১৩ বছরের প্রাচীর জন্য লড়াই

আমাদের নানি-দাদিদের বিয়ের সময় বয়স ছিল ১৩ বছর৷ এই তো কিছুদিন আগেও ভারতে গৌরীদান প্রথা ছিল৷ কই কাউকে তো মরতে দেখিনি এত? তাহলে কেন এই যুগে এসে লোকে ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’ বলে হুংকার? বড্ড ঢং হয়েছে আমাদের!

ইউনিসেফে এই বাল্যবিবাহ ব্যাপারটিকে বলা হয়েছে ‘শিশু অধিকারের পরিপন্থী'৷ ১৮ বছরের নীচে সবাই শিশু৷ সবাই তাদের রঙিন শৈশব কাটাবে এই সময়ে৷ ভাবুন, ১৫ বছরের এক মা! মানে এক শিশুই আরেক শিশুর জন্ম দিচ্ছে!

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বাল্যবিবাহ কেন খারাপ তা নিয়ে ভূরি ভূরি রিসার্চ হয়েছে৷ একটা ১৪ বছরে সদ্য মাসিক হওয়া মেয়ের গর্ভধারণের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়৷

হ্যা! এখনই এত সমস্যা সমস্যা! কই আমাদের মা দাদীদের এত সমস্যা হয়নি তো?

হয়েছে! জরায়ুতে ক্যান্সার হতে পারে এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি হবার পর আমরা জেনেছি৷ কিংবা ক্যান্সার, এইডস তো খুব বেশি দিন আগের রোগ নয়৷ তার মানে আগে ক্যান্সার হতো না? নাকি প্যাপিলেমো ভাইরাসের কথা লোকে জানত না? অন্ধ থাকলেই প্রলয় বন্ধ হয় না৷

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা করে জানিয়েছে, ১৮-র নীচে মা হওয়াটা মেয়েদের জন্য ঝুঁকির৷ প্রসূতির সময় থেকে শুরু করে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য একটা ১৪ বছরের শরীর মোটেও প্রস্তুত না৷ তার উপর কমবয়সি মায়ের জন্ম দেওয়া বাচ্চা সাধারণত অপুষ্টিজনিত কারণে মারা যায় অথবা কমপ্লিকেশন নিয়ে জন্মায়৷ অথচ ভারতে ১৮-র নীচে মা হবার হার ৭৬ পার্সেন্ট৷ 

সমাজ

নাইজার (৭৬%)

ইউনিসেফ বলছে, আফ্রিকার এই দেশটিতেই বাল্যবিবাহের হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি৷ সেখানে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৫৷ তবে এটি পরিবর্তন করে ১৮ করার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার পেছনে দরিদ্রতা একটি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করে৷ এছাড়া বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লে সামাজিকভাবে যে হেনস্তার শিকার হতে হয়, তা এড়াতেও মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয় পরিবার৷

সমাজ

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (৬৮%)

দ্বিতীয় স্থানে থাকা এই দেশটিতে মেয়েদের বিয়ে করার বা দেয়ার বৈধ সর্বনিম্ন বয়স ১৮৷ তবে বাবা-মা ১৩ বছর বয়সি মেয়েরও বিয়ে দিতে পারেন, যদি আদালত অনুমতি দেয় কিংবা মেয়েটি যদি গর্ভবতী হয়৷ বাবা-মায়ের অনুমতি সাপেক্ষে তার চেয়েও কমবয়সি মেয়েদের বিয়ে দেয়া বৈধ সেখানে৷

সমাজ

চাড (৬৮%)

২০১৫ সালের জুনে চাডের সংসদে পাস হওয়া অর্ডিন্যান্সে, মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৫ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হয়েছে৷ এছাড়া বাল্যবিয়ের সঙ্গে জড়িতদের জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷

সমাজ

মালি (৫৫%)

মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৬ আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৮ বছর৷ তবে শরিয়া আইন অনুযায়ী ১৬ বছরের কমবয়সি মেয়েদেরও বিয়ে দেয়া যেতে পারে৷ কমবয়সি মেয়েদের সাধারণত দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করে থাকে বেশি বয়সি পুরুষরা৷

