‘মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া’

"রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বাংলাদেশ থেকে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ উপদ্রপকারী নন৷ তাঁঁরা নিজ ভূমিতে আছেন এবং তাঁদের উজ্জ্বল এক ইতিহাস আছে’’ – মন্তব্য একজন পাঠকের৷ রোহিঙ্গাদের পক্ষে, বিপক্ষে নানা মত তুলে ধরেছেন আরো কয়েকজন৷

ডয়চে ভেলের পাঠক তানভির রায়হান লিখেছেন, ‘‘এখন রোহিঙ্গাদের জন্য দেশ বানাতে গেলে চট্টগ্রাম ছাড়াও অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিতে হবে বলে মনে করেন৷’’ আসলে তিনি নিজের দেশ নিয়েই চিন্তিত৷ তিনি মনে করছেন, অনেক বাংলাদেশি জানেনই না যে, নিজের দেশে কত সমস্যা, কত   রোহিঙ্গা ঢুকছে পড়েছে৷ রায়হান আরো মনে করেন, বার্মিজদের মধ্যে একতা আছে এবং তাঁরা তাঁদের ভবিষ্যতের কথা ভালোভাবেই চিন্তা করেন, অর্থাৎ বাংলাদেশিদের এত চিন্তার কারণ নেই৷

ডিজিটাল বিশ্ব | 14.08.2017

রোহিঙ্গাদের নাকি কোনো দেশ নেই এবং মিয়ানমারে তাঁদের কোনো অধিকারও নেই, বলেই বিশ্বাস পাঠক রহমান আজিজের৷

অন্যদিকে হাসান ওয়াজেদ মজুমদার সাংবাদিকদের সতর্ক করে দিয়ে লিখেছেন যে তারা যেন কোনো দেশের পক্ষ নিয়ে না লেখেন৷ আর সাংবাদিকদের কাছে পাঠক হাসানের অনুরোধ, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে যেন সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হয়৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

মিয়ানমার থেকে পালানো

মিয়ানমারে গত অক্টোবরে নয় পুলিশ হত্যার অভিযোগ ওঠে এক রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে৷ তারপর থেকে সেদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর আবারো দমনপীড়ন শুরু হয়৷ ফলে সত্তর হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে৷ তারা যেসব ক্যাম্পে বসবাস করেন সেগুলোর একটি এই কুতুপালং৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

স্বনির্ভরতা দরকার

কুতুপালং ক্যাম্পের শরণার্থীরা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে নিরাপদ আছে বটে, তবে জীবন সেখানে মোটেই সহজ নয়৷ সেখানে সত্যিকারের কোনো অবকাঠামো নেই, সবই শরণার্থীদের গড়া অস্থায়ী আবাস৷ তারা নিজেদের দেশ ছেড়ে এসেছেন, কেননা, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ করেছে৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে এই তথ্য৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

শিশুদের খেলা নয়

আশ্রয়শিবিরটির অধিকাংশ এলাকায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই৷ কয়েক হাজার শরণার্থী শিশুর খেলোধুলারও কোন ব্যবস্থা নেই৷ ক্যাম্পের লেক থেকে মাটি সংগ্রহ করছে এই শিশুটি৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

কুঁড়েঘরে বসবাস

কাদা মাটি এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপাদান দিয়ে ঘর তৈরি করে বাস করেন শরণার্থীরা, যাতে মাথার উপরে অন্তত ছাদ থাকে৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস

সেই ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সেদেশে রোহিঙ্গারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন৷ তাদেরকে নাগরিকত্ব এবং ভোট দেয়ার অধিকার দিচ্ছে না সরকার৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশেও বৈষম্যের শিকার?

বাংলাদেশেও বৈষম্যে শিকার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা৷ ক্যাম্পে আর জায়গা নেই- বলে বাংলাদেশে জলপথে আশ্রয় নিতে আসা অসংখ্য রোহিঙ্গাকে তাদের নৌকাসহ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে সীমান্তরক্ষীরা৷ পাশাপাশি কক্সবাজার ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের একটি দুর্গম দ্বীপে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার৷ স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দ্বীপটি বর্ষাকালে অধিকাংশ সময় পানির নীচে তলিয়ে যায়৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

নির্জন দ্বীপে সরিয়ে নেয়া

ঠ্যাঙ্গার চর বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর মোহনায় কয়েকবছর আগে জেগে ওঠা এক দ্বীপ৷ শুধুমাত্র নৌকায় করে সেখানে যাওয়া যায় এবং চরটিতে অতীতে একাধিকবার জলদস্যু হানা দিয়েছে৷ এক উন্নয়নকর্মী সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন যে দ্বীপটিতে কর্মসংস্থানেরও তেমন কোনো সুযোগ নেই৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী স্বীকার করেছেন যে, ঠ্যাঙ্গার চরকে বসবাসের উপযোগী করতে আরো অনেক কাজ করতে হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘দ্বীপটিতে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করার পর রোহিঙ্গাদের সেখানে সরিয়ে নেয়া হবে৷’’ তবে সরকার অতীতে এরকম প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি৷ কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের তেমন কোন উন্নয়ন সাধন করা হয়নি৷

ভুলে যাওয়া শরণার্থীরা: বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

ইতিহাস থেকে মোছার চেষ্টা

নিরাপদ আবাসভূমি না থাকায় রোহিঙ্গাদে ভবিষ্যত ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে৷ অন্যদিকে, মিয়ানমার তাদের অতীত মুছে ফেলতে কাজ করছে৷ দেশটির সংস্কৃতি এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যবই প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে যেখানে রোহিঙ্গাদের কথা একেবারেই উল্লেখ থাকবে না৷ গত ডিসেম্বরে মন্ত্রণালয়টি দাবি করেছে, মিয়ানমারের ইতিহাসে কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে কখনো রোহিঙ্গা নামে আখ্যায়িত করা হয়নি৷

তবে ‘‘মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া,’’ অনির্বান সাহার সরাসরি মন্তব্য৷

আর অং সান সু চির নোবেল প্রাইজ বাতিল করা উচিত বলে মনে করেন আবু হাসনাত মাহমুদ৷

পাঠক মোক্তার শেখ সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন রোহিঙ্গারা যেন বিপদ থেকে রক্ষা পায়৷

রোহিঙ্গাদের নিয়ে লেখা ডয়চে ভেলে থেকে প্রকাশিত রিপোর্টটি পড়ে বিজয় সিং ফেসবুক পাতায় তাঁর মন্তব্য জানাতে গিয়ে লিখেছেন, মিয়ানমার মানুক আর না মানুক, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক’৷

সংকলন: নুরুননাহার সাত্তার

সম্পাদনা: জাহিদুল হক

আমাদের অনুসরণ করুন