1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

জামিনে অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার পরোক্ষ ‘প্রভাব'

হারুন উর রশীদ স্বপন ঢাকা
১৩ আগস্ট ২০২১

মানবাধিকার কর্মীরা জামিনকে দেখেন অধিকার হিসেবে, কিন্তু আইনে জামিনযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ ভাগ করা আছে৷ প্রশ্ন হলো, বাস্তবে জামিনের ক্ষেত্রে আইন কি সব সময় নিজস্ব গতিতে চলে?

https://p.dw.com/p/3ywq8
সুনামগঞ্জের শাল্লার ঝুমন দাস গত পাঁচ মাসে জামিন না পেলেও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার অভিযোগে যারা আটক হয়েছিলেন তাদের সবাই জামিন পেয়েছেন৷
সুনামগঞ্জের শাল্লার ঝুমন দাস গত পাঁচ মাসে জামিন না পেলেও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার অভিযোগে যারা আটক হয়েছিলেন তাদের সবাই জামিন পেয়েছেন৷ছবি: Harun ur Rashid Swapan/DW

সিকদার গ্রুপের দুই ভাইয়ের কথাই ধরা যাক৷ রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হওয়ার পরও চার্টার্ড বিমানে করে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যান গত বছরের এপ্রিলে৷ সেখান থেকেই তারা হাইকোর্টের ভার্চুয়াল বেঞ্চে জামিনের আবেদন করলে আদালত তাদের জামিন না দিয়ে জরিমানা করেন এবং তাদের আইনজীবীকে ভর্ৎসনা করেন৷ 

কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই রন হক সিকদার জামিন পান৷ জামিন নিতে তাকে আদালতেও যেতে হয়নি৷ তার বাবা সিকদার গ্রুপের মালিক জয়নুল হক সিকদার মারা যাওয়ায় সেদিন সকালে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে আটক করা হয়৷ এরপর তাকে আদালতে হাজির না করে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন মঞ্জুর করা হয়৷ মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তার জামিনের বিরোধিতা করা হয়েছিল৷ হত্যাচেষ্টার এই মামলাটি জামিন অযোগ্য মামলা৷ 

অভিনেত্রী পরীমনির দায়ের করা ধর্ষণচেষ্টার মামলায়ও সহজেই জামিন পেয়েছেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদ৷ অন্যদিকে পরীমনি এখন অন্য মামলায় দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে আছেন৷ আবার সুনামগঞ্জের শাল্লার ঝুমন দাস গত পাঁচ মাসে জামিন না পেলেও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার অভিযোগে যারা আটক হয়েছিলেন তাদের সবাই জামিন পেয়েছেন৷ 

বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মুনিয়ার আত্মহত্যায় প্ররোচনার যে মামলাটি, সেটিও কিন্তু জামিন অযোগ্য৷ কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি৷ তিনি আদালতে আত্মসমর্পণও করেননি৷ জামিনের প্রসঙ্গ তো পরে৷ তবে এই মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য পুলিশ আদালতে আবেদন করেছে৷ 

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ

বাংলাদেশে এরকম অনেক উদাহরণ আছে যে একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও কেউ জামিন পান আবার কেউ পান না৷ কেউ বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাগারে আটক থাকেন আবার কেউ জামিনে ছাড়া পেয়ে বাদীকে উল্টো হয়ারানি করেন, হুমকি দেন৷ 

আইনজীবীদের সথে কথা বলে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে বলা আছে কোন মামলায় জামিন দেয়া যাবে আর কোন মামলায় দেয়া যাবে না৷ আবার অপরাধেরও দুটি ধরন আছে৷ ধর্তব্য এবং অধর্তব্য অপরাধ৷ সাধারণভাবে অধর্তব্য অপরাধ জামিনযোগ্য৷  এগুলো লঘু অপরাধ৷ তবে ধর্তব্য অপরাধ হলো ‘গুরু' বা বড় অপরাধ এবং সেগুলো জামিন-অযোগ্য৷ যেমন: হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ধর্ষণ, অস্ত্র, মাদক মামলা ইত্যাদি৷ আর নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য জামিনের বিশেষ বিবেচনা আছে৷

