1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

নারী ও পুরুষ কাজ ভাগ করে নিলে আরও মধুর ঈদ

শাহনাজ মুন্নী
২৩ জুলাই ২০২১

ছোটবেলা থেকেই দেখছি ঈদের কিছুদিন আগে থেকেই মা খালাদের ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। ঘর বাড়ি ঝাড় পোছ করা, বিছানার চাদর, জানালার পর্দা, সোফার কভার সব ধুয়ে পরিস্কার করা, রান্নার জন্য মশলা পাতি পিষে রেডি করা- কাজের শেষ নেই।

https://p.dw.com/p/3xwVh
ছবি: Shahnaz Munni

ঈদের আগের দিন রাত জেগে চলে পরদিনের রান্নার প্রস্তুতি, পেঁয়াজ রসুন কাটা, জিরা আদা বাটা কিংবা নানা পদের পিঠা বানানো। আবার ঈদের দিন ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে বিভিন্ন রকমের সেমাই ফিরনি পায়েশ রান্নার পাশাপাশি হাত চালিয়ে পরিপাটি করে ঘর-দোর গুছানোও তাদের কাজ।

ঈদের নামাজের পরপরই পশু কোরবানি শেষে একদিকে চলে মাংস কাটাকাটি, ভাগাভাগি, সংরক্ষণ করার জন্য ফ্রিজে গুছিয়ে রাখা আবার অন্যদিকে চলে রান্না বান্না, পরিবারের সবাইকে খাওয়ানো-দাওয়ানো আর অতিথি আপ্যায়ন। এই রান্না খাওয়ার ডামাডোলের মাঝেই দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। এদিকে, গৃহিণীর হয়তো সময় মতো সেদিন গোসল করাই হলো না, পরা হলো না নতুন কাপড়টাও। ঘেমে নেয়ে পরিবারের সবার মুখে ঠিক সময়ে খাবার তুলে দেওয়া আর অতিথিদের যত্নআত্তি করতে করতেই তার ঈদ শেষ

ফলে এটা বলা খুব মিথ্যা হবে না যে পরিবারের ছোট বড় সকলের ঈদের আনন্দ উপভোগের নেপথ্যে যে মানুষটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি হচ্ছেন পরিবারের নারী সদস্যটি। একজন নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, শুধুমাত্র ঈদের দিনটি তার পুরুষ হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। তিনি লিখেছেন, কোরবানির ঈদ নারীদের মানসিক ও শারিরীক পরীক্ষার দিন। আসলেই তাই। যে কোন ঈদ বা উৎসব মানেই পরিবারের নারীদের উপর বাড়তি কাজের চাপ। বেশি রান্না। বেশি মেহমানদারি। বেশি পরিশ্রম। ফলে আয়েশ করে ঈদ উপভোগের ফুরসৎ কোনো কালেই নারীর ছিল না, এখনো নেই। বরং সবার আনন্দের খোরাক জুগিয়ে ঈদের দিন শেষে তার প্রাপ্তি সারাদিনের এক রাশ ক্লান্তি আর অবসাদ।

চিরাচরিতভাবে ধরেই নেয়া হয়, রান্না বান্না, বাড়ি ঘর পরিষ্কার করা, অতিথি আপ্যায়ন ইত্যাদি সবগুলো কাজই নারীর কাজ। উৎসব আনন্দে তাই নারীর ঘাড়েই অবধারিতভাবে চাপিয়ে দেয়া হয় এইসব দায়িত্ব। সমাজ নির্ধারিত এই শ্রম বিভাজনের চাপে পড়ে মা বোন ভাবিদের আলাদা করে ঈদ উদযাপনের আর কোনো সুযোগ থাকে না। যদিও এখন সময় বদলাচ্ছে। ঘরের বাইরেও নারীরা পুরুষের সমান্তরালে কাজ করছেন। কিন্তু উৎসব আয়োজনে নারীর কাধ থেকে ঘরের কাজের বোঝা কিন্তু একটুও কমেনি।

