‘দেখবো না, শুনবো না, সাহায্যের হাত বাড়াবো না'

ইউরোপ এক সাধারণ শরণার্থী নীতির প্রয়োজনীয়তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছে৷ বারবারা ভিসেল মনে করেন, অন্য অনেক সংকটের মতো ব্রিটেন এক্ষেত্রেও তার দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চায়৷

ব্রিটেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে

ইংলিশ চ্যানেল মাত্র ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত৷ কিন্তু এই দ্বীপরাষ্ট্রের মানুষের বর্তমান মনোভাব দেখলে মনে হবে, দেশটি যেন ইউরোপীয় ভূখণ্ড থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে অবস্থিত৷ ব্রিটেনের অনেক মানুষের মনে তথাকথিত ‘কন্টিনেন্ট'-এর সঙ্গে বিশাল দূরত্ব দূর করা কার্যত অসম্ভব৷ তারা তাদের নিজেদের বিশেষত্ব জাহির করতে ফরাসি, জার্মান বা অন্যান্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে দূরত্বের কথা বার বার জোর দিয়ে বলে চলেছে৷ ঊনবিংশ শতাব্দীতে এক নেতার ক্ষেত্রে ‘গৌরবান্বিত বিচ্ছিন্নতা' বিশেষণটি সৃষ্টি হয়েছিল৷ সে সময়েও ইউরোপীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্রিটেনের আন্তরিকতার অভাবের অভিযোগ উঠেছিল৷ তারপর গ্রেট ব্রিটেন তার উপনিবেশ হারিয়েছে৷ এছাড়া ডেভিড ক্যামেরন-এর নীতির ক্ষেত্রে অন্য কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না৷

Barbara Wesel Kommentarbild App *PROVISORISCH*

বারবারা ভেসেল

শরণার্থীরা অনাকাঙ্ক্ষিত

বর্তমান শরণার্থী সংকটের ক্ষেত্রে এই মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়ে পড়ছে৷ লন্ডন থেকে কোনো গঠনমূলক অবদান আসছে না৷ ব্রিটিশরা এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন এটা তাদের মাথাব্যথা নয়৷ গত বছরে তারা জার্মানির তুলনায় মাত্র এক সপ্তমাংশ শরণার্থী গ্রহণ করেছে৷ ক্যামেরন-এর ঘোষিত নীতি অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও কমাতে হবে৷ সংহতির ভিত্তিতে ইউরোপের দেশগুলি শরণার্থীদের ভাগ করে নেবে – এমন প্রস্তাবে কান পাততেই রাজি নন তিনি৷ ইটালি ও গ্রিস সাহায্যের আবেদন করলেও কোনো সাড়া নেই৷ ইইউ কমিশন সাধারণ পদক্ষেপের প্রস্তাব দিলেও ব্রিটেন সাড়া দিচ্ছে না৷ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলে এবং তার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ‘মাস মাইগ্রেশন' বা বিশাল আকারে মানুষের স্থানান্তর ঘটলেও ব্রিটিশরা তাদের দুর্গের সেতু গুটিয়ে নিচ্ছে৷ এই সব গণ্ডগোল নিয়ে তারা মাথা ঘামাতে চায় না৷

কুর্দি এই মানুষটি সিরিয়ায় ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন৷ ম্যাসিডোনিয়ার এক রেল স্টেশনে তাঁর সঙ্গে কথা হয় ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদকের৷ তাঁকে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘আচ্ছা, জার্মানিতে যাওয়ার পর কি ইংরেজিতে কাজ করা যাবে?’’

বর্তমানে বেলগ্রেডের একটি সেবাকেন্দ্রে আছেন দুই সন্তানের জনক মোহাম্মদ৷ পরিবারের সবাইকে নিয়ে তুরস্ক থেকে গ্রিস পৌঁছাতে পাচারকারীকে অর্থ দিয়েছিলেন তিনি৷ যে নৌকায় করে তাঁরা গ্রিস যাচ্ছিলেন সেটি ডুবে যায়৷ প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁদের উদ্ধার করে তুরস্কের কোস্টগার্ডের সদস্যরা৷

