বিলুপ্ত হবে ‘‌‌তিন তালাক’?‌‌ আশায় বুক বাঁধছেন মুসলিম নারীরা

মুসলিমদের ‘‌তিন তালাক’ প্রথার বৈধতা যাচাই করতে ঐতিহাসিক শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে৷ মুসলিম, হিন্দু, ‌শিখ‌, খ্রিষ্টান‌ ও পার্সি‌ ধর্মাবলম্বী বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত সাংবিধানিক বেঞ্চ এ বিষয়ে পক্ষ-‌বিপক্ষের যুক্তি শুনছে৷

‘‌তালাক, তালাক, তালাক৷’ একটি শব্দের তিনবার মৌখিক উচ্চারণ৷ ব্যাস, সম্পর্ক শেষ!‌ স্বামী তাঁর মর্জি মাফিক স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ‘‌‌তালাক'‌ বললেই মুহূর্তেই ছিন্ন হয়ে যায় বৈবাহিক সম্পর্ক৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বিবাহ থাকলে বিবাহবিচ্ছেদও থাকবে৷ সেটাই স্বাভাবিক৷ তাই বলে, এক তরফা কেন?‌ স্বামী-‌স্ত্রী দু’জনের সহমতের ভিত্তিতে যদি বিবাহ হয়, তবে একই ভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হবে না কেন?‌ তাছাড়া বিচ্ছেদের পর বিবাহবিচ্ছিন্না স্ত্রী এবং তাঁর সন্তান-‌সন্ততির আর্থিক ও সামাজিক দায়-‌দায়িত্ব (‌ভরণ-‌পোষণ)‌ কেন নেবে না স্বামী? তাছাড়া শরিয়তি এই আইনের আরো একটা কুৎসিত দিক রয়েছে৷ তালাকের পর যদি স্বামী আবার ফিরিয়ে নিতে চান তাঁর স্ত্রীকে, তাহলে সেই স্ত্রীকে আগে কিছুদিন ‘‌পর পুরুষের সঙ্গে রাত কাটিয়ে’ আসতে হবে৷ এইসব আইন, নিয়ম ও প্রথার পেছনে কি শুধুই লুকিয়ে রয়েছে ধর্মীয় কারণ? নাকি, তার আড়ালে নিজেদের সুবিধামতো চুপিসাড়ে নারীদের অসহায় করে রাখার এক মরণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক মুসলিম সমাজ?‌

ইসলাম

১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, কাজীর মাধ্যমে তালাক দিতে হবে এবং তালাকের নোটিশ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনকে পাঠাতে হবে৷ মুখে তালাক দিলে সেটি কার্যকর হবে না৷

স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সমান নয়

স্বামী কোনো কারণ ছাড়া স্ত্রীকে তালাক দিতে পারলেও, স্ত্রী সেটা করতে পারেন না৷ এর জন্য আইনে কতগুলো কারণ উল্লেখ আছে৷ শুধুমাত্র সেসব কারণেই স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারেন৷

কয়েকটি কারণ

স্বামী চার বছর ধরে নিরুদ্দেশ থাকলে, দুই বছর স্ত্রীর ভরণপোষণ না দিলে বা ব্যর্থ হলে, একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে, সাত বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলে, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে, দুই বছর ধরে অপ্রকৃতিস্থ থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্থ বা মারাত্মক যৌনরোগে আক্রান্ত থাকলে৷ বাকি কারণগুলো জানতে উপরে (+) বাটনে চাপ দিন৷

হিল্লা বিয়ে নিষিদ্ধ

একটা সময় ছিল যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা আবার বিয়ে করতে চাইলে, স্ত্রীকে আগে হিল্লা বিয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হত৷ এক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ের ব্যক্তি (স্বামী) স্ত্রীকে তালাক দিলে বা মারা গেলে স্ত্রী পুনরায় প্রথম স্বামীকে বিয়ে করতে পারতেন৷ মধ্যবর্তীকালীন এই বিয়ের নামই হচ্ছে ‘হিল্লা’ বিয়ে৷ তবে বর্তমানে এটি নিষিদ্ধ৷