সমাজ

বাংলাদেশ (৫২%)

মেয়েদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়স ১৮, ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১৷ তবে সম্প্রতি পাস হওয়া একটি আইনে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট’ বিবেচনায় ১৮ বছরের কম বয়সিদেরও বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে৷

সমাজ

বুর্কিনা ফাসো (৫২%)

২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারী, যাদের বয়স ১৮ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে, তাদের সংখ্যা ধরে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইউনিসেফ৷ ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য এতে ব্যবহার করা হয়েছে৷ বুর্কিনা ফাসোতে ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের হার ১০ শতাংশ৷ আর ১৮ বছরের কমবয়সিদের ক্ষেত্রে হারটি ৫২ শতাংশ৷

সমাজ

গিনি (৫২%)

মা-বাবা’র অনুমতি নিয়ে বা না নিয়ে ১৮ বছরের ছেলে কিংবা মেয়ে সেখানে বিয়ে করতে পারেন৷ দেশটিতে যার যতজন অল্পবয়সি স্ত্রী আছে তার সামাজিক মর্যাদা তত বেশি বলে ধরে নেয়া হয়৷

সমাজ

দক্ষিণ সুদান (৫২%)

চরম দারিদ্র্য, যুদ্ধ, দেশের অস্থির পরিবেশ, শিক্ষিতের হার কম হওয়া, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগের অভাব - এসব নানা কারণে আফ্রিকার সবচেয়ে নবীন দেশটিতে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া হচ্ছে৷ অল্প বয়সি মেয়ে ও তাদের পরিবার মনে করে, বিয়ে দেয়ার মাধ্যমে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে৷

সমাজ

মোজাম্বিক (৪৮%)

মেয়েদের জন্য বিয়ের বৈধ সর্বনিম্ন বয়স ১৮৷ তবে পরিবারের সম্মতিতে ১৬ বছর বয়সিরাও বিয়ে করতে পারে বা তাদের বিয়ে দেয়া যায়৷

সমাজ

ভারত (৪৭%)

মেয়েদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়স ১৮, আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১৷ দেশটিতে ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের মধ্যে বিয়ের হার প্রায় ১৮ শতাংশ৷ ভারতের অনেক সমাজে মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে বোঝা মনে করা হয়৷ বিয়ে দেয়ার মাধ্যমে সেই বোঝা স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায় বলে মনে করে অনেক পরিবার৷

একটা শিশুকে বিয়ে দিলে কী রাতারাতি সে বড় হয়ে যায়! শরীর তার শিশুরই থাকে, মনেও লেগে থাকে শৈশব৷ সেই শিশু, যে কিনা তার সেকসুয়াল রাইটস নিয়ে জানার আগেই শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়৷ তাই বাল্যবিবাহ একটি লিগ্যাল ধর্ষণ ছাড়া কিচ্ছু নয়৷

সারা বিশ্বে ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ' নিয়ে কাজ চলছে, আর এই সময়েই বাংলাদেশ একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়ে নিল

রোমান যুগে ছেলে-মেয়ে দু'জনকেই বাচ্চা বয়সে বিয়ে দেওয়া হতো৷ যুগে যুগে পুরুষের আধিপত্য বেড়েছে৷ তাই ছেলেদের কমবয়সি বিয়ে হওয়াটা কমেছে৷ কারণ, সমাজ বুঝেছে, ছেলে যদি স্বাবলম্বী হবার আগে বিয়ে করে বাপ হয়, তাহলে পরিবারেরই ক্ষতি৷

কিন্তু যেহেতু এখনও মেয়েদের সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মনে করা হয়, তাই পিরিয়ড হবার পরে, মানে সন্তান জন্মদানের জন্য ডিম্বাণু গঠন করা শুরু করলেই, তার শরীর মহাউৎসাহে শুক্রাণু নেবার জন্য বলিদান করা হয়!