ব্রিটেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে

ইংলিশ চ্যানেল মাত্র ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত৷ কিন্তু এই দ্বীপরাষ্ট্রের মানুষের বর্তমান মনোভাব দেখলে মনে হবে, দেশটি যেন ইউরোপীয় ভূখণ্ড থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে অবস্থিত৷ ব্রিটেনের অনেক মানুষের মনে তথাকথিত ‘কন্টিনেন্ট'-এর সঙ্গে বিশাল দূরত্ব দূর করা কার্যত অসম্ভব৷ তারা তাদের নিজেদের বিশেষত্ব জাহির করতে ফরাসি, জার্মান বা অন্যান্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে দূরত্বের কথা বার বার জোর দিয়ে বলে চলেছে৷ ঊনবিংশ শতাব্দীতে এক নেতার ক্ষেত্রে ‘গৌরবান্বিত বিচ্ছিন্নতা' বিশেষণটি সৃষ্টি হয়েছিল৷ সে সময়েও ইউরোপীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্রিটেনের আন্তরিকতার অভাবের অভিযোগ উঠেছিল৷ তারপর গ্রেট ব্রিটেন তার উপনিবেশ হারিয়েছে৷ এছাড়া ডেভিড ক্যামেরন-এর নীতির ক্ষেত্রে অন্য কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না৷

Barbara Wesel Kommentarbild App *PROVISORISCH*

বারবারা ভেসেল

শরণার্থীরা অনাকাঙ্ক্ষিত

বর্তমান শরণার্থী সংকটের ক্ষেত্রে এই মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়ে পড়ছে৷ লন্ডন থেকে কোনো গঠনমূলক অবদান আসছে না৷ ব্রিটিশরা এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন এটা তাদের মাথাব্যথা নয়৷ গত বছরে তারা জার্মানির তুলনায় মাত্র এক সপ্তমাংশ শরণার্থী গ্রহণ করেছে৷ ক্যামেরন-এর ঘোষিত নীতি অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও কমাতে হবে৷ সংহতির ভিত্তিতে ইউরোপের দেশগুলি শরণার্থীদের ভাগ করে নেবে – এমন প্রস্তাবে কান পাততেই রাজি নন তিনি৷ ইটালি ও গ্রিস সাহায্যের আবেদন করলেও কোনো সাড়া নেই৷ ইইউ কমিশন সাধারণ পদক্ষেপের প্রস্তাব দিলেও ব্রিটেন সাড়া দিচ্ছে না৷ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলে এবং তার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ‘মাস মাইগ্রেশন' বা বিশাল আকারে মানুষের স্থানান্তর ঘটলেও ব্রিটিশরা তাদের দুর্গের সেতু গুটিয়ে নিচ্ছে৷ এই সব গণ্ডগোল নিয়ে তারা মাথা ঘামাতে চায় না৷

ইউরোপীয় ও পররাষ্ট্র নীতি থেকে বিদায়

গ্রিক সংকটের সময় লন্ডন থেকে অনেক বুলি শোনা যাচ্ছিল৷ তাদের বক্তব্য ছিল, সংকট কাটাতে জার্মানির টাকা দেওয়া উচিত৷ এছাড়া গত কয়েক বছরে গ্রিস, ইউরোপ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে ব্রিটেনের অবদান কার্যত শূন্য থেকেছে৷

মোহাম্মদ, সিরিয়া

কুর্দি এই মানুষটি সিরিয়ায় ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন৷ ম্যাসিডোনিয়ার এক রেল স্টেশনে তাঁর সঙ্গে কথা হয় ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদকের৷ তাঁকে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘আচ্ছা, জার্মানিতে যাওয়ার পর কি ইংরেজিতে কাজ করা যাবে?’’

জামান, মরক্কো

হাসিখুশি এই মানুষটি গ্রিসে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই চার বছর কাটিয়েছেন৷ কিন্তু এখন তিনি জার্মানি যেতে চান৷ কারণ গ্রিসের পুলিশ নাকি বর্ণবাদী৷ জার্মানিতে পৌঁছে তিনি সৎভাবে জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখছেন৷

আহমেদ, ইরাক

বেলগ্রেডে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদককে ১৭ বছরের এই তরুণ জানান, ইরাকে ইসলামিক স্টেট অনেক বড় সমস্যা তৈরি করছে৷ যাকেই পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে তারা৷ তাই তিনি জার্মানি যেতে চান৷ কারণ সেখানে তিনি নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারবেন বলে আশা করছেন৷ বেলগ্রেড আসার পথে বুলগেরিয়ায় তিনি পুলিশের প্রহারের শিকার হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন৷