হিন্দু ধর্ম

সনাতন হিন্দু আইনে সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বিধান নেই৷ তবে ভারতে ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইনে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে আনা অভিযোগ প্রমাণ হলে বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব৷ এছাড়া ‘স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্ট’ অনুযায়ীও ডিভোর্স সম্ভব৷ তবে বাংলাদেশে এ সব আইন প্রযোজ্য নয়৷ স্ত্রী যদি একান্তই স্বামীর সঙ্গে থাকতে না চান তাহলে তিনি অন্য কোথাও আলাদা থাকতে পারেন৷ এক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী৷

খ্রিষ্টান ধর্ম

বাংলাদেশে এক্ষেত্রে ১৮৬৯ সালের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডিভোর্স অ্যাক্ট’ মানা হয়৷ তবে ক্যাথলিকরা এই আইনের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন না, কারণ ক্যাথলিকরা বিবাহবিচ্ছেদ মানেন না৷ তবে প্রোটেস্ট্যান্টরা এই আইনের আওচায় বিবাহবিচ্ছেদ করে থাকেন৷ এই আইনে অবশ্য বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে স্বামীর মতো সমতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে৷

‌যুগ যুগ ধরে এত শত প্রশ্নমালা নিজেদের অন্তরের অন্তর্স্থলে লুকিয়ে রেখেছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের নারীরা৷ এখন যা অনেকটাই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে৷ যাঁরা সাহস যোগাচ্ছেন, তাঁরা মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর থেকে ভুক্তভোগী কিছু মানুষ৷ প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ, রিফর্মিস্ট মুসলিম সোসাইটি, সেকুলার মিশন-‌সহ কয়েকটি সংগঠনের তরফে ‘‌যৌথ মঞ্চ’ তৈরি করে জোরদার আন্দোলন শুরু হয়েছে৷ এটা তাঁদের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের মতোই৷ প্রধান বিচারপতি জগদীশ সিং খেহর থেকে দেশের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি পর্যন্ত ছুটে গেছেন আন্দোলনকারী মুসলিম নারীরা৷

একাধিক প্রগতিশীল মুসলিম সংগঠনকে এক ছাতার তলায় এনে মুসলিম নারীদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছেন তনবীর৷ নিজে একজন মুসলিম নারী হয়েও মুসলিম সমাজের এই ‘‌কু-‌প্রথা’ থেকে সমাজকে বের করে আনতে চাইছেন তিনি৷ তবে এ জন্য তিনি কোনোভাবেই পবিত্র কোরান এবং ইসলাম ধর্মের বিরোধিতা করতে নারাজ৷

অডিও শুনুন 06:31
এখন লাইভ
06:31 মিনিট
বিষয় | 15.05.2017

তিন তালাকের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই: ‌তনবীর নাসরিন

তাঁর কথায়, ‘‌‘‌তিন তালাক একটি সামাজিক ব্যাধি৷ এর ফলেই নারী পাচারের মতো ঘটনা ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাগুলিতে৷ সেখানে ১২-১৪ বছরে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়৷ ১৭ না হতেই তালাক৷ তারপর অনেকেই ‘‌হিউম্যান ট্র্যাফিকিং’-‌এর শিকার হয়৷ এটা শুধুমাত্র মুসলমান সমাজের ওপরেই প্রভাব ফেলে না৷ গোটা সমাজ এবং দেশের সর্বনাশ হয়৷ বিশ্বের মুসলিম অধ্যুসিত ২২টি দেশে তালাক নিষিদ্ধ৷ তিন তালাকের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই৷ কোরানে কোথাও এই ভাবে মৌখিক তালাক দেওয়ার উল্লেখ নেই৷ তাছাড়া যাঁরা কোরান ও ইসলামের দোহাই দিয়ে তিন তালাক প্রথা অটুট রাখার দাবি তুলছেন, তাঁরা কোরানে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ নেন?‌ কোরানে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কেন মদ্যপান করেন?‌ ইসলামে হারাম হওয়া সত্ত্বেও কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজস্বী পোস্ট করেন?‌ আসলে সবটাই নিজেদের সুবিধা মতো গুছিয়ে নিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ৷ মুসলিমরাও তার বাইরে নয়৷ ফলে এখন আমরা আশাবাদী যে, সুপ্রিম কোর্ট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অন্যায় ‘‌তালাককে’ অবৈধ ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করবে৷ যদি তেমনটা হয়, সেটাই হবে ভারতে মুসলিম নারী জাগরণের প্রথম পদক্ষেপ৷ এরপর মুসলিম নারীদের সম্পত্তির অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, চাকরির অধিকার আদায় করতে হবে৷’’

