাটা বেড়ে ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে৷

মুসাভি আফগান অভিবাসী শিশুদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন, ‘‘একটি হলো যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, দ্বিতীয় দলের বৈধ কাগজপত্র আছে, কিন্তু তাদের অভিভাবকরা কাজের খোঁজে অন্য বড় শহরগুলোতে যাওয়ার চেষ্টায় আছে এবং তৃতীয়ত বয়সের কারণে যাদের স্কুলে যাওয়ার যোগ্যতা হয়নি৷''

অধিকার কর্মীরা এখনো তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে অভিবাসী শিশুদের জন্যও শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়৷


পড়ালেখার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয় ওরা

চীন এবং শিক্ষা

বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে, খেলাধুলায়, অর্থনীতিতে বলতে গেলে সবদিকেই দ্রুত উন্নতির পথ ধরে এগিয়ে চলেছে চীন৷ ইউনেস্কোর সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, চীনে শিক্ষার বর্তমান হার ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানে চীনের খ্যাতি অবশ্য প্রাচীন কাল থেকেই৷ তাই শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরানেও বলা হয়েছে, ‘‘শিক্ষার জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীনে যাও৷’’

পড়ালেখার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয় ওরা

অগ্রগতির বিপরীতে

চীনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই৷ তাই কমিউনিস্ট শাসিত দেশটির প্রসঙ্গে দ্রুত উন্নতির বিষয়টির পাশাপাশিই সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে৷

পড়ালেখার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয় ওরা

শিশুমুখগুলো চমকে দিলো...

হ্যাঁ, সেই চীনের গণমাধ্যমেই এসেছে ১৫টি শিশুর এমন এক কিছু ছবি যা দেখে শুধু চীন নয়, বলতে গেলে বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষই বিস্ময়ে হতবাক৷ ছবিতে দেখা যায়, ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সি ১৫টি শিশু খাড়া পাহাড়ের গায়ে মই বেয়ে বেয়ে ৮০০ মিটার ওপরের ছোট্ট এক গ্রামে ফিরছে৷ পশ্চিম চীনের সিচুয়ান প্রদেশের পাহাড়ের ওপরের সেই গ্রামটির নাম আতুলির৷

পড়ালেখার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয় ওরা

কৃষকদের ঠকাতে....

৭২টি পরিবার রয়েছে ওই গ্রামে৷ সবাই কৃষিজীবী৷ বাঁশের মই বেয়ে বেয়ে তো আর ফসল নিয়ে নামা সম্ভব নয়৷ আর লোহার মই বা ভালো রাস্তা করার আর্থিক সংগতিও গ্রামবাসীর নেই৷ ভালো রাস্তা হলে চাষিরা ফসল নিয়ে দূরের বাজারে গিয়ে ভালো দামে সেই ফসল বিক্রি করতে পারে ভেবে ফড়িয়ারাও এতদিন সেখানে রাস্তা তৈরি হতে দেয়নি৷

পড়ালেখার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয় ওরা

এবার হয়তো রাস্তা হবে

চীনের এক ইংরেজি দৈনিকে কয়েকদিন আগেই প্রকাশিত হয় আতুলির গ্রামের শিশুদের মই বেয়ে বেয়ে ৮০০ মিটার ওপরের বাড়ির দিকে যাত্রা করার দৃশ্য৷ গ্রামের আশেপাশে কোনো স্কুল নেই৷ তাই শিশুদের দূরের কোনো স্কুলে যেতে হয়৷ সেই স্কুলের হস্টেল থেোকে সপ্তাহে দু’দিন বাড়ি আসা যায়৷ সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথেই অসম সাহসী শিশুরা ক্যামেরাবন্দি হয়৷ তাদের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার রাস্তা নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে৷

শিরিন সাকিব/এপিবি

আমাদের অনুসরণ করুন