তবে মামলার এজাহার বা পারিপার্শ্বিক আরো অনেক বিবেচনায় জামিন অযোগ্য মামলায়ও আসামিরা জামিন পেয়ে যান৷ আদালত যদি স্বীয় বিবেচনায় মনে করেন জামিন দিলে মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে না, তাহলে জামিন দিতে পারেন৷ আবার জামিনের শর্ত ভঙ্গ করলে তা বাতিলও করতে পারেন৷ আর নিম্ন আদালত জামিন না দিলে উচ্চ আদালতে যাওয়া যায়, ‘যথার্থ' কারণ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টেও জামিন চাওয়া যায়৷ 

এসব হলো আইনের কথা৷ কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কী? সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘‘এখানে আইন আসলে অন্ধ নয়, আইনের চোখ আছে৷ সে কারণেই প্রভাবশালীরা জামিন পায়৷ চোখ আছে বলেই এত বড় ঘটনার পরও সিকদার গ্রুপের লোকজন পলাতক অবস্থায় এয়ারপোর্টে নামার পরই জামিন পেয়ে যায়৷”

নূর খান

মামলার দুর্বলতা, পুলিশর ইচ্ছা- এসবের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে বলে তিনি মনে করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘যাকে আটকাতে চায় তার বিরুদ্ধে আদালতের রিমান্ড ফরোয়ার্ডিং-এ বিশাল বিশাল অপরাধের আশঙ্কার কথা লিখে দেয়, আর যাকে ছাড়তে চায় তার ব্যাপারে তেমন কিছু লেখে না৷ এমনকি অনেক সময় জামিনের বিরোধিতাও করে না৷ অতীতে জামিনের বিরোধিতা না করার কারণেও অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন পেয়েছে৷ আবার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী হলে জামিন না দেয়ার জন্য সবাই একযোগে কাজ করেন৷”

অনেক সময় আইনজীবীর ওপরও জামিন নির্ভর করে৷ অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত না দিলেও উচ্চ আদালত জামিন দেয়৷ ‘বড় আইনজীবী' দাঁড়ালে জামিন পাওয়া যায়৷ এমন আইনজীবী পাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা একটা বড় বিষয়৷ আইনজীবী তুহিন হাওলাদার বলেন, ‘‘অভিজ্ঞ আইনজীবী আইনের বিষয়গুলো ভালো বোঝেন৷ তিনি জামিনের প্রেক্ষাপট ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন৷ এজাহারের কোন জায়গায় জামিনের সুযোগ আছে, তা ধরতে পারেন৷ স্বাভাবিক কারণেই তাদের ফি বেশি৷ আর একাধিক আদালতে গেলে তো খরচ বাড়বেই৷”

মানবাধিকার কর্মী নূর খান বিষয়টিকে দেখেন রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের দায়ের দিক থেকে৷ তিনি বলেন, ‘‘একই ধরনের অপরাধে আটক হয়ে একজন জামিন পান, আরেকজন পান না৷ শুধু তাই নয়, কেউ কেউ জামিন নেয়ারও প্রয়োজন মনে করেন না, মামলা থাকার পরও প্রকাশ্যে নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেন৷ সম্প্রতি আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় একজন প্রভাবশালীর ক্ষেত্রে আমরা এরকম হতে দেখেছি৷ আবার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকার পরও গ্রেপ্তার করে জেলে রাখা হয়৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অপপ্রচারও চালায়৷ এটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার অগণতান্ত্রিক মনোভাব ও বিচারবিভাগের দুর্বলতার কারণে হয়৷”

তিনি মনে করেন, ‘‘অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার কাছে আইন সঠিকভাবে কাজ করে না, গতি হারিয়ে ফেলে৷”