তিন তালাক মামলার শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে৷ শেষতম শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য, ‘‌‘মুসলিম সমাজে ‌তিন তালাক প্রথা বিবাহ বিচ্ছেদের একটি ‘জঘন্যতম’ ও বে-‌আইনি ব্যবস্থা৷’’ এর আগে, তিন তালাকের বৈধতা খুঁজতে গিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত মূলত সংবিধানে ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ এবং মুসলিম ধর্মে মৌখিক ডিভোর্সের এই প্রথাটি আদৌ মুসলিম ধর্মের মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল৷ বাদ রাখা হয়েছে বহু বিবাহের মতো বিষয়টি৷ শুনানি শুরু হতেই প্রধান বিচারপতি জানিয়ে দেন, ‘‌‘‌মুসলিম ধর্মের মৌলিক অধিকারগুলির আওতার মধ্যে আদৌ ‘‌তিন তালাক’ বিষয়টি পড়ে কিনা, তার সমস্ত দিক বিবেচনা করে দেখা হবে৷ কিন্তু এই মামলার সঙ্গে ‘‌বহু বিবাহ’ বিষয়টির কোনো সম্পর্ক নেই৷’’ সাংবিধানিক বেঞ্চের এহেন মন্তব্য আসলে প্রবীন আইনজীবী, কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সলমন খুরশিদের একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে৷ তার আগেও বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, ‘‌‘মুসলিম সমাজের একটা অংশ মনে করে, বিবাহবিচ্ছেদের জন্য তিন তালাক প্রথা সম্পূর্ণ বৈধ৷ কিন্তু মুসলিমদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের এই প্রথাটি জঘন্যতম৷ এই প্রথা মেনে নেওয়া যায় না৷’’ 

অডিও শুনুন 03:25
এখন লাইভ
03:25 মিনিট
বিষয় | 15.05.2017

‌তালাক প্রথাটা অমানবিক, অসাংবিধানিক: শালিমা হালদার

যদিও সলমন খুরশিদ আদালতকে বলেন, ‘‌‘তালাকের ব্যাপারে বিচারবিভাগীয় অনুসন্ধানের কোনো প্রযোজন নেই৷ তাছাড়া মুসলিম মহিলারা ‘‌নিকাহনামা’-তে (‌বিবাহ চুক্তি) একটি শর্ত যোগ করে তিন তালাককে ‘‌না’ বলতেই পারেন৷’’ এরপর আদালত কক্ষে সলমন খুরশিদের সঙ্গে তুমুল বিতর্ক জড়িয়ে পড়েন আর এক প্রবীণ আইনজীবী রাম জেঠমালানি৷ এই সাংবিধানিক বেঞ্চের প্রত্যেক সদস্যই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের৷ এঁরা হলেন, প্রধান বিচারপতি জগদীশ সিং খেহর (‌শিখ)‌, বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ (‌খ্রিষ্টান)‌, বিচারপতি রোহিংটন ফালি নারিমান (‌পার্সি)‌, বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত (‌হিন্দু)‌ এবং বিচারপতি এস আবদুল নাজির (‌মুসলিম)‌৷