শাহনাজ মুন্নী, সাংবাদিক
শাহনাজ মুন্নী, সাংবাদিকছবি: privat

বরং এখনো মনে করা হয়, ঘর গৃহস্থালির কাজ মেয়েদের আর ঘরের বাইরের কাজ ছেলেদের। নারীর কাজ এবং পুরুষের কাজ বলে সমাজে কর্মবিভাজনের এই প্রবণতা আসলে নারীর প্রতি চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সত্যিকার অর্থে নারীর কাজ আর পুরুষের কাজ বলে আলাদা কিছু কি আছে? ঘরের কাজ কি এক অর্থে পুরুষেরও নয়? তিনিও তো ঘরেই থাকেন, তারও তো নিজের খাবার লাগে, তাহলে খাবার তৈরি করাটা কি তার কাজ নয়? খাওয়া শেষে নিজের থালা বাসনটা ধুতে হয়। তিনি কাপড়ও পরেন, তাহলে নিজের থালাটা ধোয়া বা কাপড়টা ধোয়া- সেটাও তো তারই কাজ। অথচ বাস্তবে আমরা দেখি পুরুষ তার এই কাজগুলিতে অভ্যাসগত ভাবে নারীর উপর নির্ভরশীল। যুগের পর যুগ এই নির্ভরশীলতাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ স্বাভাবিক বলেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে নারীরাও এই বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না, বরং মুখ বুজে সমাজ নির্ধারিত কাজের জোয়াল কাঁধে বয়ে নিয়ে যান। অনেকে বলেন, ঈদের দিনের রান্নাবান্না আর সংসারের কাজ কর্ম আগেকার দিনের মা খালারা আনন্দিত চিত্তেই করতেন। কিন্তু যদি তাদের সামনে বিকল্প থাকতো তাহলে কি তারা অন্য রকম কিছু ভাবতেন না?

এক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যদি তাদের পুরনো ধ্যান-ধারণা বদলান এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটান তবে পরিবারের নারী সদস্যটিও একটু স্বস্তির সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারেন। ঘরের সব কাজ একা তার কাঁধে না চাপিয়ে নারী পুরুষ যদি সংসারের কাজ ভাগভাগি করে নেন, একে অন্যকে গৃহ কর্মে সহযোগিতা করেন তবে সংসারটা তাদের দুজনেরই হয়ে ওঠে। এতে লজ্জ্বা বা অগৌরবের কিছু নেই বরং নারী পুরুষ একসাথে হাতে হাতে কাজ করলে আনন্দ বাড়ে বৈ কমে না।

ঘরের কাজের কথা তুললেই বেশির ভাগ পুরুষই অজুহাত দেন, ‘আমি এসব কাজ পারি না।' ‘কখনো করিনি, অভ্যাস নেই।' আসলে ছোটবেলা থেকেই পরিবারে ছেলেদের এভাবেই বড় করে তোলা হয়। মা-বোন-স্ত্রী সবসময় তার কাজগুলো করে দেয়। ফলে এসব কাজে আনাড়ি থাকাটাকেই তিনি গৌরবের বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের সদস্যদেরও ভূমিকা রয়েছে। মায়েরা ছোটবেলা থেকে মেয়েকে যে কাজ শেখান, ছেলেকেও সেই কাজটা শেখাতে হবে। ভাই বোনের কাজের মধ্যে বৈষম্য রাখা উচিত নয়। ‘কাজের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ নেই, সবাই সব কাজ করতে পারে'- এই ধারণাটি ছোটবেলা থেকেই সবার উপলব্ধিতে আনতে হবে। এজন্য শিক্ষার কারিক্যুলামেও পরিবর্তন আনা দরকার। মেয়েরা গার্হস্থ্যবিজ্ঞান পড়বে আর ছেলেরা কৃষিবিদ্যা- বহুদিন ধরে প্রচলিত এই ব্যবস্থাও বদলানো প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থায় এভাবে নারী পুরুষকে আলাদা করে দেয়া লৈঙ্গিক বৈষম্যকেই উৎসাহিত করে। এখন সময় এসেছে দুটি বিষয়কেই জেন্ডার নিরপেক্ষ করে ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্যই আবশ্যিক করা।

আবার ফিরে আসি ঈদ উদযাপনের প্রসঙ্গে। ঈদ আসে নারী পুরুষ সবার জন্যই। ফলে নারীদের উপর সকল কাজের দায় না চাপিয়ে যদি পরিবারের নারী পুরুষ সবাই মিলে কাজগুলি ভাগ করে নেয়া যায়, তাহলে ঈদ উদযাপন যে আরো আনন্দময়, আরো মধুর হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।