তাজমহলে রামলীলার আসর নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক

হিন্দুত্ববাদীদের দাপটের বুঝি আর শেষ নেই৷ উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি সরকার এবার বিশ্ববিখ্যাত তাজ মহোৎসব অনুষ্ঠান শুরু করতে চলেছেন রামলীলা দিয়ে৷ এই বিতর্ককে ঘিরে আবারো জমে উঠেছে ভারতের রাজনীতি৷

যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হবার পর গোটা রাজ্যকে মুড়ে দিয়েছেন গৈরিক রঙে৷ মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সচিবালয়, স্কুল-কলেজ থেকে পাবলিক শৌচালয় – সবখানেই রাতারাতি গেরুয়া রঙের হোলি খেলা৷ তবে সম্ভবত কোনো বিশেষ কারণে যমুনা তীরে সাড়ে তিনশ' বছর আগে মোঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত তাজমহলের মতো বিশ্ববিখ্যাত সমাধি সৌধকে গেরুয়া রঙে রাঙানো থেকে পিছিয়ে গেছেন তিনি৷ কিন্তু তাজমহলের গায়ে হিন্দুরষ্ট্রের কোনো ছাপ থাকবে না, তা কি হয়? শত হলেও রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার৷ তাই কৌশল পালটে তাজমহলের গায়ে লাগানো হচ্ছে রামের মহিমা৷

সেই উপলক্ষ্যে তাজ-মহোত্সবকে মুখরিত করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রাম-বন্দনা দিয়ে৷ তাজ-মহোৎসব শুরু হচ্ছে ১৮ই ফেব্রুয়ারি৷ চলবে ২৭শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত৷ উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের রাজ্যপাল রাম নায়েক এবং মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং৷ অনুষ্ঠানে থাকবে শ্রীরাম অবলম্বনে নৃত্যনাটিকা৷ পরিবেশন করবে শ্রীরাম ভারতী কলা কেন্দ্র৷

উল্লেখ্য, মাসখানেক আগে উত্তর প্রদেশের এক বিজেপি সাংসদ তাজমহলকে গুঁড়িয়ে দেবার হুমকি দিয়েছিলেন প্রকাশ্যে৷ মুসলিম স্থাপত্যকে এত বড় করে দেখানোর কী আছে? ভারতীয় সংস্কৃতির এটি নাকি এক কলঙ্ক দাগ৷ বানিয়েছিলেন বহিরাগত বিশ্বাসঘাতক শাসক৷ পাশাপাশি আদিত্যনাথ সরকার রাজ্যের পর্যটন পুস্তিকা থেকে আগ্রার ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য স্থান হিসেবে তাজমহলকে বাদ দিয়ে তুলে ধরেছেন অযোধ্যাকে, তাও আবার সাংস্কৃতিক তথা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

সম্ভ্রম জাগানো

মর্মরসৌধ তাজমহলের বিশাল রাজকীয় সৌন্দর্য প্রথম দর্শনেই যেন অবশ করে দেয়৷ শ্বাস রুদ্ধ করে দেয় এই স্থাপত্যের মহিমান্বিত উপস্থিতি৷ আর সে জন্যই তো এটি পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের অন্যতম৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

পশ্চিমা ফটক

তাজমহল চত্বরে ঢোকার দু’টি দরজা, পুবে আর পশ্চিমে৷ এটি পশ্চিমের ফটক৷ ব্যাপক নিরাপত্তার বিধি-নিষেধ পেরিয়ে ঢুকলে প্রথমে তাজ নয়, চোখে পড়ে বেলেপাথরে তৈরি এই বিরাট ফটকটাই৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

সাতসকালে

তাজমহল দর্শনে বছরভর বহু পর্যটক আসেন৷ ভিড় শুরু হয়ে যায় একেবারে সূর্যোদয়ের মুহূর্ত থেকেই৷ আর আনাগোনা চলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

বিদেশি টান

যেসব বিদেশি পর্যটক ভারতে আসেন, তাঁরা প্রত্যেকেই একবার না একবার তাজমহল দেখতে যান৷ অনেকে অভিভূত হন, অনেকে হতাশ৷ কিন্তু তাজের আকর্ষণ কেউই এড়াতে পারেন না৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

যুগলবন্দী

আর সবথেকে বেশি হুড়োহুড়ি তাজের সামনে এই শ্বেতপাথরের বেঞ্চিতে বসে ছবি তোলার৷ প্রেমের সমাধিতীরে এই বেঞ্চের নাম যে ‘লাভ সিট’!