পূর্ব মেদিনীপুরের কুলবেড়িয়া ভীমদেব আদর্শ বিদ্যাপীঠের সহকারি শিক্ষিকা শালিমা হালদারও তিন তালাকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল৷ ওঁর মতে, ‘‌‘‌তালাক প্রথাটা অমানবিক, অসাংবিধানিক৷ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারী-‌পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার থাকা উচিত৷ তাহলে তালাক দেওয়ায় কেন পুরুষের একছত্র অধিকার থাকবে?‌ আমি চাই, এই প্রথা উঠে যাক৷ নয়ত নারীদেরও তালাক দেওয়ার অধিকার দেওয়া হোক৷’’ তালাক পরবর্তী সমস্যা নিয়েও চিন্তিত শালিমা৷ বললেন, ‘‌‘একবার তালাক দেওয়ার পর আবার যদি স্বামী-‌স্ত্রী পুরোনো সম্পর্কে ফিরে যেতে চায় তাহলে এক জঘন্য প্রথা মানতে বাদ্য করা হ্য় সেটা হল, স্ত্রীর সঙ্গে ‌অন্য কোনো পুরুষের নিকাহ দিতে হবে৷ এবং সেক্ষেত্রে সেই পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতেই হবে৷ তারপর সেই পুরুষ তালাক দিলে পুরোনো স্বামীর সঙ্গে নিকাহ হতে পারবে৷ আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে ইচ্ছেখুশি তালাক দেওয়া নিষিদ্ধ৷ ভারতের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ প্রথা কেন নিষিদ্ধ হবে না?‌’’

একটি প্রগতিশীল মুসলিম সংগঠনের হয়ে এই প্রথার বিরোধিতা করছেন আর এক প্রবীন আইনজীবী ইন্দিরা জয় সিং৷ আদালতে তাঁর সওয়াল, ‘‘‌‌বিবাহে যদি মহিলার সম্মতির প্রয়োজন হয়, তাহলে বিবাহবিচ্ছেদে একতরফা সিদ্ধান্ত হয় কি করে?’’ তাই এই প্রথাকে তিনি শুধু অসাংবিধানিক আখ্যা দেননি, পাশাপাশি ‘‌বিচার ব্যবস্থার আয়ত্তের বাইরের কোনো আইন’ বলে অভিহিত করেছেন৷ তিন তালাককে একজন মহিলার ‘‌সামাজিক মৃত্যু’ বলে বর্ণনা করেছেন ইন্দিরা৷ তাঁর কথায়, ‘‘‌দেশের ‌কোনো ব্যক্তিগত আইন সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করতে পারে না৷ তা সে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য ধর্মের আইনই হোক না কেন৷’’

অডিও শুনুন 04:59
এখন লাইভ
04:59 মিনিট
বিষয় | 15.05.2017

এক আত্মীয়ার তালাকের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নাজিনা

সমাজের বিভিন্ন স্তরের মুসলিম নারীদের তালাকের উৎপীড়ন সহ্য করতে দেখেছেন নাজিনা৷ তাঁর এক আত্মীয়ার তালাকের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন৷ শিউরে উঠতে হয় সেকথা শুনে৷ বলছিলেন, ‘‘‌পারিবারিক ঝগড়ার কারণে একদিন আচমকা স্বামী তালাক দিলেন৷ তারপর কয়েক বছর দুঃসহ যন্ত্রণায় দিন যাপন সেই স্ত্রীর৷ কিছুদিন পরে একদিন স্বামী-‌স্ত্রী ঠিক করলেন তাঁরা আবার একসঙ্গে ঘর বাঁধবেন৷ কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল সমাজ৷ মৌলবিরা নিদান দিলেন, নতুন করে ঘর বাঁধার আগে স্ত্রীকে আবার অন্য কারও সঙ্গে নিকাহ দিতে হবে৷ বাধ্য তা-‌ই করতে হলো৷ নিজের নন্দাইয়ের সঙ্গে প্রথা মাফিক নিকাহ হলো৷ সাড়ে তিনমাস তাঁরা একসঙ্গে রইলেন৷ তারপর ‘‌নিকাহ হালাল’-‌এর মাধ্যমে ‌পুরোনো স্বামী-‌স্ত্রী আবার ঘর বাঁধলেন৷’’