ভাবুন! ১০০রও বেশি দেশে এখনও বাল্যবিয়ে লিগ্যাল৷ ১৬ বছরের ছেলে মেয়ে অনুমতি নিয়ে বিয়ে করতে পারে অস্ট্রেলিয়াতে৷ ভার্জিনিয়াতে এখনো বাল্যবিবাহ হয়৷ তবে এসবে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আফ্রিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশ৷

বাল্যবিয়ে গ্লোবাল ইস্যু৷ প্ল্যান, ইউনেস্কোর মতো অর্গানাইজেশন এই বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য অনেকদিন ধরে কাজ করে আসছে৷ উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের পাশাপাশি জনসচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগে তারা এই ‘শৈশববিরোধী' কাজ বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে৷

সে কাজে সরকারেরও পাশে থাকা উচিত ছিল৷ সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের সরকার বলে দিল ‘বিশেষ বিধানে' বাল্যবিয়ে দেওয়া যাবে৷ বাপ-মা চাইলে বিয়ে দেওয়া যাবে৷ ধর্ষণ হলে বাচ্চা পেটে এলে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যাবে৷

কিন্তু কেন বাল্যবিয়ে এখনও লিগ্যাল থাকে ১০০টি দেশে? আইনে বৈধ না থাকার পরও বহু দেশে প্রতিদিন শতাধিক বাল্যবিবাহ ঘটে৷ উত্তরটা হচ্ছে– ধর্ম! কিংবা সোশাল কাস্টম৷ সেগুলো আবার ধর্ম থেকেই অনুপ্রাণিত৷

বিয়ে জিনিসটা যত না সামাজিক, তার চাইতে বেশি ধর্মীয়৷ কারণ, বিয়ের কনসেপ্টই এসেছে ধর্মগুরুকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করা থেকে৷ তাই বাল্যবিয়ের পেছনে ধর্মীয় অবদান সবচেয়ে বেশি৷

আপনি যত প্রকারের ধর্মই খুঁজে দেখুন, বাল্য বিয়ে ছাড়া একটিও ধর্ম নেই৷ ইহুদি আইনে ধার্য করা আছে বালিকার জন্য ১২ বছর এবং বালকের জন্য ১৩ বছর হচ্ছে উপযুক্ত বয়স৷ সীতাকে রাম বিয়ে করে যখন, সীতার বয়স তখন ১০ বছর৷ আয়েশাকে মুহাম্মদ বিয়ে করেন যখন আয়েশার বয়স তখন নয় বছর৷ মানে ধর্মে বাল্যবিবাহে একটা স্বাভাবিক কাস্টম হিসেবে তুলে ধরেছে৷

নওশিনের বিয়ে

নওশিন আক্তারের বয়স ১৫ বছর৷ বাবার বাড়ি বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে৷ বিয়ের দিনও সে ছুটে বেড়াচ্ছিল পড়শিদের বাড়ি বাড়ি৷ সেখান থেকেই ধরে এনে বিয়ের পিড়িতে বসানো হয় তাকে৷ তার বিয়ের, আইনি দৃষ্টিতে যা অবৈধ, কিছু ছবি থাকলো এই ছবিঘরে৷

বিয়ে বাড়িতে উৎসব

আগস্টের ২০ তারিখে বিয়ে হয় নওশিনের৷ নিজে বিয়ের অর্থ সে তেমন না বুঝলেও, পাড়াপড়শির এই বিয়ে নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না৷ বিয়ের দিন উৎসবের এই ছবি জানান দিচ্ছে একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরের বয়স নিয়ে তাঁদের কোনো ভাবনা নেই৷

নওশিনের গোসল

বিয়ের দিন প্রকাশ্যেই গোসল করানো হয় নওশিন আক্তারকে৷ বাল্যবিবাহের জন্য তাকে প্রস্তুত করার অংশ এই গোসল৷ অনেকের সঙ্গে এএফপি-র আলোকচিত্রিও দেখেছেন সেই আচার৷

বিউটি পার্লারে নওশিন

বিয়ের জন্য সাজাতে নওশিনকে নেয়া হয়েছে বিউটি পার্লারে৷ বাংলাদেশের আনাচেকানাচে এ রকম পার্লারের সংখ্যা অনেক৷ ছবিতে কাপড় পরার সময় অপর এক নারীকে দেখছে নওশিন৷

কনের মেকআপ

বিয়ের সাজে সাজানো হচ্ছে নওশিনকে৷ বাংলাদেশে কনেকে বেশ রংচংয়ে মেকআপে সাজানো হয়৷ অনেক সময় চেহারার রং ফর্সা করার চেষ্টা করা হয় জোর করে, যা অনেকসময় দেখতে কিছুটা দৃষ্টিকটু হলেও ঐতিহাসিকভাবে চলে আসছে৷

গহনা ছাড়া কি বিয়ে হয়?