তাজমহল, আজও অপরূপ

ছবির মতো

তাজমহলের ছবি সবাই তোলেন৷ এর মধ্যে ফোয়ারার জলে প্রতিবিম্বিত তাজের এই ছবিটি অবশ্যই নিয়ে যান সাথে করে৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

লালের ছোঁয়া

মূলত শ্বেতপাথরেরই প্রাধান্য৷ কিন্তু মূল গম্বুজ ঘিরে আছে বেলেপাথরের লালের ছোঁয়া৷ এই বৈপরিত্ব যেন তাজের শুভ্রতাকেই আরও বাড়িয়ে দেয়৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

নজরদারি

নাশকতার আশঙ্কা আছে, তাই তাজমহলের চত্বরে সর্বত্র মোতায়েন নিরাপত্তারক্ষী৷ তাঁরা সতর্ক নজর রাখেন ভিড়ের ওপর৷ থাকে আচমকা হামলা ঠেকানোর সব ব্যবস্থাও৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

ঈগল চোখে

তাজমহলের চার কোণে চার সুউচ্চ মিনার আর তার ভেতরে ঈগলপাখির বাসা৷ এরাও যেন সজাগ বাদশাহ শাহজাহানের সাধের স্থাপত্যের সুরক্ষায়৷

তাজমহল, আজও অপরূপ

আম আদমির তাজ

বিত্তবান বিদেশি পর্যটক থেকে দেশের সাধারণ মানুষ – সবাই আসেন ঘুরে দেখতে৷ তাজমহল যে সবার জন্যে অবারিতদ্বার৷

এই নিয়ে রাজনীতির জল ঘোলা হয়েছে৷ জন অসন্তোষের চাপে গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সস্ত্রীক তাজমহল দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন যোগী আদিত্যনাথ৷ রাজ্যের সমাজবাদী পার্টি তাজমহলকে নিয়ে এহেন রাজনীতি করার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, আগ্রার তাজমহল বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য৷ ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে তাজমহলকে দিয়েছে হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা৷ তাই ভারতের গৌরব নিয়ে রাজনীতি করার কোনো অর্থ হয় না৷

এর পালটা জবাব দিতে বিজেপি সামনে এনেছে রাজ্যের মন্ত্রী সংখ্যালঘু নেতা মহসিন রাজাকে৷ তিনি মনে করেন, রাম সকলের আদর্শ৷ এই নিয়ে কোনো বিরোধ নেই৷ বিরোধীরা যদি পাকিস্তানে রাম-বন্দনা করাতে পারে, তাহলে সেখানেও আমরা যেতে রাজি৷ আগ্রার ছ'জন আইনজীবী আদালতে এক জনস্বার্থ মামলায় দাবি করেছেন যে, তাজমহলের জায়গাটা আসলে ছিল হিন্দু দেবতা শিবের মন্দির৷ এর স্বপক্ষে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ নাকি তাঁদের হাতে রয়েছে৷ কাজেই আদালতের উচিত হবে এটাকে হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করা৷ কেন্দ্রীয় সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী মহেশ শর্মা অবশ্য এই দাবি খারিজ করে বলেছেন, এর স্বপক্ষে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে নেই৷

এখন লাইভ
02:27 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 06.02.2018

‘মোদী বা বিজেপির কথা বাদ দিন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যা...

এই প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক বুদ্ধদেব ঘোষের অভিমত জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে উনি বলেন, ‘‘মোদী বা বিজেপিকে ছেড়ে দিন৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বীরভূমের সিউড়িতে পুরোহিতদের ডেকে ডেকে গীতা দেওয়া, তাজমহলের ভেতরে রামলীলা করা – এই দু'টোর মধ্যে কি কোনো তফাত আছে? গণতন্ত্রে যেসব ন্যূনতম কাজগুলো করার দরকার ছিল, সেই বোধটাই তো আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেনি৷ তা না হলে এই ধরনের নেতা-নেত্রীরা রাজনীতিতে উঠে আসে কী করে? বিশেষ করে তাঁরা, যাঁরা এ ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করেন?''

ক্ষোভের সঙ্গে ডয়চে ভেলেকে তিনি আরো বলেন, ‘‘দেশে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা গড়ে তুলতে পারলাম না৷ সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের শিকার হলাম৷ তাই খবরের কাগজে লিখে বা রেডিওতে বলে আর কিছু হবে না৷'' তাঁর কথায়, ‘‘ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ এই নয় যে অন্যায় কথাবার্তা বললেও মুখ বুজে সহ্য করতে হবে৷ সেটা ধর্মে থাকলেও এটা অন্যায়৷ যিশুখৃষ্ট বললেও অন্যায়, মহম্মদ বললেও অন্যায়, মুনিঋষিরা বললেও অন্যায়৷ নন-ইস্যুকে ইস্যু করে হৈ চৈ করা হচ্ছে৷ তাজমহলে রামলীলা করা কি রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে? অথচ দেখুন, দারিদ্র্য, বেকারি, অসাম্য রাজনৈতিক ইস্যুতে জায়গা পাচ্ছে না৷''


আমাদের অনুসরণ করুন