মামলা আদালতে উঠতেই সব পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি বলে দিয়েছেন, ‘‌‘‌তিনটি বিষয় বলার আছে৷ এক, ‘‌তিন তালাক’ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য বিষয় কিনা, যদি মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য হয়, তবে দেখতে হবে, সেখানে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি কিনা৷ দুই, এই প্রথা ওই ধর্মের সংস্কারমূলক প্রথা কিনা৷ এবং তিন, সংবিধানের কোনো প্রয়োগযোগ্য মৌলিক অধিকার এই প্রথার ফলে লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা৷’’


আদালতের অনুরোধে এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টকে সাহায্য করছেন সলমন খুরশিদ৷ প্রধান বিচারপতি খুরশিদের কাছে জানতে চেয়েছেন, ‘‌‘‌ভারতের বাইরে তিন তালাকের অস্তিত্ব আছে?’’ জবাবে খুরশিদ বলেন, ‘‌‘‌নেই৷ অনেক মুসলিম দেশেই তিন তালাক নিষিদ্ধ৷’’ এরপর  তাঁকে বিশ্বের সমস্ত মুসলিম এবং অ-‌মুসলিম দেশ গুলিতে তিন তালাক নিয়ে কী নিয়ম আছে, তার একটি তালিকা জমা দিতে বলেন প্রধান বিচারপতি৷ যদিও আগেই মামলাকারীদের পক্ষে আদালতকে জানানো হয়েছে, মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মরক্কো এবং সৌদি আরবের মতো দেশেও তিন তালাকের বৈধতা নেই৷ তিন তালাক প্রথার তীব্র নিন্দা করেন রাম জেঠমালানি৷ তিনি এক ভুক্তভোগী মুসলিম মহিলার হয়ে মামলা লড়ছেন৷ এদিন আদালতে তিনি বলেন, ‘‌‘‌তিন তালাকের অধিকার যেহেতু শুধুমাত্র মুসলিম পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, ফলে এই প্রথা দেশের সংবিধানের ১৪ নং ধারার পরিপন্থি৷ যেখানে নারী-‌পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা আছে৷’’ তিনি আরও বলেন, ‘‌‘তিন তালাকে লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট, যা পবিত্র কোরানের কোথাও উল্লেখ নেই৷ একজন বৈধ স্ত্রী শুধু তাঁর স্বামীর কথাতেই প্রাক্তন হয়ে যাবেন, এটা হতে পারে না৷ এখানে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে৷ তাই এই আইনের পক্ষে সওয়াল করাটাই অর্থহীন৷’’ প্রধান বিচারপতি খেহরের প্রশ্ন, ‌তিন তালাক কি শুধুমাত্র প্রতীকী আচরণবিধি, নাকি ধর্মের মৌল আচরণবিধির মধ্যেও পড়ে?‌ কোনো পাপ বা অন্যায় প্রথা কি শরিয়তের অংশ হতে পারে?‌ জবাব এখনও মেলেনি৷

তবে আপনারা কী বলেন? লিখুন নীচের ঘরে৷

ডিভোর্সের কারণ

সুখে, দুঃখে সারাজীবন একে-অপরের সঙ্গী থাকা – সেকথা ভেবেই তো বিয়ে! কিন্তু বিয়ের পর যতদিন যায়, বেরিয়ে আসে দু’জনের মধ্যকার নানা অমিল৷ এগুলোই এক সময় ডিভোর্সের কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’ বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাবুঝির অভাব, পরকীয়া প্রেম, অতৃপ্ত যৌনজীবন, নির্যাতন, অহংকার, সন্তান মানুষ করা নিয়ে মতভেদ, সংসারের কাজে অনীহা ইত্যাদি কারণে তালাক হয় জার্মানিতে৷