মোহাম্মদ, আফগানিস্তান

বর্তমানে বেলগ্রেডের একটি সেবাকেন্দ্রে আছেন দুই সন্তানের জনক মোহাম্মদ৷ পরিবারের সবাইকে নিয়ে তুরস্ক থেকে গ্রিস পৌঁছাতে পাচারকারীকে অর্থ দিয়েছিলেন তিনি৷ যে নৌকায় করে তাঁরা গ্রিস যাচ্ছিলেন সেটি ডুবে যায়৷ প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁদের উদ্ধার করে তুরস্কের কোস্টগার্ডের সদস্যরা৷

মিলাদ, সিরিয়া

২৭ বছরের এই তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের লক্ষ্য জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে পৌঁছানো৷ কারণ সেখানে তাঁর আত্মীয়স্বজন থাকেন৷ কথা বলার সময় তিনি সার্বিয়ার এক শহরে এক ‘পাকিস্তানির’ জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাকে তিনি সাড়ে চার হাজার ইউরো দিয়েছেন৷ এর মাধ্যমে মিলাদ তাঁর বাবা-মা সহ সার্বিয়া ও হাঙ্গেরির সীমান্ত পার হতে চান৷

ফালাত, আফগানিস্তান

২৫ বছরের এই যুবক তাঁর দেশ সম্পর্কে বলেন, ‘‘খারাপ অবস্থা, প্রতিদিন যুদ্ধ৷’’ মিলাদের মতো তিনিও সার্বিয়ার এক শহরে পাচারকারীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন যার মাধ্যমে তিনি জার্মানি পৌঁছাতে চান৷ এজন্য তিনি পাচারকারীকে ৫ হাজার ইউরো দিয়েছেন৷ হাঙ্গেরি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া প্রসঙ্গে তিবি বলেন, ‘‘সমস্যা নেই৷ যে করেই হোক আমরা জার্মানি পৌঁছাবোই৷ জার্মানি ভালো দেশ, যারা শরণার্থীদের গ্রহণ করছে৷’’

ইউক্রেন সংকট এবং পুটিন-এর ক্ষমতার লিপ্সা, বলকান অঞ্চলের পুনর্গঠনের প্রশ্ন, লিবিয়ার মুক্তি, ইরাকের টিকে থাকার প্রশ্ন, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ অথবা ইরানের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক – ডেভিড ক্যামেরন কোনো ক্ষেত্রেই কোনো নিশ্চয়তা দিতে নারাজ৷ যেখানে তিনি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন দেখেন না, সেই বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতেও প্রস্তুত নন তিনি৷ তাঁর সরকার সবকিছু সংকীর্ণ স্বার্থের গণ্ডির মধ্যে দেখে৷ ব্রিটিশ অর্থনীতির লাভ না হলে কোনো বিষয় নিয়েই মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই৷ মানবাধিকার, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ – এই সব শব্দগুলি বোধহয় ব্রিটিশ নীতি থেকে ঝেড়ে ফেলা হয়েছে৷

সংস্কার যখন গুটিয়ে ফেলার নামান্তর

প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এবার ইউরোপের জন্য তাঁর প্রস্তাবিত সংস্কার সম্পর্কে প্রচার অভিযানে বেরিয়ে পড়েছেন৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের থাকা বা না থাকা সংক্রান্ত গণভোটই তাঁর অ্যাজেন্ডার একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে৷ এই লক্ষ্যে তিনি ইইউ-কে পারলে আবার শুধু এক শুল্কহীন রাষ্ট্রজোট হিসেবে সঙ্কুচিত করতে চান – বাকি সব প্রশ্নে যে কোনো দেশ যা খুশি করতে পারে৷ ইউরোপেও এমন জাতীয়তাবাদী শক্তির অভাব নেই, যারা এমন প্রস্তাব শুনলে করতালি দেবে৷ তবে এ ক্ষেত্রেও আমরা ব্রিটেনের দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিতে পারি৷ লন্ডন থেকে এমন সব দাবির উত্তর স্পষ্ট ‘না' হওয়া উচিত৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পিছু হটানোর এই পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সম্মতি নেই৷