পূর্ব জার্মানিতে শরণার্থীদের প্রতি নব্য-নাৎসিদের বিদ্বেষ

কয়েক দিন আগেই উত্তরাঞ্চলের এক রেস্তোঁরায় ঢুকতে গিয়ে বাঁধা পান নিকাব পরা এক নারী৷ বুধবার যেন সেই আগুনে ঘি ঢালল পূর্ব জার্মান উগ্রপন্থিরা৷ এবার জার্মান নারী-পুরুষ, শরণার্থী এবং পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হলো একটি শহরে৷

বাউটজেন শহরটি পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট শাসনামলের জনপ্রিয় শহর৷ সেখানকার মানুষ এক সময় সবার সমান অধিকারে বিশ্বাসী ছিল৷ অথচ সম্প্রতি সেখানেই আশ্রয়প্রার্থীদের উপর বিদ্বেষের ঘটনা ঘটছে৷ ২০ জন শরণার্থী যুবকের উপর বোতল ও ইট ছুড়ে গালিগালাজ করতে থাকে ৮০ জন জার্মান নারী পুরুষ৷ ঐ শহরের পুলিশ প্রধান উভে ক্লিজ জানান, হামলাকারীদের বেশিরভাগই ছিল মাতাল৷

২০১৫ সালে জার্মানিতে অন্তত ১০ লাখ শরণার্থী বা অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করে৷ ডানপন্থিরা শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে৷ এই অংশটি এখনো শরণার্থীদের প্রতি বিরূপ৷

সংবাদ সংস্থা এএফপির মতে, জার্মানিতে শরণার্থীবিদ্বেষ ক্রমেই বাড়ছে৷ বিদ্বেষ ছড়ানোয় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় কট্টরপন্থি দল এএফডি৷ মূলত তাদের সমর্থকরাই নানাভাবে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা এবং মুসলিমদের বিষয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে৷

বাউটজেনের ঘটনার পর অনেক জার্মান টুইটারে দাবি করেছেন, শরণার্থীরাই আগে সংঘর্ষের সূত্রপাত করেছিল৷ জার্মানরা কেবল তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে৷

উত্তরাঞ্চলে এক রেস্তোঁরায় এক নারী নিকাব পরে সেখানে ঢোকার পর রেস্তোঁরা মালিক তাকে মুখ থেকে পর্দা সরানোর কথা বললে ঐ নারী প্রত্যাখ্যান করেন, তখন তাকে রেস্তোঁরা থেকে বের করে দেয়া হয়৷ ক্রিস্টিয়ান সুল্জ নামে রেস্তোঁরার মালিক এএফপিকে জানিয়েছেন, তিনি বর্ণবাদী নন, তবে রেস্তোঁরার অনেক অতিথির অস্বস্তি হওয়ায় তিনি ঐ নারীকে মুখ দেখাতে বলেছিলেন৷ তিনি এও জানান, তার রেস্তোঁরার বেশিরভাগ কর্মী তুরস্ক, ঘানা, পাকিস্তান এবং মিশরের৷

পুলিশ জানিয়েছে, বাউটজেনে জার্মান ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দলটি পুলিশকে লক্ষ্য করেও বোতল ছুড়েছে৷ ফলে পুলিশ ‘পিপার স্প্রে' ছুড়তে বাধ্য হয়৷ এরপর পুলিশ সংঘর্ষ থামাতে সমর্থ হলেও ঐ জার্মান উগ্রপন্থিরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আশ্রয় প্রার্থীদের উস্কাতে থাকে৷ শরণার্থীরা একটি ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেয়৷ পরে ঐ ভবনসহ অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রও পুরো রাত নিরাপত্তা দেয় পুলিশ৷ সংঘর্ষে ১৮ বছর বয়সি এক শরণার্থী আহত হয়েছেন৷ তিনি মরক্কো থেকে এসেছেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