কমিউনিকেশন গ্যাপ

২০১৪ সালে জার্মানিতে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি ডিভোর্স হয়েছে৷ ডিভোর্সের কারণগুলোর মধ্যে প্রথমেই রাখা হয়েছে ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’, অর্থাৎ বিবাহের বন্ধনকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ করতে যতটা কথাবার্তা ও আবেগ অনুভূতি বা ভালোবাসার প্রকাশ বা আলোচনা দরকার, তা না হওয়াকে৷ এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়, দূরত্ব বাড়ে৷

পরকীয়া প্রেম

দাম্পত্যজীবনের প্রথম শর্তই হলো ‘বিশ্বাস’ আর সেটা যদি না থাকে তাহলে অবশ্যই তা তালাকের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ দাম্পত্যজীবনকে ছেলেখেলা ভেবে অনেকেই অন্য নারী বা পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায় কিংবা পুরনো প্রেমের সম্পর্ককে আবার জিইয়ে তোলে৷ এমনটা হলে স্বাভাবিকভাবেই অপরজনের পক্ষে তা মনে নেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে বিয়েটা ডিভোর্সে গিয়ে শেষ হয়৷

যৌনজীবন অতৃপ্ত হলে

শারীরিক ভালোবাসা বা যৌনসুখের দাম্পত্যজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ এই সুখের কমতি বা ভাটা পড়লে অনেকক্ষেত্রেই দেখা দেয় সমস্যা৷ আমাদের দেশে দম্পতিদের শোবার ঘরের এই সমস্যার কথা নিয়ে বাইরে আলোচনা করা না হলেও, জার্মানি বা পশ্চিমা বিশ্বে সরাসরি তা আলোচনায় আসে৷ অতৃপ্ত যৌনসুখের কারণে অনেক সংসারই ভেঙে যায় জার্মানিতে৷

কাজ ভাগাভাগি না করা

চাকরি বা নিজস্ব একটা পেশা এখানে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই রয়েছে৷ পাশাপাশি বাজার, রান্না, ঘরদোর পরিষ্কার, বাগান করা, আতিথেয়তা, সন্তানদের দেখাশোনা – সংসারের কাজ তো আর কম নয়! এ সব কাজ দু’জনে মিলেমিশে করলে যত সহজে করা সম্ভব, একজনের পক্ষে তা সম্ভব নয়৷ যদি এ সব কাজ শুধুমাত্র একজনকে করতে হয়, তাহলেই দেখা দেয় সমস্যা৷ অর্থাৎ এটাও বিবাহবিচ্ছেদের একটা কারণ৷

আমিই সব

অনেক স্বামী বা স্ত্রী নিজের মতামত বা ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর হবি, আনন্দ, সুখের জন্য যা যা দরকার সবই করেন৷ কিন্তু উল্টোদিকে তাঁর সঙ্গীর সখ বা ইচ্ছার কোনো মূল্যই দিতে চান না৷ ফলে অন্যজনের পক্ষে এই স্বার্থপরতা বা একগুঁয়েভাব বেশি দিন সহ্য করা সম্ভব হয় না৷ ফলাফল – ডিভোর্স! অর্থাৎ একে-অপরের প্রতি শ্রদ্ধবোধ না থাকলে সম্পর্ক বেশি দিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়!

