সেন্সরশিপের কবলে মিয়ানমারের ব্যঙ্গাত্মক কবিতা

মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় শহরের উপকণ্ঠে এক ক্লাসরুমে চশমাপরা এক শিক্ষার্থী ডজনখানেক সহপাঠীকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা ‘‘সেন্সরশিপ লজ্জার'' এবং ‘‘আমরা সেন্সরশিপে বিশ্বাস করিনা'' বলে শ্লোগান দিচ্ছিলেন৷ এক অনুষ্ঠানের মহড়া এটি৷

মিয়ানমারের কয়েকশত বছরের পুরনো প্রথা, যা শাসকদের বিদ্রুপ করতে ব্যবহার করা হতো, থাংগিয়াট বা বার্মী ভাষায় থ্যান্চা'র মহড়া দিচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা৷ দেশটিতে নতুন বছর উদযাপনের অনুষ্ঠানে দলগতভাবে থ্যান্চা পরিবেশন করাই তাদের উদ্দেশ্য৷

থ্যান্চায় সাধারণত ঢোলের তালে তাল মিলিয়ে নাচ ও  ব্যঙ্গাত্মক কবিতা আবৃত্তি করা হয়৷ চলতি বছর এই আয়োজন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, কেননা, দেশটির গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার থ্যান্চার কবিতা এক সেন্সর প্যানেলে অনুমোদনের জন্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে৷

বিশ বছর বয়সি শিক্ষার্থী থ্যান্ট জিন এ বিষয়ে বলেন, ‘‘আমরা জনগণের বার্তা সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে থ্যান্চা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম৷''

‘‘তারা কেন দেশের জনগণ, শিক্ষার্থীদের কথা শোনার সাহস পাচ্ছে না?'' প্রশ্ন করেন দলের আরেক সদস্য ২৩ বছর বয়সি অং মিন থ্যু৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

আঙ্গেলা ম্যার্কেল

গ্রিসের ঋণ সংকটের সময় প্রায়ই সে দেশের ম্যাগাজিনগুলোতে নাৎসি আমলের পোশাক পরিহিত অবস্থায় জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ছবি প্রকাশিত হতো৷ উপরের ছবিটি ২০১২ সালের৷ একটি স্যাটায়ারিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ম্যার্কেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সেনাবাহিনীর পোশাক পরে আছেন, আর তাঁর ঘাড়ে শকুন৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

ডোনাল্ড ট্রাম্প

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্পকে নিয়ে প্রায়ই কার্টুন আর ব্যঙ্গ করা হয়৷ যেমন ‘দ্য বোস্টন গ্লোব’ সম্প্রতি তাদের প্রথম পাতায় একটি প্যারোডি প্রকাশ করেছে৷ এতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে বিশ্বের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তার বর্ণনা রয়েছে৷ ট্রাম্প ঐ প্রতিবেদনকে ‘নির্বোধ’ আর ‘অর্থহীন’ বলেছেন৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

ভ্লাদিমির পুটিন

ছুটিতে গিয়ে খালি গায়ের পুটিন ঘোড়া চালাচ্ছেন এমন ছবি প্রকাশিত হয়েছে অতীতে৷ উপরের ছবিটি গত বছর অনুষ্ঠিত জার্মানির একটি কার্নিভাল প্যারেডের৷ সেখানে পুটিনের হৃষ্টপুষ্ট ডান হাতে লেখা আছে ‘মিলিটারি’ আর রুগ্ন বাম হাতে লেখা ‘অর্থনীতি’৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

কিম জং-উন

২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া কমেডি মুভি ‘দ্য ইন্টারভিউ’ মুভিতে দেখা যায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ দু’জন সাংবাদিককে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য পাঠিয়ে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে৷ এর প্রেক্ষিতে সনি পিকচার্স সাইবার হামলার শিকার হয়৷ এফবিআই এর ধারণা, এর হামলার পেছনে ছিল উত্তর কোরিয়ার সরকার৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

জর্জ ডাব্লিউ বুশ

তাঁর বুদ্ধিমত্তার অভাব নিয়ে মার্কিন টিভি চ্যানেলের লেট নাইট কমেডি শোগুলোতে অনেকবার ব্যঙ্গ করা হয়েছে৷ ক’দিন আগে তিনি যখন পেইন্টিং এর দিকে ঝোঁকার কথা জানান, তখন উপরের ছবিটির আবির্ভাব হয়৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি

এটিও জার্মানির একটি কার্নিভাল প্যারেডের ছবি৷ এতে দেখা যাচ্ছে, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কাচিনস্কির বুটের নীচে এক নারী৷ তার গায়ে লেখা পোল্যান্ড৷ কাচিনস্কির শাসনামলে দেশটির নারীদের অবস্থা এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷ পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এর মাধ্যমে পোলিশ জনগণকে অসম্মান করা হয়েছে৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

আয়াতুল্লাহ খোমেনি

ছবিতে হল্যান্ডে জন্ম নেয়া, জার্মানিতে বসবাসকারী এন্টারটেনার রুডি ক্যারেলকে দেখা যাচ্ছে৷ ১৯৮৭ সালে তিনি একটি আলোকচিত্র বিন্যাস (ফটো মন্তাজ) তৈরি করেছিলেন যেখানে দেখানো হয়েছিল, ইরানের বিপ্লবের নেতা খোমেনির সরকারি সফরের সময় তার দিকে অন্তর্বাস ছুড়ে মারা হচ্ছে৷ এর প্রতিবাদে তেহরান দু’জন জার্মান কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়েছিল৷

কয়েকজন বিশ্বনেতা যাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে

রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান

সম্প্রতি জার্মানির এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে একটি ছড়া পাঠ করেন কমেডিয়ান ইয়ান ব্যোমারমান (ছবিতে বামে)৷ লক্ষ্য ছিল, এর্দোয়ানের আমলে তুরস্কে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যেভাবে চাপের মুখে পড়েছে, তাকে ব্যঙ্গ করা৷ কিন্তু যে কারণেই হোক, ছড়ায় এর্দোয়ানের যৌন পছন্দ-অপছন্দকে পাশবিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা সে ছাগলদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কেই হোক আর ভেড়াদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কেই হোক৷ এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এর্দোয়ান৷

থ্যান্চা নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টার বিরোধিতা করে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সরব হয়েছেন৷ তাঁদের মতে, মিয়ানমারের শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সূ চি'র সরকারের আমলে বাকস্বাধীনতা সীমাবদ্ধ পর্যায়ে রয়েছে৷ আগামী বছর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে৷

সূ চি'র ক্ষমতাসীন দল ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি'র এক মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, থ্যান্চার উপর এই কড়াকড়ি সাময়িক, কেননা, মিয়ানমার গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছে৷ ড. মিয়ো নিউন্ট বলেন, ‘‘আমাদের দেশ এখনো গণতন্ত্র অর্জন করেনি৷ আমরা উদ্বিগ্ন যে থ্যান্চাকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটতে পারে৷ তাই কর্তৃপক্ষ সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে৷''

উল্লেখ্য, সামরিক জান্তা  মিয়ানমারকে কয়েক দশক শাসন করেছে৷ তখন থ্যান্চা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল৷ পরবর্তীতে ২০১৩ সালে দেশটিতে আধাবেসামরিক শাসন শুরু হলে থ্যান্চা চর্চা ফিরে আসে৷ তবে চলতি বছর নববর্ষ শুরুর আগে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে এই চর্চায় সরকারবিরোধী কোনো কিছু না বলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে৷

এআই/এসিবি (রয়টার্স)

আমাদের অনুসরণ করুন