সংস্কারের বিনিময়ে বিনিয়োগ প্রস্তাব পাবে আফ্রিকা

আফ্রিকার যেসব দেশ সংস্কারের অঙ্গীকার করবে, সেসব দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়া হবে৷ এই লক্ষ্যে বার্লিনে আজ সোমবার আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের বৈঠক হবে৷

বৈঠকের আয়োজক জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অর্থনীতির দেশের জোট জি-২০'র বর্তমান সভাপতি দেশ হিসেবে জার্মানি এই বৈঠকের আয়োজন করছে৷ জার্মানি চায়, আগামী মাসে হামবুর্গে অনুষ্ঠেয় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে আফ্রিকা মহাদেশ নিয়ে আলোচনা যেন গুরুত্ব পায়৷

ম্যার্কেলের আমন্ত্রণে বার্লিনে পৌঁছেছেন ঘানা, আইভরি কোস্ট, মালি, নাইজার, রুয়ান্ডা, সেনেগাল ও টিউনিশিয়ার নেতারা৷

বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন ১০০-র বেশি ব্যাংক, কোম্পানি ও অন্যান্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী৷

তবে এই সম্মেলন আয়োজনের বিরুদ্ধে শনিবার বার্লিনে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্বায়নবিরোধী প্রায় এক হাজার মানুষ৷ তাঁদের অভিযোগ, আফ্রিকার সম্পদ দখল করার জন্যই এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে হচ্ছে৷ বিক্ষোভে তাঁরা ‘আফ্রিকা বিক্রির জন্য নয়’ লেখা ব্যানারও প্রদর্শন করেন৷

যে কারণে আলোচনায় আফ্রিকা

জার্মান চ্যান্সেলর ম্যার্কেল গতবছর আফ্রিকা সফরে গিয়েছিলেন৷ সেই সময় তিনি মালি, নাইজার ও ইথিওপিয়া সফর করেন৷ ম্যার্কেল তখন বলেছিলেন, ‘‘জার্মানির আগ্রহেই আফ্রিকার উন্নয়ন প্রয়োজন৷’’ কারণ, আফ্রিকায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে, সেখানে বেশি চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে ইউরোপে শরণার্থীদের আসা বন্ধ হবে৷

রাজনীতি

জার্মান উপনিবেশ

চ্যান্সেলর ওটো ফন বিসমার্কের আমলে নামিবিয়া, ক্যামেরুন, টোগো, তানজানিয়া এবং কেনিয়ার কিছু অংশে ছিল জার্মানির উপনিবেশ৷ সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম ১৮৮৮ সালে দায়িত্ব নিয়ে এই কলোনি আরও বিস্তারের উদ্যোগ নেন৷

রাজনীতি

উপনিবেশের বিস্তার

ঐ উদ্যোগের ফলে নিউগিনির উত্তরাঞ্চল, বিসমার্ক আর্কিপেলাগো ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জ এবং সামোয়া ও চীনের সিংতাওতে তা বিস্তার লাভ করে৷ ১৮৯০ সালে ব্রাসেলসে এক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় জার্মান সম্রাট রুয়ান্ডা এবং বুরুন্ডিসহ পূর্ব আফ্রিকা দখল করবেন৷ উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এসব এলাকা দখল করে জার্মানরা৷

রাজনীতি

ব্যবস্থার বৈষম্য

এই এলাকাগুলোতে শেতাঙ্গ কম ছিল৷ ১৯৪১ সালে মাত্র ২৫ হাজার জার্মান এসব এলাকায় বাস করত৷ আর ১ কোটি ৩০ লাখ কৃষ্ণাঙ্গ তাদের অধীনে কাজ করত, যাদের বৈধভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁইটাও ছিল না৷

রাজনীতি

বিংশ শতাব্দীর প্রথম গণহত্যা

জার্মান ঔপনিবেশিক ইতিহাসে জার্মানরা ভয়াবহ ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল৷ সেই সময়ের দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকার যে অংশ (বর্তমানে নামিবিয়া) জার্মানদের অধীনে ছিল, সেখানে হেরেরো এবং নামাদের উপর গণহত্যা চালিয়েছিল তারা৷ ১৯০৪ সালের ওয়াটারব্যর্গ যুদ্ধে বেশিরভাগ হেরেরো বিদ্রোহী মরুভূমিতে পালিয়ে গিয়েছিল৷ জার্মান সেনারা তখন তাদের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়৷ ফলে সেখানেই প্রাণ হারায় ৬০ হাজার হেরেরো৷

রাজনীতি

জার্মান অপরাধ

ঐ সময় ১৬ হাজার হেরেরো বেঁচে গিয়েছিল৷ তাদের নির্যাতন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ ভয়াবহ নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছিল বেশিরভাগের৷ এখনও জানা যায়নি আসলেই কত বন্দি তখন মারা গিয়েছিল৷ এটা নিয়ে এখনো সমালোচনা হয়৷ এমনকি যে অল্প কয়েকজন সেখান থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল, তাদেরও সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল৷ জীবণধারণের জন্য কিছুই অবশিষ্ট ছিল না তাদের৷