তালাকের কারণ টাকা

সংসারে প্রয়োজনীয় টাকা অভাবে যেমন তালাক হয়, আবার প্রচুর টাকা থাকলেও বিবাহবিচ্ছেদ হতে পারে৷ দু’টি স্বতন্ত্র মানুষের আলাদা জগত থাকতে পারে, কিন্তু সেই জগত দু’টির একটা মেলবন্ধন জরুরি৷ অতিরিক্ত অর্থ অনেকসময় এটা হতে দেয় না৷ কারণ অতিরিক্ত টাকা-পয়সা কিভাবে সংসার, সন্তান বা অন্য কিছুতে খরচ করা হবে, তা নিয়েও শুরু হতে পারে ঝগড়া৷

‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’

বাড়িতে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতন করাকে ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ বলা হয়৷ মানসিক নির্যাতন সেভাবে প্রমাণ করা না গেলেও, শারীরিক নির্যাতন তার প্রমাণ রেখে যায়৷ এই নির্যাতনের স্বীকার হয় সাধারণত নারীরাই৷ এই যন্ত্রণা ও অত্যাচার বেশি দিন সহ্য করা সম্ভব হয় না৷ তাই এ থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ডিভোর্সের আবেদন করে থাকেন জার্মানিতে৷

বাংলাদেশে ডিভোর্সের কারণ

২০১৪ সালে শুধুমাত্র ঢাকার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনেই ডিভোর্সের সংখ্যা ছিল ৫,৪১৮টি৷ বাংলাদেশে ডিভোর্সের হার দ্রুতগতিতে বাড়ার অন্যান্য কারণের পাশাপাশি জি বাংলা, স্টার প্লাসের মতো টিভি চ্যানেল, অতি আধুনিকতা, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবকে দায়ী করছেন ডয়চে ভেলের ফেসবুক বন্ধু মোহাম্মদ নূরসহ বেশ কয়েকজন৷

বিবাহবিচ্ছেদ রোধ করা কি সম্ভব?

সন্তান না হওয়া, বড় কোনো অসুখ, যৌন সমস্যা, অন্য দেশে থাকতে চাওয়ার মতো বিশেষ কারণ হলে হয়ত বিবাহবিচ্ছেদ রোধ করা সম্ভব নয়৷ তবে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ যদি, ভালোবাসা, আবেগ, ভুল বোঝাবুঝি, সন্তান মানুষ করা ইত্যাদি কারণ হয়, তাহলে দু’জন কিছুটা সচেতন ও আগ্রহী হলে বিবাহবিচ্ছেদ আটকানো যেতে পারে৷

সংসার টিকিয়ে রাখতে ভালোবাসার যত্ন

একে-অপরকে নিয়ে খানিকটা ভাবুন, কাজের স্বীকৃতি দিন, সমালোচনা না করে মাঝে-মধ্যে একে-অপরের প্রশংসা করুন, কাজ ভাগাভাগি করে নিন৷ সবচেয়ে বড় কথা দু’জনে মিলে সব কিছু প্ল্যান করুন, আলোচনা করুন আর সে আলোচনায় মাঝে মাঝে সন্তানদেরও সাথে নিন৷ ভালোবাসা গাছের মতো৷ যত্নে ভালোবাসায় তা ফুলে-ফলে ভরে উঠবে৷

ঝগড়া এড়িয়ে চলুন

ডেনমার্কের কোপেনহাগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছেন, যাঁরা খুব বেশি ঝগড়া করেন, তাঁদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি৷ ঝগড়া অবশ্য শুধু ডিভোর্সের কারণই হয় না, মৃত্যুকেও এগিয়ে আনে৷ আর সন্তানের সামনে তো ঝগড়া নয়ই৷ এতে সন্তানের মধ্যে যেমন মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে, তেমনই কমে যেতে পারে মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধও৷

প্রয়োজনে ক্ষমা চেয়ে নিন

ভুল মানুষ করতেই পারে৷ তাই স্বামী বা স্ত্রী যদি কোনো ভুল বা অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেটা একে-অপরকে জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিন৷ দু’জনে দু’জনের প্রতি বিশ্বাস রাখুন৷ অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনোরকম গোপনীয়তা যেন না থাকে৷ তবে তার মানে অন্যের ওপর নজর রাখা কিন্তু একেবারেই নয়৷ অন্যের স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিন৷ ভুলে যাবেন না যে, বিশ্বাসই দাম্পত্যজীবনের মূল ‘চাবিকাঠি’৷