কনে নওশিনকে গহনা পড়িয়ে দিচ্ছেন তার আত্মীয়রা৷ বাংলাদেশে বিয়েতে সোনার গহনা এক অপরিহার্য উপাদান৷ কনের পরিবারের আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক, সোনাদানা ছাড়া বিয়ে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে একরকম ভাবাই যায় না৷

জোর করে বিছানায় নেয়া হচ্ছে নওশিনকে

নওশিনকে তার এক আত্মীয় জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন একটি বিছানায়, যেখানে তার ছবি তোলা হবে৷ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে ২৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় তাদের বয়স ১৫ পার হওয়ার আগে৷

ভিডিও-র জন্য ‘পোজ’

ভিডিও-র জন্য পোজ দিচ্ছে নওশিন আক্তার৷ তার বিয়ের মুহূর্তগুলো এভাবেই ক্যামেরাবন্দি করেছেন ভাড়া করা আলোকচিত্রিরা৷

৩২ বছর বয়সি বর

নওশিনের বরের নাম মোহাম্মদ হাসামুর রহমান, বয়স ৩২ বছর৷ বিয়ের সন্ধ্যায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কনের সঙ্গে ছবির জন্য পোজ দিয়েছেন রহমান৷ এএফপি-র একজন বিদেশি আলোকচিত্রি সেই বিয়েতে উপস্থিত হতে পারলেও বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পারেনি গিয়ে বিয়েটি বন্ধ করতে৷

শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে নওশিন

বিয়ে শেষে শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে ১৫ বছর বয়সি নওশিন৷ পরিবারের সদস্যরা তাকে গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন৷ বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের এ সব ছবি গোটা বিশ্বের আলোড়ন তুলেছে৷


ধর্ম তো আর পরিবর্তন করা যাবে না, তাই বিজ্ঞান পরবর্তীতে যতই চিল্লাচিল্লি করুক, বাল্যবিয়ে খারাপ, ধর্ম তো আর তার জায়গা নড়াতে পারে না! নড়তে পারেনা ধর্মগুরুরাও৷ তাই বাল্য বিয়ে এখনও ধর্মীয় মতে অবৈধ নয়৷

ধর্ম এবং সমাজের আরেকটা দিক বাল্যবিয়েকে উৎসাহ দেয়৷ সেটা হচ্ছে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে ট্যাবু৷ একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তার যন্ত্রনা হচ্ছে– এটার চাইতে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মেয়ের যোনি অপবিত্র হচ্ছে৷ স্বামী ছাড়া অন্য কেউ যোনিতে স্পর্শ করলে যোনি অপবিত্র হয়ে যায়৷ তাই যাও, ধর্ষককে স্বামী বানিয়ে দাও৷

১৯২৯ সালের ভারতের সারদা অ্যাক্ট থেকে শুরু করে ২০০৬ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এক্টে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, বাল্য বিবাহ যদি বাবা-মা আত্মীয়স্বজন বা কোনো অর্গানাইজেশনও দেয়, তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে৷ অথচ বাংলাদেশ সরকার বাপ-মায়ের অনুমতিকে সাপোর্ট দিয়েছে৷

অনেক ধর্মান্ধ বাবা-মা যে মেয়ে বাচ্চা থাকতেই বিয়ে দেয়, মেয়ের শরীর নিরাপদে রাখার জন্য সেটা কি সরকারের অজানা ছিল? তাহলে এই অনুমতির প্রহসনের মানে কী?

