পশু থাকলেই চাই পশুচিকিৎসক, যেমন মালাউয়িতে

মালাউয়িতে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা কমপক্ষে ২৫ লাখ, কিন্তু পশুচিকিৎসকের সংখ্যা সাকুল্যে ৩০৷ ওদিকে বনজঙ্গল ক্রমেই কমে আসছে, ফলে বনের পশুদের রোগ ঘরের পশুদের মধ্যে ছড়াচ্ছে৷ কাজেই চাই আরো বেশি পশুচিকিৎসক৷

ডাক্তার আসা মানেই রোগীর হৃৎকম্প, কিন্তু পালানোর পথ নেই৷ অন্তত বেচারা ছাগলটির পালানোর পথ তো একেবারেই নেই! বোনিফাৎস চিকুফেনজি আর তার সতীর্থরা ওর ভালোই করতে চান৷ এরা সবাই হবু পশুচিকিৎসক৷ মালাউয়ির রাজধানী লিলংভের লুয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র৷ এরা সবাই আপাতত একটি দশদিনব্যাপী ‘ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে' অংশ নিচ্ছেন৷

মালাউয়িতে পশু চিকিৎসক বিশেষভাবে প্রয়োজন, কেননা গোটা দেশে পশুচিকিৎসক মাত্র ৩০জন, অথচ গৃহপালিত পশুর সংখ্যা ২৫ লাখ৷ দেশ জুড়ে পশুরোগ, অথচ ডাক্তারের সাহায্য পাওয়ার উপায় নেই৷ এ কারণেই বিশ্ব পশু ত্রাণ সমিতি ডাব্লিউটিজি এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে৷ রবিন ম্যাককেন এই কর্মসূচির পরিচালিকা৷ দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসে তিনি মালাউয়িতে এই কর্মসূচি শুরু করেছেন৷ রবিন জানালেন, ‘‘যে পশুচিকিৎসকদের আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, তারাই হবে মালাউয়িতে আমাদের কর্মসূচির প্রথম স্নাতক৷ লুয়ানার এই কর্মসূচিটি মালাউয়ির একমাত্র কর্মসূচি আর এরা হবে এখান থেকে পাস করা প্রথম পশুচিকিৎসক৷ ‘প্যারাভেট'-রা আছেন বটে, কিন্তু তারা ঠিক পশুচিকিৎসক নন৷''

ভিডিও দেখুন 05:21
এখন লাইভ
05:21 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 20.06.2017

পশুচিকিৎসকদের কেন প্রয়োজন?

খামার থেকে বনে রোগ ছড়ায়

মালাউয়ির একটা বড় অংশ এখন ক্ষেতখামার৷ বনজঙ্গল ক্রমেই কমে আসছে৷ এর ফলে গৃহপালিত পশুরা বন্যপ্রাণীদের জন্য আরো বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷ রবিন শোনালেন, ‘‘মালাউয়ির গৃহপালিত পশুদের মধ্যে ইস্ট কোস্ট ফিভার আর ফুট-অ্যান্ড-মাউথ ডিজিজ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়৷ আর এগুলো ছড়ায় বুনো মোষ অথবা হরিণের মতো খুরওয়ালা পশুদের মধ্যে৷ এর একটা কারণ হলো, বুনো মোষের মতো বন্যপ্রাণী আর গৃহপালিত পশুরা একই এলাকায় চরে৷ কাজেই এই রোগগুলো এক দিক থেকে আরেক দিকে ছড়াতে পারে৷ এভাবে আমরা পোষা আর বুনো জন্তুজানোয়ার, দু'দিকেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি দেখেছি৷''

এ কারণে পশুচিকিৎসার ছাত্রদেরও বন্যজন্তুদের নিয়ে কাজ করা শিখতে হবে৷ তাই তারা একটি দিন কাটাবেন লিলংভের ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারে, যেখানে আহত বন্যপ্রাণীদের শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুলে, সম্ভব হলে আবার ছেড়ে দেওয়া হবে৷ আমান্ডা লি সাব হলেন ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের অধ্যক্ষা৷ তিনি নিজেও পশুচিকিৎসক৷ ছাত্ররা এখানে এলে তাঁর অবশ্যই কোনো আপত্তি নেই৷

আমান্ডা বললেন, ‘‘মালাউয়িতে পশুচিকিৎসক আছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়৷ বন্যপ্রাণীদের দেখাশোনার জন্য যে পরিমাণ পশুচিকিৎসক দরকার, সে পরিমাণ পশুচিকিৎসক নেই – বিশেষ করে এ ধরনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে৷ কেন্দ্রের পশুচিকিৎসক হিসেবে আমরা এখানে মালাউয়ির একজন ভেটারিনারি ডাক্তারকে চাই৷ যে কারণে আমরা এই ব্যাচটি সম্পর্কে এতো আশাবাদী৷ এছাড়া যে সব জীবজন্তু মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতের শিকার হয়েছে, অকুস্থলে গিয়ে তাদের সাহায্য করাটাও আমাদের কর্তব্য৷''

আর মাত্র ১০ বছর?

