1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

করোনার সঙ্গে লড়াই এবং বসবাস

হারুন উর রশীদ স্বপন ঢাকা
২৫ ডিসেম্বর ২০২০

করোনায় নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে। সকালে শিশুরা স্কুলে যায় না। অনেকের হোম অফিসে হচ্ছে কাজ। আবার কারো কারো চাকরিই চলে গেছে৷

https://p.dw.com/p/3nDLY
বাংলাদেশে করোনায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে৷ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং রাজনীতিও এই নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে নয়।
বাংলাদেশে করোনায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে৷ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং রাজনীতিও এই নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে নয়।ছবি: Privat

সংকটের মধ্যেই আবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। নতুন ধরনের দক্ষতাও অর্জন করছেন অনেকে। কিন্তু তারপরও জীবন স্বাভাবিক নয়। ‘নিও নরমাল' বলে চালানোর চেষ্টা করা হলেও দ্বিতীয় ঢেউ আবার সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে করোনায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে৷ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং রাজনীতিও এই নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে নয়।

প্রথম দফা প্রণোদনার পর করোনার দ্বিতীয় দফা ঢেউয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন করে প্রণোদনা পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে যাদের আসলেই প্রণোদনা দরকার, সেই গরিব এবং নিম্নবিত্ত মানুষদের বড় একটি অংশ এখানো প্রণোদনার বাইরে আছেন। এমনকি তাদের অনেকে সরকারের খাদ্য সহায়তার আওতায়ও আসেননি। করোনায় যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের একটি অংশ আবার নতুন চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু যাদের বয়স বেশি বা যারা বেসরকারি চাকরির শেষ দিকে ছিলেন, তারা স্থায়ী বেকারত্ব বরণ করেছেন। তারা আর উঠে দাঁড়ানোর পথ পাচ্ছেন না।

বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘‘একদম যারা দারিদ্র্য সীমার নিচে আছেন, তারাও কোনো-না-কোনোভাবে সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু যারা ঠিক দারিদ্র্য সীমার কাছাকাছি ছিলেন, তারা পাননি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে নতুন করে দেড় কোটি মনুষ দরিদ্র হয়েছে। তার কিছুটা হয়তো উন্নতি হয়েছে, কিন্তু বাকিরা সংকটে আছেন।''

ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিত্তশালী শিল্প মালিকরা,  বিশেষ করে পোশাক এবং অন্যান্য শিল্প খাতে এই করোনায় সবচেয়ে বেশি প্রণোদনা পেয়েছেন। প্রণোদনা যেহেতু স্বল্প সুদে ঋণ, তাই ব্যাংকগুলো যাদের ঋণ পরিশোধে সক্ষম মনে করেছে, তাদেরই প্রণোদনার টাকা দিয়েছ। ফলে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত এসএমই সেক্টর পায়নি প্রণোদনার অর্থ। এ কারণে প্রণোদনার এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার তাদের অংশ তারা নিতে পারেনি।

করোনায় স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা প্রকাশ পেয়েছে। অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল, তবে করোনা প্রকাশ করে দিয়েছে আসলে কতটা খারাপ। তাছাড়া স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি এবং লুটপাটের বিষয়টিও আবার উঠে এসেছে।এর সাথে জড়িতদের একটি অংশকে আইনের আওতায় আনা হলেও নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

করোনার প্রথম ঢেউ-এর সময় হাসপাতালে আইসিইউ সংকট প্রকট হয়। তবে তার কোনো সামাধান হয়নি। এখন দ্বিতীয় ঢেউ-এর সময় আবারো সংকট দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, " আমাদের এখানে স্বাস্থ্য সেবা বলতে সাধারণ চিকিৎসা সেবাকে বোঝানো হয়। ফলে করোনায় ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দেয়। প্রাণ ও প্রকৃতি সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এটা আমরা এখনো বুঝতে চেষ্টা করছি না।''

ডা. লেনিন চৌধুরী মনে করেন, দুর্নীতি এখন রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থারই অংশ। স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়। করোনায় সেটা নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার আশঙ্কা- এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভ্যাকসিন নিয়েও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হতে পারে।

ড. খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন

আর মাস্ক ব্যবহারের অনীহার জন্য তিনি শুধুমাত্র নাগরিকদের দায়ী করতে নারাজ। তার মতে, "করোনাকে শুরু থেকে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।”

বাংলাদেশে গত মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ । উচ্চ মাধ্যমিকে অটো পাস দেয়া হয়েছে। অনলাইন ক্লাস হয়েছে, তবে তা দেরিতে শুরু হয়েছে। আর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখনো ক্লাস করতে পারছে না। শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ মনে করেন, "করোনাকালে শিক্ষা নিয়ে সঠিক সময়ে ভাবা হয়নি। যে কাজগুলো করা হয়েছে তা অনেক পরে করা হয়েছে। তাই নতুন বছরে শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।”

তিনি মনে করেন, করোনায় শিক্ষায় যেমন বৈষম্য বেড়েছে, তেমনি প্রযুক্তির মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষায় নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তার মতে, "যে কোনো উপায়ে শিক্ষার গুণগত মান এই করোনার মধ্যেও ধরে রাখতে হবে। নয়তো একট জেনরেশন পিছিয়ে পড়বে।”

করোনায় রাজধানী ছেড়ে অনেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের পেশার পরিবর্তন হয়েছে। কেউ ব্যবসা হারিয়েছেন। অনেকের আয় কমে গেছে। এসব সামাজিক সংকটের তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ায় বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে। আবার দিনের পর দিন বাড়িতে অবস্থান করায় মানসিক চাপ অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।  উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, "বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়ছে। বাড়ছে শূন্যতাবোধ। অসহয়াত্ব বাড়ছে। বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতা। বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে। আর শুরুতে অপরাধ কিছুটা কমলেও এখন আবার বাড়ছে।”