ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

প্রথম শুরু

ইটালির মোস্ত্রা চলচ্চিত্র উৎসবে হিটলার ও মুসোলিনি প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর কানে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়৷ দক্ষিণ ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর কানে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও কূটনীতিক ফিলিপ এরল্যাঙ্গার এটি চালু করেন৷ চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রত্যেক দেশ থেকে বাছাই করা একটি করে চলচ্চিত্র স্থান পেতো সেখানে৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

নতুন করে শুরু

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টালমাটাল পরিস্থিতিতে কান চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনও বন্ধ হয়ে যায়৷ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৪৬ সালে আবার এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়৷ ১৯৪৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফেস্টিভ্যাল ‘দু ফিল্ম দ্য কান’ নামে উৎসবটি হয়৷ এর পর্দা নামে ৫ অক্টোবর৷ সেটাই ছিল বর্তমানে চলমান কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম আসর৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

উৎসবে দুই দফার ধাক্কা

দুই বছর আয়োজনের পর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ১৯৪৮ ও ১৯৫০ সালে উৎসবটি হয়নি৷ তবে ততদিনে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক উৎসবের মর্যাদা পেয়ে গেছে এটি৷ ১৯৫৫ সালে ফ্রান্সের কান শহরকে স্থায়ীভাবে এ উৎসব আয়োজনের কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়৷ এরপরও ফ্রান্স চতুর্থ রিপাবলিক থেকে পঞ্চম রিপাবলিকে রূপান্তরের সময় উৎসব আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল৷ পরের বছর এক চুক্তির ফলে সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

উৎসবে বিবর্তন

ষাটের দশকে বিভক্তি আসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে৷ প্রচলিত উৎসবের পাশাপাশি শুরু হয় পিয়েরে অঁরি ডিলিউর নেতৃত্বে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট, এর পুরোটাই ছিল চলচ্চিত্র নির্মাতাদের দখলে৷ ১৯৬২ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইক’ নামে উৎসবের আরেকটি অংশ চালু করে ‘ফ্রেঞ্চ ইউনিয়ন অব ফিল্ম ক্রিটিকস’৷ তাঁরা নবীন পরিচালকের ১ম বা ২য় কাজকে পুরস্কার দিয়ে মূল্যায়ন শুরু করেন৷ পরিবর্তন আসে পুরস্কারের বিভিন্ন নিয়মেও৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

স্বর্ণপাম

কান চলচ্চিত্র উৎসবের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হচ্ছে পাম ডি’অর বা স্বর্ণপাম৷ প্রতিযোগিতা বিভাগের ছবিগুলো থেকে এর বিজয়ী নির্বাচিত হয়৷ এগুলো প্রদর্শন করা হয় থিয়েটার লুমিয়েরে৷ পুরস্কারটির বর্তমান নকশা অনুযায়ী এতে ১৮ ক্যারেট সোনা ব্যবহার করা হয়৷ এর পেছনে ব্যয় হয় ২০ হাজার ইউরো৷ শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য রয়েছে শর্টফিল্ম পাম ডি’অর পুরস্কার৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

রেড কার্পেট

কান উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ‘রেড কার্পেট’৷ বিশ্বের নামি-দামি তারকারা লালগালিচা মাড়িয়ে উৎসবে যোগ দেন৷ এর দু’পাশে সাংবাদিকরা ভিড় করে থাকেন তারকাদের ছবি তোলার জন্য৷ ৬০ মিটার (২০০ ফুট) দৈর্ঘ্যের লাল কার্পেটটি দিনে তিনবার পরিবর্তন করা হয়৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

উৎসবের সময়

নানা সময় ধাক্কা খেলেও ১৯৫০ সালের পর থেকে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে আয়োজন হয়ে আসছে কান চলচ্চিত্র উৎসব৷ তবে শুরুর দিকে আয়োজনের কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না৷ ১৯৬৭ সালের পর থেকে প্রতি বছর মে মাসে, অর্থাৎ ফরাসি বসন্তে আয়োজন করা হয় কান উৎসব, যা ১২ দিন ধরে চলে৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

সিনেফাউন্ডেশন বিভাগ

কান চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ‘সিনেফাউন্ডেশন বিভাগ’৷ সারা বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁদের ছবি প্রদর্শনের জন্য এখানে আবেদন করেন৷ এর মধ্য থেকে নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য বা তারও কম দৈর্ঘ্যের ছবিগুলো সেল বুনুয়েল প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হয়৷ এখানকার সেরা তিনটি চলচ্চিত্র পায় পুরস্কার৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

অংশগ্রহণকারী

উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য প্রায় ৪০ হাজার জন অফিসিয়াল অ্যাক্রেডিটেশন পায়, যার মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার জন থাকেন সাংবাদিক৷ উৎসব চলার সময় কানে ৭৪ হাজার থেকে ২ লাখ মানুষের আগমন ঘটে৷ এর মধ্যে ফিল্ম মার্কেটে যেতে পারেন ১৩ হাজার জন৷ এ বছর ১,৮৪৫টি ফিচার ফিল্ম এবং ৪,২৪০টি শর্টফিল্ম জমা পড়েছে কান উৎসবে৷ অংশ নিচ্ছে ৩৯টি দেশ৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

উৎসবের বাজেট

কান চলচ্চিত্র উৎসবের বাজেট ২০ মিলিয়ন ইউরো৷ এর অর্ধেক অর্থ আসে ফরাসিদের বাজেট থেকে আর বাকি অর্ধেক দেন স্পন্সররা৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

উৎসবের বাইরে...

কানে উৎসব বহির্ভূত সংগঠনগুলোর আয়োজনে কয়েকটি বিভাগ চালু আছে৷ এর মধ্যে রয়েছে ‘ডিরেক্টরস্ ফোর্টনাইট’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস্ উইক’ বিভাগ দুটি৷ এখানে নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য থেকে দেওয়া হয় গ্রাঁ প্রিঁ পুরস্কার৷ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিগুলোকে সেরা চিত্রনাট্যের জন্য দেওয়া হয় প্রিঁ দু সিনারিও৷

ফিরে দেখা: কান চলচ্চিত্র উৎসব

বাঙালির অর্জন

কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন স্বর্ণপামের জন্য ১৯৫৬ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের মনোনয়ন৷ সেই সময় ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিল এটি৷ ২০০২ সালের কান উৎসবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’ দেখানো হয়েছিল ভিন্ন ভাষার শ্রেষ্ঠ ছবির প্রতিযোগিতা সেকশনে৷

চলচ্চিত্র নিয়ে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী আয়োজন কান চলচ্চিত্র উৎসব৷ ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া উৎসবের ৭২তম আসর বসেছে ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহরে৷ ছবিঘরে জেনে নিন উৎসবটির ইতিহাস৷

আমাদের অনুসরণ করুন