হাতি যে হারে কমছে, তাতে ১০ বছর পর চিড়িয়াখানা ছাড়া আর সব জায়গা থেকে এই প্রাণীটির চিহ্ন মুছে গেলে নাকি অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না৷ আশঙ্কাটা যে মোটেই বাড়াবাড়ি নয়, তা দুটো তথ্য দিলেই বুঝতে পারবেন৷ একশ’ বছর আগে আফ্রিকায় মোট এক কোটি হাতি ছিল৷ এখন সেখানে মাত্র সাড়ে চার থেকে সাত লাখের মতো হাতি টিকে আছে৷ এশিয়ায় আছে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ হাজার হাতি৷ গত দশ বছরে নাকি সারা বিশ্ব থেকে ৬২ ভাগ হাতি কমেছে!

দাঁতের জন্য মরছে হাতি

কথায় আছে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা৷ সত্যিই তাই৷ বিশেষ করে হাতির দাঁত তো হীরা-মুক্তা-জহরতের মতোই মূল্যবান৷ সেই দাঁতের লোভে আফ্রিকার জঙ্গল থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে একশ’টি হাতি মারা হয়৷ হাতির দাঁত সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় চীনে৷ গত জুলাই মাসে জুরিখ বিমানবন্দরে ২৬২ কিলোগ্রাম ওজনের হাতির দাঁতসহ ধরা পড়ে এক চীনা নাগরিক৷

জঙ্গিদের টাকার উৎসও হাতি!

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অবৈধ ব্যবসা এই হাতির দাঁতের কেনাবেচা৷ মাদক এবং মানবপাচারের পরই এর স্থান৷ অনেক যু্দ্ধ-দাঙ্গা-হাঙ্গামার পেছনেও ভূমিকার রাখে হাতির দাঁত৷ আফ্রিকা অঞ্চলের দুই ইসলামি জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম এবং আল-শাবাব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্র কেনে হাতির দাঁতের বিনিময়ে!

জঙ্গল কমছে, কমছে হাতি

জনসংখ্যা বাড়ছে৷ আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ পড়ছে জঙ্গলের ওপর৷ মানুষ জঙ্গল কেটে সেখানে গড়ছে বাসস্থান, কলকারখানা৷ ফলে জঙ্গলের প্রাণীরা পড়ছে বিপদে৷ হাতির জন্যও জঙ্গল ক্রমশই কমছে, বাড়ছে বিপদ৷ গত এক শতকে আফ্রিকার জনসংখ্যা চারগুণ বেড়েছে৷ হাতির সংখ্যা সেখানে এক কোটি থেকে কমে সাত লাখ বা তারও কম হওয়াই তো স্বাভাবিক, তাই না?

হাতিরক্ষায় তৎপর ওবামা

চীনের পর হাতির দাঁত সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় যুক্তরাষ্ট্রে৷ তবে ধীরে ধীরে হয়ত সেখানে অবৈধ এ ব্যবসাটা কমবে৷ গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যবসা একেবারে বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা৷

মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে দারিদ্র্য

কেননা মালাউয়ির বন্যপ্রকৃতি গভীর চাপের মুখে৷ জনসংখ্যা বাড়ছে অতি দ্রুত, দেশ জুড়ে ঘনবসতি৷ দারিদ্র্য সর্বত্র৷ প্রায়ই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়৷ পশুপাখিদের সুরক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পায় না, কারণ সেখানে তো মানুষেরই পেট চালানো দায়৷ মানুষ আর জীবজন্তুরা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে৷ শুধুমাত্র রাজধানী লিলংভেতেই ৪০ হাজার নেড়ি কুকুর পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷

লিলংভের এক শহরতলিতে ছাত্রদের আসল পরীক্ষা৷ মালাউয়ির একটি পশু ত্রাণ সংগঠন একটি টিকাদান অভিযান চালাচ্ছে, যা দেখতে গাঁয়ের বহু মানুষ ভিড় করেছে৷ হবু পশুচিকিৎসক বোনিফাৎস চিকুফেনজি-র জন্য এ এক বিশেষ মুহূর্ত৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা যে মানুষজনকে জলাতঙ্কের হাত থেকে রক্ষা করছে, তাতে আমি খুব খুশি৷ একটা কুকুর কামড়ালেই এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে৷ তাই এভাবে অনেকগুলো কুকুরকে টিকা দিয়ে আমরা এখানকার মানুষদের সাহায্য করছি৷''

প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই একটি অন্তত কুকুর আছে৷ তবে তাদের কোনো দেখাশোনা করা হয় না৷ আরো বেশি পশুচিকিৎসক হলে পরিস্থিতি হয়তো  বদলাবে৷ নতুন শিক্ষানবীশদের প্রশিক্ষণ শীঘ্রই শেষ হবে৷ তখন ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের দেশ মালাউয়িতে পশুচিকিৎসক আরো ১৫ জন বাড়বে৷   

ইয়ুর্গেন শ্নাইডার/এসি

সংশ্লিষ্ট বিষয়

22:43 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 20.06.2018

অন্বেষণ – পর্ব ২৬৭

22:46 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 03.07.2018

অন্বেষণ - পর্ব ২৬৯