‘বিশ্বাসঘাতক’ ম্যার্কেল

জার্মানির ইসলাম ও অভিবাসী বিরোধী গোষ্ঠী পেগিডার হাজার হাজার সমর্থক সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের শরণার্থী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে৷ শরণার্থীদের প্রতি নরম মনোভাবের কারণ তারা ম্যার্কেলের বিরুদ্ধে ‘উচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘জার্মানির মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ আনেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীদের নিয়ে কটূক্তি

পেগিডার (প্যাট্রিয়টিক ইউরোপিয়ান অ্যাগেনস্ট দ্য ইসলামাইজেশন অফ দ্য অক্সিডেন্ট) প্রতিষ্ঠাতা লুটৎস বাখমান সম্প্রতি শরণার্থীদের ‘পশু’, ‘আবর্জনা’ ও ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ বলে আখ্যায়িত করেন৷ এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

সমাজে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়

সোমবার বিক্ষোভের সময় বাখমান বলেন, শরণার্থীর সংখ্যা দেড় কিংবা দুই মিলিয়নেই থেমে থাকবে না৷ এরপর আসবে তাদের স্ত্রী; আসবে এক, দুই কিংবা তিন সন্তান৷ ফলে এতগুলো লোকের জার্মান সমাজে অন্তর্ভুক্তির কাজ অসম্ভব হয়ে পড়বে৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

জার্মান সরকারের অস্বীকার

জার্মানির জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বিল্ড’ সরকারের গোপন ডকুমেন্টের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছর জার্মানিতে প্রায় দেড় মিলিয়ন শরণার্থী আসবে বলে মনে করছে সরকার৷ যদিও প্রকাশ্যে সরকার বলছে সংখ্যাটা এক মিলিয়ন হতে পারে৷ তবে জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র এ ধরনের কোনো গোপন ডকুমেন্টের কথা তিনি জানেন না বলে সাংবাদিকদের বলেছেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীর মৃত্যু

জার্মানির পূর্বাঞ্চলের এক শরণার্থীদের বাসস্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইরিত্রিয়া থেকে আসা ২৯ বছরের এক শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে৷ অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায়নি৷ এদিকে, জার্মান সরকারের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর শরণার্থী ও তাদের বাসস্থানের উপর হামলার সংখ্যা বেড়েছে৷ এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই এরকম ২০২টি ঘটনা ঘটেছে বলে সরকার জানিয়েছে, যেখানে গত বছর সংখ্যাটি ছিল ১৯৮৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

বিপদে ম্যার্কেল

শরণার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণের কারণে নিজ দল সহ অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদদের তোপের মুখে পড়েছেন ম্যার্কেল৷ তাঁরা জার্মানির শরণার্থী নীতি ও শরণার্থীদের আগমনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চ্যান্সেলরকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

তবে ঘটনার সূত্রপাত বুধবারের আগে৷ গরমের কারণে কয়েকদিন ধরেই কিছু শরণার্থী যুবক শহরের একটি জায়গায় নিয়মিত জড়ো হচ্ছিল৷ উগ্রপন্থিরা তখন থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে শুরু করে৷

সংঘর্ষের ঘটনার পর বাউটজেন কর্তৃপক্ষ পুরো শহরে মাদক নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে৷ আর সন্ধ্যা ৭টার পর যে এলাকায় শরণার্থীরা আছে, সেখানে কারফিউ জারিরও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের৷ সংঘর্ষের নিন্দা জানিয়ে শহরের মেয়র আশ্বাস দিয়েছেন, বাউটজেনকে তিনি উগ্রপন্থিদের ঘাঁটিতে পরিণত হতে দেবেন না৷

শরণার্থী ইস্যুতে এরই মধ্যে চাপের মুখে পড়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ বৃহস্পতিবার তিনি শরণার্থীদের অবিলম্বে বিভিন্ন কাজে লাগানোর আহ্বান জানান৷ বাউটজেনে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়৷ গত ফেব্রুয়ারিতে একটি শরণার্থী কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল উগ্রপন্থিরা৷

এপিবি/এসিবি (এপি, এএফপি, রয়টার্স)

জার্মানিতে এভাবে শরণার্থীবিদ্বেষ কেন বেড়ে চলেছে? আপনার মতামত জানান নীচের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন