প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে তুরস্কে ১,১১২ জন গ্রেপ্তার

মঙ্গলবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারাসহ মোট ৭৬টি প্রদেশে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে ১,১১২জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ সরকারপক্ষে জানানো হয়, অভিযুক্তরা যুক্তরাষ্ট্র-নিবাসী ইসলামী প্রচারক ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারী৷

২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি রেচেপ তাইয়্যিপ এর্দোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে  তুরস্কে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়৷ তখন সরকার টলাতে না পারলেও সংঘর্ষে মারা যান আড়াইশ' মানুষ৷ ক্ষয়ক্ষতিও হয় বিপুল৷

রাষ্ট্রপতি এর্দোয়ান অভিযোগের আঙুল তোলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভ্যানিয়া নিবাসী ইসলামী প্রচারক ফেতুল্লাহ গুলেনের দিকে৷ উল্লেখ্য, এর্দোয়ানবিরোধী হিসেবে পরিচিত গুলেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন৷

পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস

২০১০ সালে তুরস্ক পুলিশের একটি পরীক্ষা আয়োজিত হয়৷ যে পুলিশ অফিসাররা ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে নিযুক্ত হতে চান, তাদের জন্য ছিল এই পরীক্ষা৷ কিন্তু সেই সময় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়৷ ফলে বাতিল করতে হয় পরীক্ষাটি৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

এর্দোয়ানের উত্থান

তুরস্কে এবং বিদেশে রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান সম্পর্কে নানা ধরনের মতামত রয়েছে৷ তাঁকে নব্য-অটোমান ‘সুলতান’ হিসেবে যেমন বিবেচনা করা হয়, তেমনি কারো কারো চোখে তিনি একজন স্বৈরাচারী নেতা৷ রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই ইসলামপন্থিদের বিভিন্ন দাবিদাওয়ার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন তিনি৷ পাশাপাশি ন্যাটোতে তাঁর নেতৃত্বে বড় ধরনের অবদান রাখছে তুরস্ক৷ এর্দোয়ানের উত্থান নিয়ে এই ছবিঘর৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

ইস্তানবুলের কারাবন্দি মেয়র

তুরস্কে ইসলামপন্থিদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত দল ওয়েলফেয়ার পার্টিতে নিজের অবস্থান দ্রুতই পাকাপোক্ত করেছিলেন এর্দোয়ান৷ ১৯৯৪ সালে তিনি সেই দল থেকে ইস্তানবুলের মেয়রও নির্বাচিত হন৷ কিন্তু এর্দোয়ান মেয়র হওয়ার চার বছরের মাথায় সেই দলটিকে সে দেশের সরকার তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করে৷ এরপর জনসমক্ষে বিতর্কিত কবিতা আবৃত্তির দায়ে জেলে যান এর্দোয়ান৷ চার মাস জেল খাটেন৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

নতুন দল, নতুন সম্ভাবনা

তুরস্কের একেপি পার্টির সহপ্রতিষ্ঠাতা এর্দোয়ান৷ ২০০২ সালের নির্বাচনে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে৷ আর ২০০৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন৷ দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরগুলোতে এর্দোয়ান দেশবাসীকে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান, অর্থনীতির উন্নয়ন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংস্কারের দিকে মনোযোগী হন৷ তবে কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাজনীতিতে ধর্মের মিশ্রণ ঘটানোয় ভূমিকা রেখেছেন৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

ইসলামপন্থিদের স্বার্থ রক্ষা

যদিও তুরস্কের সংবিধান দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে সমর্থন করে, তারপরও এর্দোয়ান কট্টর ইসলামপন্থিদের মন জয়ের নানা চেষ্টা করেছেন৷ তুরস্কের এই শীর্ষনেতা একসময় বলেছিলেন যে, তাঁর লক্ষ্যগুলোর একটি হচ্ছে এক ‘ধার্মিক প্রজন্ম’ গড়ে তোলা৷ এর্দোয়ানের সমর্থকরা এই লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, কেননা, তাঁরা মনে করেন, ধর্মচর্চা করা মুসলমানরা তুরস্কে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছিল৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

ক্যু থেকে রক্ষা

২০১৬ সালের জুলাইয়ে এর্দোয়ানের বিরুদ্ধে সে দেশের সেনাবাহিনীর এক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়৷ তবে সেই ঘটনায় দু’শ’র বেশি বেসামরিক নাগরিক এবং সেনা সদস্য নিহত হন৷ সেই ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর এর্দোয়ান আরো ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার পাশাপাশি সেনাবাহিনীতে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করেন৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

দেশজুড়ে অভিযান

ব্যর্থ সেই সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে অভিযান পরিচালনা করে তুর্কি কর্তৃপক্ষ৷ এতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা, স্কুল এবং গণমাধ্যম থেকে পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ এর্দোয়ান সেই সেনা অভ্যুত্থানের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা এবং তাঁর প্রাক্তন সঙ্গী ফেতুল্লাহ গুলেনের হাত রয়েছে বলে দাবি করেন৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনীতিবিদ

যদিও নিজের দেশে এবং বিদেশে বসবাসরত তুর্কিদের একটি বড় অংশের সমর্থন রয়েছে এর্দোয়ানের প্রতি, তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর কঠোর নীতি এবং কুর্দিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোয় কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন৷ চলতি বছরের জানুয়ারিতে আফরিনে মারাত্মক আক্রমণ পরিচালনা করেন এর্দোয়ান, যার সমালোচনা করে মানবাধিকা সংস্থাগুলো৷

তুরস্কের রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান কে?

এক নতুন যুগ?

২০১৪ সাল থেকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, কিছুদিন আগে নির্বাচনে জয়ী হয়ে এর্দোয়ান তাঁর অবস্থান আবারো মজবুত করেছেন৷ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে তুরস্কে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে৷ তবে সেটা ভালো না মন্দ তা সময়ই বলে দেবে৷

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মতে, প্রশ্নফাঁসের পেছনে গুলেনের ভূমিকা ছিল৷ ফলে, গুলেনপন্থি পুলিশ কর্মকর্তারা পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র পেয়ে যান৷

সিএনএন তুরস্ক জানায়, দীর্ঘ নয় বছর পর অবশেষে গত মঙ্গলবার এক অভিযানে ১,১১২জন সন্দেহভাজন গুলেনপন্থি পরীক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ৷

উল্লেখ্য, অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ২ লক্ষ ১৮ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ এর মধ্যে ৭৭ হাজার জন এখনো কারাবন্দি হয়ে বিচারের অপেক্ষায়৷

এসএস/এসিবি (রয়টার্স/এএফপি)

আমাদের অনুসরণ করুন