রাজনীতি

ঔপনিবেশিকতার ভয়াবহ চিত্র

১৯০৫ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত পূর্ব আফ্রিকায় জার্মান উপনিবেশের প্রতিবাদে সোচ্চার হয় উপজাতি গোষ্ঠীগুলো৷ এই বিদ্রোহে প্রাণ হারায় অন্তত এক লাখ মাজি-মাজি নৃ গোষ্ঠী৷ তানজানিয়ার ইতিহাসে এটা একটা বড় ঘটনা হলেও জার্মান ইতিহাসে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না৷

রাজনীতি

১৯০৭ এর সংস্কার

ঔপনিবেশিক যুদ্ধের পর জার্মান প্রশাসন ঐসব এলাকায় মানুষের জীবন মানের উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়৷ ব্যার্নহার্ড ডার্নব্যুর্গ একজন সফল উদ্যোক্তা, যাকে ১৯০৭ সালে কলোনিয়াল অ্যাফেয়ার্সের রাজ্য সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তিনি ঔপনিবেশিক নীতিমালা সংস্কার করেন৷

রাজনীতি

বৈজ্ঞানিক গবেষণা

ডার্নব্যুর্গের এই সংস্কারের ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে চুক্তি হয়৷ এর আওতায় হামবুর্গ আর কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য আলাদা বিভাগ গড়ে তোলা হয়৷ ১৯০৬ সালে রবার্ট কোখ পূর্ব আফ্রিকার মানুষের ঘুমের সমস্যা নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন৷

রাজনীতি

শান্তিচুক্তি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হারের পর জার্মানি ১৯১৯ সালে ভার্সিলিদের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে, সেখানে বলা হয় জার্মানি ভার্সিলিদের তাদের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দিচ্ছে৷

রাজনীতি

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগে

নাৎসি আমলে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের ইচ্ছে আবারও প্রবল হয় জার্মানদের মধ্যে৷ এবার তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দিকে হাত বাড়ায়৷ পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে শুরু করে হত্যাযজ্ঞ৷ এছাড়া তারা আফ্রিকায় তাদের আধিপত্য ফিরিয়ে আনারও চেষ্টা করেছিল৷ ১৯৩৮ সালে একটি স্কুলের এই মানচিত্র থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়৷

উল্লেখ্য, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ উন্নত জীবনের আশায় সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে লিবিয়ায় যায়৷ তারপর সেখান থেকে দালালদের মাধ্যমে নৌকা করে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে৷ যারা পর্যাপ্ত অর্থ দিতে পারে না, তাদের জঙ্গি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন স্থাপনায় আটকে রাখা হয়৷ জার্মান কূটনীতিকরা এসব স্থাপনাকে অনেক সময় ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’র মতো বলে বর্ণনা করেছেন৷

‘কম্প্যাক্টস' পরিকল্পনা

জি-টোয়েন্টি'র এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে আফ্রিকার সাতটি রাষ্ট্র তাদের দেশে সংস্কারের অঙ্গীকার করবে৷ বিনিময়ে সেসব দেশ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থা ও জি২০-র অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগ সহায়তা পাবে৷ যেমন ঘানা, আইভরি কোস্ট ও টিউনিশিয়ার সঙ্গে কাজ করবে জার্মানি৷ আর জি২০-র অন্য দেশগুলো কাজ করবে ইথিওপিয়া, মরক্কো, রুয়ান্ডা ও সেনেগালের সঙ্গে৷

পূর্ববর্তী পরিকল্পনা

আফ্রিকা মহাদেশ নিয়ে এর আগেও পরিকল্পনা হয়েছে৷ ২০০৫ সালে জি-৮ এর তৎকালীন সভাপতি দেশ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ার ‘আফ্রিকা কমিশন’ গঠন করেছিলেন৷ ১৭ সদস্যের সেই কমিটির দায়িত্ব ছিল জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে নেতাদের আলোচনার জন্য বিষয় নির্বাচন করা৷ এরপর শীর্ষ সম্মেলনে দেশগুলো আফ্রিকার জন্য প্রতিবছর অতিরিক্ত ২৫ বিলিয়ন ডলার উন্নয়ন সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল৷ ২০১০ সাল পর্যন্ত এই সাহায্য দেয়ার কথা হয়েছিল৷ কিন্তু বাস্তবে আফ্রিকা পেয়েছিল মাত্র ১১ বিলিয়ন ডলার, বলেছে ‘অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বা ওইসিডি৷ জার্মানিসহ অন্যান্য দেশ তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখেনি বলে জানায় সংস্থাটি৷

জেডএইচ/এসিবি (এএফপি, ডিডাব্লিউ)