এই আইনের পরপরই এক বাল্যবিয়ে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার৷ সেটা বলেই শেষ করছি৷ প্রাচী নামের এক ১৩ বছরের মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয় তার ৩৫ বছরের কাজিনের৷ বড়লোক কাজিন৷ জমিটমির জের ধরে প্রাচীকে বিয়ে করার জন্য উথাল-পাতাল হয়৷ প্রাচী ক্লাস সেভেনে উঠেছে, সদ্য মাসিক হয়েছে৷ ঘটনাটি রাজধানী ঢাকার, কোনো গাঁওগেরামের নয়৷

প্রাচীর বিয়েটা আমরা (আমরা মানে জোনাকি আপু, আমি, সুপ্রীতিদি এবং আরও অনেকে) আটকাতে চেয়েছি৷ কিন্তু আমরা যখন জেনেছি তার দুই সপ্তাহ আগেই প্রাচীকে আকদ করানো হয়ে গেছে, তখন লড়াই করার প্লাটফর্ম হারিয়ে ফেললাম অনেকটাই৷ তারপরেও প্রশাসন, পুলিশ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করে বউকে তুলে দেওয়াটা বন্ধ করতে চাইলাম৷ কিন্তু সবার প্রশ্ন– বিয়ে তো হয়েই গেছে আর প্রাচীর বাপ-মা তো রাজি ছিল?

যদিও পরে আমাদেরকে দুই পরিবার আইনি কাগজে অঙ্গিকারনামা দেয় যে, তারা খালি আংটি বদল করেছে৷ বিয়ে নাকি হবে মেয়ের বয়স ১৮ হওয়ার পর, কিন্তু সুত্র জানিয়েছে, বর লিখন মৃধা মেহেদী হাতে বিয়ে করে ফেলেছে৷ কলেমার বিয়ে৷ এ বিয়েতে এক সঙ্গে থাকা বৈধ হয়ে যায়৷ আমরা আইনিভাবে বিয়ে আটকালেও, ধর্মীয় বিয়ে আটকানোর সাধ্য কার!
প্রাচী কি বিয়ের আগে গর্ভবতী হয়েছিল? আদালত থেকে ‘বিশেষ বিধান‘-এর অনুমতি নিয়েছিল? কিচ্ছু না৷ শুধু বাপ-মা চেয়েছে বলেই প্রাচীর বিয়েটা হয়েছে৷ এলাকা, স্কুল, বন্ধু কেউ জোট বেঁধে এগিয়ে আসেনি৷

Marzia Prova Bangladesch

মারজিয়া প্রভা, অ্যাক্টিভিস্ট

ব্যাপার হচ্ছে, বাল্যবিয়ে যখন ১৮ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তখনো ১৩ বছরের মেয়ের বিয়ে হতোই! সেটা সরকার না দমন করে, আরও শক্তপোক্ত করে দিল এই বিশেষ বিধান দিয়ে৷ তাই বাল্যবিয়ে এখন গরম গরম একটা ব্যাপার৷
নো প্রেম, নো প্রপোজ! কোনো মেয়েকে কোনো ছেলের পছন্দ হলেই ছেলে রেপ করবে৷ তারপর বাচ্চা আসবে৷ বাচ্চা এলে তো কথাই নেই! বিশেষ বিধানে ধর্ষক পেয়ে যাবে স্বামীর মর্যাদা৷

কি জানি উইম্যান এম্পাওয়ারমেন্ট নিয়ে  গত কয়েক দশক চিৎকার করে গেছে কত নারী সংস্থা! দেশের সর্বোচ্চ আসনে এখন নারীরা৷ প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার৷ কিন্তু তারা কেউ বুঝলন না একবারও, আইন করে ১৫ বছরের মা দেশ, সমাজ এবং জাতির জন্য বোঝা হয়ে যায়৷ আর নারী স্বাবলম্বী না হলে দেশ কখনোই এগোতে পারবে না৷
বাল্যবিবাহ একটা কন্যার শৈশবকে পিষে ফেলে৷ শৈশবেই তাকে পরিচিত হতে হয় দুর্বিষহ যৌনজীবনের সঙ্গে৷ অথচ সে জীবনে থাকার কথা ছিল শুধু ঘাসফড়িঙদের৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